লাইটার জাহাজ সংকটের প্রভাব বাজারে, সমাধান কীসে?

রমজানকে সামনে রেখে নিত্যপণ্য বোঝাই ৭২০টি জাহাজ সমুদ্র, নদী ও মোহনায় ভেসে আছে। কেন তারা বন্দরে ভিড়ে মাল খালাস করছে না তা নিয়ে নানা কারণ পাওয়া যাচ্ছে। 

বাংলাদেশে রমজান মাসে বেশিরভাগ সময় নিত্যপণ্যের বাজার অস্থির হয়ে ওঠে, অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে হয় ভোক্তাদের। আর রোজা শুরুর মাত্র তিন সপ্তাহ আগে মাল বোঝাই এমন শত শত লাইটার জাহাজের পানিতে ভেসে থাকা নিয়ে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ছে।

কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে বিভিন্ন জায়গায় জাহাজ ভাসিয়ে রেখে ‘ভাসমান গুদাম’ বানিয়ে পণ্য মজুত করা করা হচ্ছে।

রমজানের আগে অতিরিক্ত পণ্য আমদানি ও জেটি সংকটেও পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে বলে দাবি করছেন ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল এর ২১ ডিসেম্বর পর্যন্ত পাওয়া ডেটা বলছে, দেশের ৪১টি ঘাটে আটকে আছে ৭২০টি লাইটার জাহাজ।

প্রায় ২,২০০টি লাইটার জাহাজের মধ্যে বিশাল সংখ্যক এই জাহাজ আটকে থাকায় বহিনোঙরে বড় ধরনের জট তৈরি হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন বাড়ছে পণ্য পচে যাওয়ার শঙ্কা অন্যদিকে বাড়ছে খরচ।

পণ্য খালাসের অপেক্ষায় গভীর সমুদ্রে অপেক্ষায় রয়েছে ১৩৪টি মাদার ভেসেল বা বড় জাহাজ। নিত্যপণ্য বোঝাই বড় জাহাজের এই জট প্রতিদিনই বাড়ছে। 

এর মধ্যে অর্ধশত জাহাজে রয়েছে ছোলা, চিনি, তেল ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য। এসব জাহাজের প্রতিটি প্রতিদিন গচ্চা দিচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার ডলার বা প্রায় ২৫ লাখ টাকা।

বর্তমান বিধিমালা অনুযায়ী, আমদানিকারকেরা পণ্য খালাসের জন্য ১২ দিনের গ্রেস পিরিয়ড পান। এরপর বিলম্ব হলে জাহাজমালিককে প্রতিদিন প্রতি টন পণ্যের জন্য ৭ টাকা হারে ড্যামারেজ দিতে হয়। 

বাজারে প্রভাব পড়বে

পণ্য পচে যাওয়া ও অতিরিক্ত খরচ রমজানের আগে নিত্যপণ্যের বাজার চড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন।

“রমজানের আগে পণ্য নিয়ে একদিকে প্রচুর মাদার ভেসেল আছে। যার জন্য প্রতিদিন  আসছে। অন্যদিকে লাইটার জাহাজেরও শঙ্কট। এতে আমদানিকারকদের খরচ বাড়ছে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

দ্রুতই এই সমস্যার সমাধান করা না গেলে এই বাড়তি খরচ রমজানের পণ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে বলেই মনে করছেন এই ব্যবসায়ী নেতা।

সঠিক মনিটরিংয়ের অভাবে রমজানের আগে লাইটার জাহাজ নিয়ে এক ধরনের সিন্ডিকেট হচ্ছে, যা প্রতি বছর বাজারে দাম বৃদ্ধিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে বলে মনে করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সিনিয়র সহ সভাপতি এসএম নাজের হোসাইনও।

তিনি আলাপ-কে বলেন, “মাদার ভেসেল থেকে লাইটার জাহাজ, সেখান থেকে গুদাম, এরপর খুচরা ও পাইকারি বিক্রেতা- সবশেষ ক্রেতার কাছে পণ্য পৌঁছে। এখন যদি সিন্ডিকেট করে লাইটার থেকে গুদামে আনতেই আপনি ১৫ থেকে এক মাস সময় নষ্ট করতে পারেন তাহলে বাজারে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।”

লাইটার জাহাজ

সংকট কেন এবং কোথায়?

লাইটার জাহাজকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতাসহ তিনটি কারণ চলমান জাহাজ সংকটের পেছনে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কোঅর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র ও মিউচুয়াল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পারভেজ আহমেদ।

তিনি বলেন, “রমজানকে কেন্দ্র করে হঠাৎ করে অনেক পণ্য চলে আসা, পণ্য খালাসের জন্য অত্যাধুনিক জেটি না থাকা এবং লাইটারকে গুদাম হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা লাইটার জাহাজের সংকট তৈরি করেছে।”

চাক্তাই চাল ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওমর আজম আলাপ-কে বলেন, “দেশের যে কোন ঘাটে মালামাল পৌঁছে দিয়ে আবার চট্টগ্রামে ফিরতে এক একটি লাইটারের ৪ থেকে ৫ দিন বা এক সপ্তাহর বেশি সময়ের প্রয়োজন হয় না।”

সমাধান ভাবনা

‘সিন্ডিকেশন’ এর পাশাপাশি সরকারের ডিজিটাল এবং সরাসরি নজরদারির অভাবকেও কারণ হিসাবে উল্লেখ করেছেন ক্যাব সিনিয়র সহ সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন। 

চট্টগ্রাম থেকে পণ্য নিয়ে লাইটার জাহাজ রওনা দিয়ে ১৫ দিনের মধ্যেও কেন ফিরে আসছে না তার কারণ খুঁজে বের করার উপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “কিন্তু দেখা যাচ্ছে সরকারের সংস্থাগুলো জানতেই পারছে না মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লোড করার পর সেটি এখন ঠিক কোথায় আছে। আপনি লাইটার জাহাজ এর দেরি কেন এমনকি খোজঁই জানতে পারছেন না তাহলে ব্যবস্থা নিবেন কোথায়?”

সবশেষ ২১এ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর, সারুলিয়া ও রূপসী এলাকায় এমন একটি যৌথ অভিযান পরিচালনা করে নৌপরিবহন অধিদপ্তরের বিশেষ টাস্কফোর্স।

এই অভিযানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে আসা গম, ছোলা, ডাবলি ও সয়াবিনবাহী মোট ২৫টি লাইটার জাহাজ পরিদর্শন করা হয়। অভিযানে দেখা যায়, সেগুলোর মধ্যে পাঁচটি জাহাজ ১০ দিনের বেশি এবং সাতটি ২০ দিনের বেশি সময় ধরে নদীতে অবস্থান করছে।

তবে অনেক লাইটার জাহাজের সঠিক অবস্থান জানতে না পারায় অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন টাস্কফোর্সের সদস্যরা। 

এ সম্পর্কে জানতে চাইলে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সূত্রে জানা যায়, লাইটার জাহাজের সমস্যা সমাধানে সরাসরি নজরদারির সঙ্গে ডিজিটাল সমাধানের বিষয়টিও ভাবছেন তারা। ‘জাহাজী’ নামের একটি অ্যাপ চালুর বিষয়টি রয়েছে শেষ ধাপে। 

অ্যাপটি চালু হলে লাইটার জাহাজের বুকিং ব্যবস্থা সহজ হবে যাতে কমবে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা। স্বয়ংক্রিয় ভাবে সিরিয়াল ব্যবস্থাপনা করা সহজ হবে।

এর পাশাপাশি লাইটার জাহাজের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সহজ হবে। যাতে অনিশ্চয়তা দূর হবে একই সঙ্গে এগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও ভালো হবে বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন জাহাজীর কো-ফাউন্ডার ও সিওও অভিনন্দন জোতদার।