২০১৬ সালে যখন ব্যাংকে টাকা রাখলে ৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যেত, তখন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস নামে একটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান দিচ্ছিল ১২ শতাংশ সুদ।
সেসময় সদ্য চাকরি ছেড়েছিলেন সুমাইয়া রহমান। গ্র্যাচুইটি, প্রভিডেন্ট ফান্ড আর অন্যান্য পাওনা মিলে পেয়েছিলেন ১০ লাখ টাকা। আর তা জমা রেখেছিলেন পিপলস লিজিংয়ে।
আলোচিত পিকে হালদারের ৩ হাজার কোটি টাকা পাচারের কেলেঙ্কারির পর আমানতের সেই ১০ লাখ টাকা আজও পাননি সুমাইয়া, সুদ তো পরের কথা!
বলা হয় এই প্রতিষ্ঠানসহ আরও চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ছিল পিকে হালদারের দখলে।
অনিয়ম-দুর্নীতির শিকার এমন নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তালিকা করে সম্প্রতি সেগুলো অবসায়ন বা বন্ধের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যে তালিকায় রয়েছে পিপলস লিজিংও। এতে মূল অর্থ ফেরত পাওয়ার একটি আশা তৈরি হয়েছে এসব আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের।
যারা বুঝতে পারছেন না তাদের জন্য সহজ করে বললে, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিছুটা ব্যাংকের মতই। তবে এখানে আমানত রাখতে হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য, অনেকটা ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্টের (এফডিআর) মতো। যার জন্য ব্যাংকের চেয়ে সুদের হার বেশি থাকে।
এই ধরনের প্রতিষ্ঠান এই আমানত বিনিয়োগ করে অথবা ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে আয় করে আমানতকারীদের সুদ পরিশোধ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আসল টাকা ফেরত পেলেও সুমাইয়া রহমান গত ১০ বছরের জন্য কোনো মুনাফা পাবেন না।
আর শুনতে অবাক লাগলেও উনার ২০১৬ সালের ১০ লাখ টাকা এই ২০২৬ সালে এসে এখন দুই লাখ টাকারও কম, আট লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেছে সুমাইয়ার!
সোনার দামের তুলনা করলে জিনিসটা বুঝতে সহজ হবে।
২০১৬ সালে ২২ ক্যারেট সোনার ভরি ছিল ৪২ হাজার টাকার কম-বেশি; ১০ লাখ টাকায় তখন কেনা যেত প্রায় ২৪ ভরি সোনা।
সোনার ভরি এখন প্রায় আড়াই লাখ টাকা। তাহলে ১০ লাখ টাকায় এখন পাওয়া যাবে চার ভরির চেয়েও কম সোনা!
এখন ব্যক্তি সুমাইয়ার টাকার অবস্থা যদি এই হয় তাহলে ভেবে দেখুন সেইসব প্রতিষ্ঠানের কথা যারা শত শত কোটি টাকা এই নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে রেখেছিল!
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর লিক্যুইডেশন অর্থাৎ সম্পদ বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে তার ওপর নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীরা কত টাকা ফেরৎ পাবেন।
‘সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখলে সমস্যা হতো না’
গেল সপ্তাহে বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, যে পাঁচটি ব্যাংককে একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে, সেসব ব্যাংকের আমানতকারীদের ৪ শতাংশ মুনাফা দেওয়া হবে।
তবে লিকুইডেশন যাওয়া নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে এমন কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে আলাপ-কে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন দ্বৈত সিদ্ধান্তকে অর্থনীতিবিদরা দেখছেন দুর্বল উদাহরণ হিসাবে।
“আপনি সবাইকে একই দৃষ্টিতে দেখলে সমস্যা হবে না। সিদ্ধান্তের অদল-বদল করলে ভিন্ন উদাহরণ তৈরি হয়, যা আপত্তির কারণ হয়,” অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আলাপ-কে বলেছেন।
যারা চাপ প্রয়োগ করছে, কেবল তাদের জন্য সিদ্ধান্তে রদবদল না করে একই ধরনের সিদ্ধান্ত সবার জন্য রাখার পরামর্শ বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক এই মুখ্য অর্থনীতিবিদের ।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের মতো এখন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীরাও সুদ বা মুনাফার দাবি তুললে, সেটা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠবে বলেও মনে করছেন ড. হোসেন ।
তবে এমন দাবি উঠলেও সরকারের জন্য সেটা পূরণ করা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
দায় কার?
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নজরদারির অভাব এবং আমানতকারীদের লোভকে এমন ঘটনার পেছনের কারণ বলে মনে করছেন জাহিদ হোসেন।
তার ভাষ্যে, “যখন আপনাকে কেউ বলছে সে ১২ শতাংশ সুদ দিবে, আপনি সেটা বিশ্বাস করবেন কেন? এখন সরকার যে মূল টাকার দায় নিচ্ছে এটাই মুখ্য।”
এই নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে আমানতকারীদের মূল টাকা পরিশোধেই সরকারের খরচ হবে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
সরকারের পক্ষ থেকে এই অর্থ জোগান দেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর তারপরই এই নয়টি প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত সরকারের ‘দুর্বৃত্তায়নের আরেকটি উদাহরণ হিসাবে’ সরকারকে এখন এই দায় মেটাতে হচ্ছে বলে আলাপ-কে বলেছেন ড. হোসেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র উদ্ধৃত করে গণমাধ্যমের রিপোর্টে বলা হচ্ছে, সরকার দুই দফায় টাকা ছাড় করবে যা দেওয়া হবে কেবল ব্যক্তি আমানতকারীদের।
পিপলস লিজিং ছাড়াও এরকম আরো আটটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসায়নের তালিকায় ।
সেগুলো হলো, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি (বিআইএফসি), এফএএস ফাইন্যান্স, আভিভা ফাইন্যান্স, ফারইস্ট ফাইন্যান্স, জিএসপি ফাইন্যান্স, প্রাইম ফাইন্যান্স এবং প্রিমিয়ার লিজিং।