বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে বাড়ছে চিন্তার ভাঁজ

স্বল্পোন্নত দেশ বা এলডিসি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় উত্তরণ বা গ্র্যাজুয়েশন করবে বাংলাদেশ। হাতে সময় রয়েছে মাত্র ১০ মাস। ঠিক এমন সময়, ব্যবসায়ীদের কপালে বাড়ছে চিন্তার ভাঁজ। 

২০২৪ সালের ৫ই অগাস্ট পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নানা টানাপোড়েনে গ্র্যাজুয়েশন প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এর কারণ হিসাবে রপ্তানি ঘাটতি, সুদহার বৃদ্ধি, মেধাস্বত্ব আইনের মতো বিষয়গুলো সামনে এনে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে নতুন করে সময় চাইছেন তারা।

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন এখন অনেকটাই চ্যালেঞ্জের।

কেউ বলছেন অন্তত তিন বছর, কেউবা দাবি করছেন যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়ার। 

এখন প্রশ্ন, এ বছরই গ্র্যাজুয়েশন হলে, সমস্যা কোথায়? বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এর প্রভাব কেমন হবে?

আর ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দিলেও দুই বা তিন বছরের মধ্যে তারা প্রস্তুত হতে পারবেন তো? এমন প্রশ্ন অর্থনীতিবিদদের।

পিছিয়ে গেছে সফর

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন প্রক্রিয়াকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সার্বিক প্রস্তুতি, পর্যালোচনা ও নিজেদের অবস্থান জানাতে চলতি মাসে ঢাকায় আসার কথা ছিল জাতিসংঘের একটি প্রতিনিধিদলের।

যে সফরের পর বাংলাদেশের এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে ২১এ জানুয়ারি একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন উপস্থাপনের কথা ছিল। 

নির্বাচনকালীন সময়ে সেই সফর স্থগিত হলেও নতুন কোনো তারিখ এখনো নির্ধারিত হয়নি।

এলডিসির চ্যালেঞ্জ কোথায়

সব ঠিক থাকলে ২০২৬ সালের ২৪এ নভেম্বর আসবে সেই চূড়ান্ত স্বীকৃতি। তবে এই স্বীকৃতি যেমন গৌরবের, তেমনি অগ্নিপরীক্ষারও। 

কারণ গ্র্যাজুয়েশনের পর শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা কমে যাবে, কঠোর হবে ঋণের শর্ত; একই সঙ্গে ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ শিল্পে মেধাস্বত্ব আইন কার্যকর হলে বাড়বে খরচ। তখন হয়ত সামান্য সর্দিজ্বরের ঔষধ কিনতেও আপনাকে এখনকার চাইতে ১০-২০ গুণ বেশি দাম দিতে হতে পারে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নীতির পর এ গ্র্যাজুয়েশন কতটা টেকসই হবে তা নিয়েও নানান মত রয়েছে সংশ্লিষ্টদের।

প্রস্তুত না হয়ে গ্র্যাজুয়েশনে গেলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজারে সবচেয়ে বড় আঘাত আসবে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মো. মহিউদ্দিন রুবেল।

আলাপকে তিনি বলেন, “গ্র্যাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে হলে আমাদের রপ্তানি পণ্যের উৎপাদন খাতে মূল্য সংযোজনের হার ৪০–৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রয়োজন হবে।”

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা জিএসপি প্লাস ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকে ন্যূনতম ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করতে হবে বলেও জানান তিনি।

এর মানে পণ্যের কাঁচামাল আমদানির পর দেশে এর কাটাই, সেলাই, প্যাকেজিং এর মতো খাতে অন্তত ৪০ শতাংশ অর্থ ব্যয় করতে হবে।

বর্তমানে এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ 'এভরিথিং বাট আর্মস' সুবিধার আওতায় পোশাক খাতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন করেই শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে।

এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে হলে আগে দেশের ভেতরের শিল্প বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাতকে শক্তিশালী করতে হবে জানিয়ে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পর বিভিন্ন শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যদি আমাদের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ খাত স্বাবলম্বী না হয়, তবে তা সম্ভব হবে না। আর তা না হলে আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা থেকে বঞ্চিত হব।”

রপ্তানির এই চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর সহজ শর্তে ঋণের অভাব হবে। এতে সরকার চাপে পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের ঋণের যে সুদ হার রয়েছে তা প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বেশি।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন বা বিকেএমইএ-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপকে বলেন, “যে ক্লাবে আমরা উঠতে চাইছি, সেখানে অন্যদের ব্যাংকঋণের সুদ ৫ শতাংশের নিচে, আমাদের প্রায় ১৫ শতাংশ। এতে আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ বাড়বে।”

অন্যদিকে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন সুবিধায় বাংলাদেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো বিদেশি কোনো প্যাটেন্ট করা ওষুধ আবিষ্কারকের অনুমতি বা রয়্যালটি ফি ছাড়াই দেশে তৈরি করতে পারছে। ট্রিপস ওয়েবার বা পেটেন্ট ফি ছাড়ের এই সুবিধা বাতিল হবে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর।

এতে ওষুধের দামে বড় ধরনের প্রভাব পড়বে। এ নিয়ে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান সম্প্রতি জানান, এলডিসি উত্তরণ হলে এই ছাড় আর থাকবে না। এতে যেকোনো ওষুধ বিশেষ করে ক্যানসার ও ভাইরাসজনিত রোগের ওষুধের দাম অত্যধিক বেড়ে যাবে।

তিনি বলেন, “বর্তমানে একজন ক্যানসারের রোগীর জন্য প্রতি মাসে ৩০-৪০ মার্কিন ডলারের ইমাটিনিব ওষুধ লাগে। এটির দাম বেড়ে তখন ২ হাজার থেকে ৩ হাজার ডলার হতে পারে।”

এগুলো ছাড়াও এলডিসিভুক্ত দেশ হিসেবে পাওয়া জলবায়ু তহবিলের বিশেষ সুবিধা ও আন্তর্জাতিক কারিগরি সহায়তা সীমিত হয়ে যাবে বাংলাদেশের জন্য।

আরও সময় চান ব্যবসায়ীরা

এসব বিবেচনায় এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের আগে কূটনৈতিক সংকটগুলো মোকাবিলা করা জরুরি বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা। 

এছাড়া জিএসপি প্লাস সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক ঋণের সহজলভ্যতা বজায় রাখতে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন তারা।

এসব বিষয় ঠিক হওয়ার আগে বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জায়গায় নেই বলে মত দেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

তিনি আলাপকে বলেন, “এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের জন্য আমরা এখনও তৈরি নই। এখন যদি এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনে যাই, তাহলে দেশের অর্থনীতি এবং দেশের শিল্প-কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।”

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ন্যূনতম তিন থেকে সর্বোচ্চ ছয় বছর পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে বলেও মতামত দেন তিনি।

বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আলাপকে বলেন, “এলডিসি উত্তরণ যতটা সম্ভব পিছিয়ে দেওয়া দরকার। কারণ, আমাদের প্রস্তুতির ঘাটতি আছে।”

এর আগে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠনগুলো একযোগে সংবাদ সম্মেলন করেও এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পেছানোর দাবি জানিয়েছিল।

এখন না হলে কবে?

এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন পিছিয়ে দেওয়ার আবেদন করলে বাংলাদেশের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। 

তিনি আলাপকে বলেন, “এখন আবেদন করে যদি তিন বছর সময় পাওয়া যায়, তারপরও গ্র্যাজুয়েশন হবে ২০২৯ সালে। সেই সময়ের মধ্যে তো প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।”

তাছাড়া কেবল আবেদন করলেই হবে না, যে সব সূচকে বাংলাদেশ গ্র্যাজুয়েশনের দাবি করেছিল, মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে বাংলাদেশকে যথেষ্ট যুক্তি দাঁড় করাতে হবে বলেও জানান এই অর্থনীতিবিদ।

এটা করলে আবার প্রস্তুতি থেকে দৃষ্টি অন্যদিকে চলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।

দীর্ঘ সময় ধরে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের প্রস্তুতি চললেও কেন বাংলাদেশের সরকার বা ব্যবসায়ীরা প্রস্তুত হতে পারলেন না সেটাও বুঝতে পারছেন না মুস্তাফিজ।

“আমরা ২০১৮ সাল থেকেই জানি যে ২০২৪-এ গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা ছিল। বরং করোনা মহামারির কারণে প্রস্তুতির জন্য অতিরিক্ত দুই বছর পাওয়া গিয়েছিল। এরপরও এলডিসি উত্তরণ প্রক্রিয়া নিয়ে কেন নতুন করে ভাবতে হবে?“

বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন এলডিসি থেকে সরে আসার কোনো কারণ নেই, তবে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি আলাপকে বলেন, “এলডিসি উত্তরণের পর রপ্তানি, ওষুধ খাতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে ধরনের ধাক্কা আসতে পারে, তা আবার অর্থনৈতিক সূচকে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এমন শঙ্কা আমি দেখছি না। কারণ বাংলাদেশ এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের সূচকগুলোতে পিছিয়ে গেছে এমন কোনো প্রমাণও নেই।”

বিকেএমইএ এবং বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সাবেক সভাপতি ফজলুল হক মনে করেন, সমস্যা রেখে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন ঠিক হবে না।

তার প্রশ্ন, “জ্বালানি অনিশ্চয়তা, সুশাসন ও অবকাঠামোর মতো ঘাটতি নিয়ে শুধু নামে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন হলে আমাদের লাভ কী?”