তিনদিনে ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশের পোশাক শিল্পাঞ্চল পরিণত হয়েছে রণক্ষেত্রে। মজুরি বাড়ানোর দাবিতে রাস্তায় পোশাকশ্রমিকরা। কোথাও মহাসড়ক অবরোধ, কোথাও শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষ, কোথাও পুলিশের গাড়িতে আগুন। উৎপাদন বন্ধ রয়েছে শত শত কারখানায় আর এই অস্থিরতায় আটকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। এরমধ্যেই সামনে আসছে রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ, ‘তৃতীয় পক্ষের’ তৎপরতা এবং ‘কিছু কারখানা মালিকের’ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ।
ঢাকার মিরপুর,আশুলিয়া এবং গাজীপুরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দুই দিনে ছড়িয়েছে আরও এলাকায়। সোমবার নারায়ণগঞ্জেও সড়ক অবরোধ করেছেন শ্রমিকরা। সরকার এরইমধ্যে দুইটি মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিয়েছে, তবুও থামছে না সংঘর্ষ। একদিকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও মজুরি নিয়ে দীর্ঘদিনের অসন্তোষ, অন্যদিকে উৎপাদন বন্ধ-রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগ, সব মিলিয়ে এই আন্দোলন এখন আর শুধুই মজুরি নির্ধারণের প্রশ্নে আটকে নেই।
এই অস্থিরতার কেন্দ্রে শ্রমিকদের মূল দাবি, মাসিক ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা, যা এখন ১২ হাজার ৫০০ টাকা। অর্থাৎ দাবি পূরণ হলে মজুরি বাড়বে ১৪০ শতাংশ, প্রায় আড়াই গুণ।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি, বিজিএমইএ-এর হিসাবে, শুধু রবিবারেই ৫২৯টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। প্রায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার শ্রমিক কারখানা ছেড়ে বের হয়ে গিয়েছে। সরকার সেইদিন দুইটি মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দিলেও সংঘর্ষ থামেনি।
শ্রমিকরা বলছেন দ্রব্যমূল্য বেড়েছে, ওভারটাইমের সুযোগ কমেছে তাই এই আয়ে সংসার চালানো কঠিন। এদিকে, সরকার ও পুলিশ বলছে, আন্দোলনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন স্বার্থন্বেষী পক্ষ ঢুকে পড়েছে।
“পোশাকশিল্পের মালিকেরা যারা আওয়ামী লীগের (কার্যক্রম নিষিদ্ধ) রাজনীতির সঙ্গে জড়িত, তারাও অস্থিরতা সৃষ্টি পেছনে কাজ করেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো, এর পেছনে কিছু শিল্পমালিক জড়িত। সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীও এর সঙ্গে জড়িত আছেন,” স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সোমবার বলেছেন।
প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনও আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে অস্থিরতা সৃষ্টির ‘তথ্য-প্রমাণ’ পাওয়ার কথা বলেছেন।
যেভাবে শুরু আর যেভাবে ছড়ালো
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরের কোনাবাড়ি, মৌচাক ও কালিয়াকৈর এলাকায় প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বেতন বাড়ানোর দাবিতে ছোট ছোট বিক্ষোভ চলছিল। বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে কয়েকটি সড়ক অবরোধ করেন শ্রমিকরা।
শনিবার তা আরও ছড়িয়ে পড়ে এবং পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। সেদিন সকালে আশুলিয়ার একটি কারখানার শ্রমিকরা কাজ বন্ধ করে বের হয়ে আসে। পরে একে একে ওই এলাকায় ২৩টি কারখানায় ছুটি ঘোষণা করা হয়। মিরপুরে সকাল সাড়ে ১০টা থেকে প্রায় পাঁচ ঘন্টা মিরপুর ১০, ১১, ১২ ও প্রশিকা মোড়ে সড়ক অবরোধ করে রাখা হয়। গাজীপুরে দুপুরের বিরতির পর একটি কারখানার শ্রমিকেরা কাজে না ফিরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহসড়ক অবরোধ করে ফেলে। আশেপাশের কারখানার শ্রমিকরাও যোগ দিলে ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়ে যায়।
এসব ঘটনার টাইমলাইন বলছে, গাজীপুরের কয়েকটি এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অসন্তোষ বৃহস্পতিবার মিরপুরে সড়ক অবরোধের রূপ নেয়। শনিবার আশুলিয়া, মিরপুর ও গাজীপুরে একসাথে কর্মবিরতি ও অবরোধ দেখা গেছে।
রবিবাব মিরপুর ও গাজীপুরে সংঘর্ষ হয়, পুলিশের গাড়ি ও পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়া হয় এবং ৫২৯টি কারখানা উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হওয়ার খবর আসে। ওইদিন সকালেই শ্রমমন্ত্রী মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন আর সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রায় দেড় ঘন্টার জরুরি বৈঠক করেন।
সোমবার মিরপুর আবারও সংঘর্ষ হয়, আশুলিয়ায় চলে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, গাজীপুরে মহাসড়ক অবরোধ হয়। একইদিনে, নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড অবরোধ করা হয়।
দাবি শুধুমাত্র ৩০ হাজার টাকা মজুরি নয়
বর্তমান ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা ঘোষণা করা হয়েছিল ২০২৩ সালের নভেম্ববরে, যা কার্যকর হয় পরের মাস থেকে। তার আগে ন্যূনতম মজুরি ছিল ৮ হাজার টাকা। ২০২৩ সালে মজুরি বেড়েছিল ৫৬ দশমিক ২৫ শতাংশ। এবার শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকার দাবি বর্তমান মজুরির তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি।
শ্রমিকদের ভাষ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বেড়েছে, অথচ মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি। ওভারটাইমের সুযোগও কমেছে বলে তারা সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন। তারা বলছেন এই বেতনে সংসার চলে না এবং ৩০ হাজার টাকার দাবি নতুন নয়, দীর্ঘদিনের।
এই দাবির পাশাপাশি, দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে আরও কিছু বিষয় এসেছে; শ্রমিকদের কালো তালিকাভুক্ত করা বন্ধ, বরখাস্ত শ্রমিকদের কাজে ফিরিয়ে নেওয়া এবং বকেয়া মজুরি পরিশোধ। আশুলিয়ার কিছু শ্রমিকের অভিযোগ, নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ায় পুরুষরা বৈষম্যের শিকার অভিযোগ।
সোমবার নারায়ণগঞ্জের বিক্ষোভে দাবির পরিধি আরও স্পষ্ট হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে শ্রমিকরা ৫ দফা দাবি জানিয়েছেন।
>ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করা;
>সব পোশাক কারখানায় রেশনিং ব্যবস্থা চালু;
>ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার বাস্তবায়ন;
>শ্রমিক আমজাদ হোসেন কামালসহ শ্রমিক হত্যার বিচারে বিচার বিভাগীয় কমিশন গঠন;
>বিনা কারণে ছাঁটাই বন্ধ;
সর্বস্তরে শ্রম আইন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের দাবিও উঠেছে নারায়ণগঞ্জের বিক্ষোভ থেকে।
দুইটি বোর্ড গঠনের ঘোষণা
রবিবার সকালে সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে শ্রমমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী নতুন ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠনের ঘোষণা দেন।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে, বোর্ডের দুইটি কাঠামোর কথা এসেছে। একটি চার সদস্যের ন্যূনতম মজুরি বোর্ড, যার চেয়ারম্যান একজন সিনিয়র জেলা জজ। অন্যটি পোশাক খাতের জন্য ছয় সদস্যের বোর্ড, যেখানে মালিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে বিজিএমইএ-এর একজন পরিচালক ও শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি হিসাবে বাংলাদেশ গার্মেন্টস অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদকের নাম এসেছে।
বোর্ড গঠনের প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে মন্ত্রণালয় বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এসেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, তিন বছর পরপর মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ সরকার কয়েক সপ্তাহ আগেই নিয়েছিল। মালিকপক্ষ তাদের প্রতিনিধির নাম আগে জমা দিলেও শ্রমিক সংগঠনগুলোর নাম দিতে কয়েক দিন সময় লাগে। শনিবার রাতে তারা নাম জমা দেয়। এরপর প্রজ্ঞাপন জারি করে বোর্ড গঠন করা হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, সোমবারই বোর্ডের প্রথম সভা হতে পারে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যত দ্রুত সম্ভব নতুন ন্যূনতম মজুরি ঘোষণা করা হবে বলেও জানান তিনি। তবে সোমবার পর্যন্ত মজুরি ঘোষণার নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি। শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবির বিষয়েও সরকারের কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আসেনি।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন তার ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন, মজুরি বোর্ডে মালিক, শ্রমিক ও নিরপেক্ষ প্রতিনিধি রয়েছেন। তার মতে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের সক্ষমতা, উৎপাদন ব্যয়, অন্য খাতের পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিতে হবে। তবে এসব বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখে মজুরি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সে নিয়ে কিছু বলেননি তিনি।
সেদিনই সন্ধ্যায় প্রায় দেড় ঘণ্টা জরুরি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, শ্রমমন্ত্রী এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানেরা উপস্থিত ছিলেন। শ্রমমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী কারখানা সচল রাখা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া কারখানার নিরাপত্তা, উৎপাদন ও রপ্তানি চালু রাখা এবং শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবির বিষয়টি বিবেচনার কথাও উঠে এসেছে।
বাসসের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, শ্রমমন্ত্রী শ্রমিকদের কাজে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি সতর্ক করেন, উৎপাদন ব্যাহত হলে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন। এতে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের জীবিকাও ঝুঁকিতে পড়বে।
‘কাজ নেই, বেতনও নেই’
বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলছিলেন তারা আশা করেন মজুরি বোর্ড গঠনের পর সোমবার থেকেই কারখানায় স্বাভাবিক উৎপাদন শুরু হবে। তবে শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে শ্রম আইন অনুযায়ী কারখানা বন্ধ রাখার কথাও জানিয়েছিল মালিকপক্ষ।
নিউ এইজ ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে জরুরি সমন্বয় বৈঠক করেন। সেখানে মালিকপক্ষের বক্তব্য ছিল, রপ্তানি আদেশের চাপ ও জ্বালানি সংকটের মধ্যে হঠাৎ করে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার মজুরি বোর্ড গঠনের পরও ভাঙচুর ও সড়ক অবরোধ চলতে পারে না বলেও তারা জানায়। দোসরা নভেম্বরের মধ্যে শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে ১৩(১) ধারা অনুযায়ী অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
মালিকপক্ষের দাবি, রপ্তানি আদেশ কমেছে, কাঁচামালের খরচ বেড়েছে, জ্বালানি সংকটও রয়েছে। এসব কারণে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, যা তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
২০২৩ সালে নতুন মজুরি নির্ধারণের সময় শ্রমিকপক্ষ ২০ হাজার ৩৯৩ টাকা ন্যূনতম মজুরি চেয়েছিল। মালিকপক্ষের প্রস্তাব ছিল ১০ হাজার ৪০০ টাকা। শেষ পর্যন্ত সরকার ১২ হাজার ৫০০ টাকা মজুরি নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, শ্রমিকদের তখনকার ২৩ হাজার টাকার দাবির অর্ধেকের কিছু বেশি পেয়েছিলেন তারা।
২০২৩ সালের মজুরি নির্ধারণের তিন বছর পূর্ণ হবে ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে। এর মধ্যে শ্রম আইন সংশোধন করে মজুরি পুনর্নির্ধারণের সময়সীমা পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে তিন বছর করা হয়েছে। ফলে নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ একেবারে অপ্রত্যাশিত ছিল না।
সরকার বলছে, শ্রমিকদের যৌক্তিক দাবি বিবেচনা করা হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন বন্ধ হলে বিদেশি ক্রেতারা অর্ডার বাতিল করতে পারেন বলে সতর্ক করছেন মন্ত্রীরা। অন্যদিকে, দাবি না মানলে আন্দোলন চলতে পারে, আর শ্রমিকেরা কাজে না ফিরলে কারখানা বন্ধের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে মালিকপক্ষ। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়ার আশঙ্কা শ্রমিকদেরই। কারখানা বন্ধ থাকলে বা ‘কাজ নেই, বেতন নেই’ নীতি কার্যকর হলে তাদের আয় কমবে, কিন্তু সংসারের খরচ তো থেমে থাকবে না।
ভুগছেন সাধারণ মানুষ
সংঘর্ষ আর অবরোধের প্রভাব কারখানা বা মহাসড়কে আটকে থাকেনি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে আনতে বেরিয়ে এক বাবা স্কুলে ফোন করেছিলেন, কিন্তু কাউকে পাননি। শেষ পর্যন্ত হেঁটেই রওনা দেন। এক বেসরকারি চাকরিজীবী মেট্রোরেলে চড়বেন বলে বেরিয়ে দেখেন, স্টেশন বন্ধ। পরে মিরপুর ১২ থেকে ফার্মগেটের দিকে হাঁটতে শুরু করেন। পরীক্ষা দিতে যাওয়া এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীও জানিয়েছেন, কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছাবেন, তা বুঝতে পারছিলেন না।
রবিবার মিরপুরের প্রায় সব সড়ক অবরুদ্ধ ছিল। মেট্রোরেলের মিরপুর ১০, ১১ ও পল্লবী স্টেশনও সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। কয়েকটি আবাসিক এলাকার প্রবেশপথে গেটে তালা থাকায় রিকশা ও মোটরসাইকেল ঢুকতে পারেনি বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তাদের ভাষ্য, এ সময় যাতায়াতের ভাড়াও কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
গাজীপুরে শনিবার ঢাকা–টাঙ্গাইল মহাসড়কে প্রায় ১৫ কিলোমিটার যানজটে আটকে পড়েন নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা। রবিবারও একই মহাসড়ক প্রায় ছয় ঘণ্টা বন্ধ ছিল।
সোমবার সকালে মিরপুরের একটি স্কুল অভিভাবকদের এসএমএস পাঠিয়ে জানায়, তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শিক্ষক ও কর্মীরাও সতর্ক অবস্থানে আছেন বলে জানানো হয়। অভিভাবকদের আতঙ্কিত না হওয়ার অনুরোধও করে স্কুল কর্তৃপক্ষ।
শ্রমিকদের মজুরির দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলনের প্রভাব এখন বাইরেও পড়ছে। শ্রমিকেরা দ্রব্যমূল্য ও সংসারের খরচ সামলাতে না পেরে রাস্তায় নেমেছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে ভোগান্তিতে পড়েছেন এমন মানুষও, যাদের এই বিরোধের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই।
‘তৃতীয় পক্ষ’
শ্রমিক আন্দোলনে ‘তৃতীয় পক্ষ’ বা রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে, রবিবার ও সোমবার সরকার এবং পুলিশের বক্তব্যে বারবার এসেছে এই অভিযোগ। তবে কারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কী প্রমাণ আছে এবং সেই প্রমাণ কতটা প্রকাশ করা হয়েছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর তখনো পুরোপুরি মেলেনি।
ডিবির উপকমিশনার রাকিব খান রবিবার মিরপুরে আটক ২৮ জনকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী বলে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বরিশাল, পটুয়াখালী, কক্সবাজার ও গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন জেলার তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী ছিলেন। সেখানে শতাধিক নেতাকর্মী ছিলেন বলেও জানান তিনি।
আরেক উপকমিশনারের দাবি, সহিংসতার পর আটক ব্যক্তিরা আওয়ামী লীগের নামে মিছিল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, রাজিব চন্দ্র দাস নামে এক ব্যক্তি ফেইসবুকে মিরপুর ১১ নম্বরে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তাকে প্রাথমিকভাবে একটি কারখানার শ্রমিক বলে মনে করা হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের সঙ্গে তার যোগসূত্র আছে কি না, জানতে চাইলে ওসি বলেন, “আমরা ধারণা করছি।”
শ্রমমন্ত্রীও অভিযোগ করেন, ডিসেম্বরকে সামনে রেখে একটি মহল সরকারকে অস্থিতিশীল করার চক্রান্ত করছে। তার বক্তব্যে ‘ফ্যাসিবাদ’-এর প্রসঙ্গও আসে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, ‘পতিত স্বৈরাচার’ ও ‘ফ্যাসিবাদ-সমর্থিত’ শক্তি শ্রমিকদের ব্যবহার করছে। তার দাবি, কিছু শিল্পমালিক এবং শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে থাকা ব্যক্তিরাও এর সঙ্গে যুক্ত। সাম্প্রতিক সহিংসতায় প্রকৃত শ্রমিকেরা জড়িত নন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সহিংসতার ভিডিও ও অডিও সংগ্রহ করা হচ্ছে। মালিকদের কাছেও তালিকা চাওয়া হয়েছে—কোন কারখানা উদ্দেশ্যমূলকভাবে বন্ধ করা হয়েছে এবং কোন শ্রমিক সংগঠন বা নেতা অস্থিরতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন।
সোমবার বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর তিনি আরও বলেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কিছু পোশাকমালিকও অস্থিরতার পেছনে কাজ করছেন। তার অভিযোগ, সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রীরাও এতে জড়িত। ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে, কয়েকজনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে এবং ভিডিও, অডিওসহ কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২৪ ঘণ্টা নজরদারি, সরকার ও মালিকপক্ষের মধ্যে যোগাযোগের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়োগ এবং পুলিশ সদর দপ্তরে একটি নিয়ন্ত্রণকক্ষ চালুর কথাও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ‘সুরক্ষা অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সেখান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে।
ডিসেম্বরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তার বক্তব্যে উঠে এসেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ফ্যাসিবাদী শক্তি ও পলাতক নেতারা ফিরতে চাইলে ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করার কারণ নেই। সরকার তাদের আইনের আওতায় এনে দ্রুত বিচার করতে চায় বলেও জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিনও তার ফেইসবুক পেইজে লিখেছেন, শ্রমিক আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করে ‘পলাতক অপশক্তি’ অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, এমন তথ্যপ্রমাণ উঠে এসেছে। তবে পোস্টে সেই প্রমাণের বিস্তারিত উল্লেখ ছিল না। বাসসের একটি প্রতিবেদনের শিরোনামেও বলা হয়েছে, পুলিশ ‘তৃতীয় পক্ষের ইন্ধন সন্দেহ করছে’।
তবে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৩ সালের মজুরি আন্দোলনের সময়ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও পুলিশ কর্মকর্তারা ‘ইন্ধনদাতা’ এবং ‘স্বার্থান্বেষী মহলের’ কথা বলেছিলেন।