বাংলাদেশে ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের ৮১ শতাংশেরই অবসর-পরবর্তী জীবনের জন্য কোনো আর্থিক পরিকল্পনা নেই। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৩ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে অবসরজীবনের প্রস্তুতি না থাকা কর্মীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মেটলাইফ বাংলাদেশের নতুন এক জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।
চলতি বছরের অগাস্ট মাসে দেশজুড়ে ‘এমপ্লয়ি বেনিফিটস ট্রেন্ডস স্টাডি ২০২৬’ শিরোনামে মাঠপর্যায়ের জরিপের তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়।
জরিপের তথ্য আরও বলছে, বিশ্বব্যাপী কর্মক্ষেত্রে কাজের গতি বাড়াতে এআইয়ের ব্যবহার যেমন পাল্লা দিয়ে বাড়ছে, তেমনি সংসার চালানো, চিকিৎসার খরচ বহন, সন্তানদের ভরণপোষণ ও পড়াশোনার ব্যয় মেটানো থেকে শুরু করে অবসর-পরবর্তী জীবন নিয়ে চিন্তায় বাংলাদেশের কর্মজীবীদের একটি বড় অংশ মানসিক চাপে ভুগছেন। প্রযুক্তির পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মীদের আর্থিক ও ব্যক্তিগত জীবনের এই বাস্তবতাই উঠে এসেছে মেটলাইফ বাংলাদেশের নতুন এক জরিপে।
জরিপে বেসরকারি খাতে কর্মরত ২১ বছর বা তার বেশি বয়সী ৫৮৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ১২৬ জন নিয়োগকর্তা অংশ নেন। সব মিলিয়ে ৭০৯ জনের মতামতের ভিত্তিতে জরিপটি তৈরি করেছে মেটলাইফ বাংলাদেশ। এর আগে ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো পরিচালিত জরিপে অংশ নিয়েছিলেন ৭১৩ জন।
এ জরিপের অংশ হিসেবে ১ নভেম্বর ঢাকায় আয়োজিত এক সেশনে মেটলাইফ বাংলাদেশের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও চিফ মার্কেটিং অফিসার নওফেল আনোয়ার জরিপের তথ্য গণমাধ্যমে তুলে ধরেন। পুরো সেশনজুড়ে ২০২৫ ও ২০২৬ সালের জরিপে উঠে আসা তথ্যগুলো পর্যালোচনা করেন তিনি। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং হেড অব কমিউনিকেশন সাইফুর রহমানসহ মেটলাইফের অন্যান্য কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।
জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৫৫ শতাংশ কর্মী প্রতিদিনের কাজে এআই ব্যবহার করছেন। তাদের মধ্যে ৯১ শতাংশই মনে করেন, এআই ব্যবহারে কাজের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক। তবে একই গবেষণায় ৭২ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, আর্থিক চাপ তাদের কাজের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৫৬ শতাংশ।
নতুন এই জরিপে দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে এআই ব্যবহারে কর্মীরা এগিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি সেই তুলনায় কম। মাত্র ৫৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান কর্মীদের এআই ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে বা প্রয়োজনীয় সুযোগ তৈরি করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও মাত্র ৩৭ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, কর্মীরা সহজেই এআই ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে, এআই ব্যবহারকারী কর্মীদের ৯১ শতাংশ জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তি তাদের কাজের অভিজ্ঞতায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অংশগ্রহণকারীদের মতে, এআই কাজের চাপ ও মানসিক ক্লান্তি কমানোর পাশাপাশি উৎপাদনক্ষমতা বাড়াতে এবং গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দিতে সাহায্য করছে।
তবে প্রযুক্তির অগ্রগতির মধ্যেও কর্মীদের বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো আর্থিক নিরাপত্তা। জরিপের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ৫৬ শতাংশ কর্মী জানিয়েছেন, আর্থিক চাপ তাদের কাজে প্রভাব ফেলেছে। এক বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭২ শতাংশ।
কর্মীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়োগকর্তাদেরও বলে মনে করেন ৮১ শতাংশ কর্মী। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৬৯ শতাংশ। একইভাবে, তাদের অবসর-পরবর্তী জীবনের জন্য সঞ্চয়ে সহায়তা করা নিয়োগকর্তাদের দায়িত্ব বলে মনে করেন ৮৬ শতাংশ মানুষ। আগের বছর এ হার ছিল ৬৭ শতাংশ।
তাদের আর্থিক উদ্বেগের তালিকায় রয়েছে পরিবারের সদস্যদের অসুস্থতা বা দুর্ঘটনায় চিকিৎসার খরচ, পরিবারের নিয়মিত আয় বজায় রাখা, সন্তানের পড়াশোনার ব্যয় এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি দাম সামাল দেওয়া। পরিবারের কোনো সদস্যের অকালমৃত্যু হলে আর্থিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে, সেই চিন্তাও রয়েছে অনেকের মধ্যে।
অবসরজীবনের প্রস্তুতিতে বড় ঘাটতি
কর্মজীবনে আয় থাকলেও অবসরের পর কীভাবে চলবে, সেই প্রস্তুতি জরিপে অংশ নেওয়া অনেকেরই নেই। বিশেষ করে ৪০ বা তার বেশি বয়সী কর্মীদের মধ্যে চাকরি থেকে অবসরে যাওয়ার পরবর্তী জীবনের জন্য কোনো আর্থিক পরিকল্পনা না থাকার হার আগের তুলনায় অনেকটাই বেড়েছে।
জরিপ বলছে, ২০২৫ সালে একই বয়সী কর্মীদের ৫৩ শতাংশেরই কোনো অবসর পরিকল্পনা ছিল না। ২০২৬ সালে তা বেড়ে ৮১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ, কর্মজীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়ে পৌঁছেও একটি বড় অংশ নিজেদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো প্রস্তুতি গড়ে তুলতে পারেনি।
প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কমিউনিকেশন সাইফুর রহমান অবশ্য বিশ্বজুড়ে চলা সংঘাত ও মুদ্রাস্ফীতি বেড়ে যাওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া, অবসরের পর সঞ্চয় থেকে কীভাবে নিয়মিত আয় করা সম্ভব এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তা বজায় রাখা যায়, সে বিষয়ে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে আরও সহায়তা চাইছেন কর্মীরা।
বেতনের পাশাপাশি বাড়ছে ব্যক্তিগত চাহিদার গুরুত্ব
কর্মক্ষেত্রে এখন মূল বেতনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও চাকরিতে সন্তুষ্টি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি কর্মীদের আনুগত্যের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে কর্মীরা এখন সবার জন্য একই ধরনের সুবিধার বদলে নিজেদের বয়স, পারিবারিক অবস্থা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী সুবিধা পেতে চান।
গবেষণায় ব্যক্তিগত চাহিদা অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার আগ্রহ ২০২৫ সালের ৬৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ৮৬ শতাংশ হয়েছে।
এ ছাড়া ৭৯ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, বিমা ও সুস্থতাসংক্রান্ত সুবিধা পেলে প্রতিষ্ঠানের প্রতি তাদের আনুগত্য বাড়বে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ।
বিশেষ করে জীবনবিমা, গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে আর্থিক সুরক্ষা, আয়ের সুরক্ষা এবং শারীরিক অক্ষমতার কারণে কাজ করতে না পারলে আর্থিক সহায়তার মতো সুবিধার চাহিদা বাড়ছে। তবে কর্মীরা যেসব সুবিধা চান, তার তুলনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া সুবিধায় এখনো ঘাটতি রয়েছে।
জরিপে কর্মীদের চাকরিতে সন্তুষ্টির হারেও উন্নতি দেখা গেছে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৭৮ শতাংশ, যা ২০২৬ সালে বেড়ে হয়েছে ৮৩ শতাংশ। অন্যদিকে, হঠাৎ বড় ধরনের আর্থিক সংকট বা অতিরিক্ত খরচের মুখে পড়লে নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে সহায়তা প্রত্যাশা করেন ৭২ শতাংশ কর্মী।
কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতে গুরুত্ব দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলোও
গবেষণায় কর্মীদের পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের মতামতও উঠে এসেছে। ৮৫ শতাংশ নিয়োগকর্তা মনে করেন, কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশ ও সংস্কৃতি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ২০২৫ সালে এই হার ছিল ৭৮ শতাংশ।
মেটলাইফের তথ্য বলছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাধারণ কর্মীদের পাশাপাশি নিয়োগকর্তাদের মতামত নিয়ে কর্মক্ষেত্রে তাদের চাহিদা, আর্থিক নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে নিয়মিত ধারণা পেতে ২০২৫ সাল থেকে এ গবেষণা পরিচালনা করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।
১৮৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা শুরু করা মেটলাইফ বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশে আর্থিক সেবা দিয়ে আসছে। জীবনবিমা, স্বাস্থ্য ও দুর্ঘটনাবিমা, অবসরকালীন আর্থিক পরিকল্পনা, কর্মীদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা তাদের সেবার আওতাভুক্ত।
বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৫২ সালে। শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানটি এএলআইসিও (অ্যালিকো) নামে পরিচিত থাকলেও ২০১৫ সালে মেটলাইফ বাংলাদেশ নামে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লাখেরও বেশি গ্রাহককে নিয়মিত সেবা দিয়ে আসছে মেটলাইফ।