আমদানি নীতির প্রভাবে বদলাচ্ছে ব্যবসার হিসাব

একজন আমদানিকারক বিদেশি সরবরাহকারীর সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে বড় অঙ্কের পণ্য আনতে চান। এতদিন সেখানে ছিলো একটি নির্দিষ্ট সীমা। বছরে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি হলে ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আর আমদানি করা যেত না। বড় অঙ্কের আমদানিতে তখন এলসি ছিল প্রচলিত প্রধান পথ। নতুন আমদানি নীতিতে সেই সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে।

২৪এ অগাস্ট জারি হওয়া আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯-এ শুধু এই একটি নিয়ম বদলায়নি। ঋণপত্রের পাশাপাশি এখন মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

এখানে পরিবর্তনটি এলসি তুলে দেওয়া নয়। বরং এলসি ছাড়াও বড় অঙ্কের আমদানির জন্য চুক্তিভিত্তিক একটি বিকল্প পথ খুলে দেওয়া হয়েছে।

নতুন নীতিতে খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের আমদানির শর্ত শিথিল করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, দেশে খাদ্য বা জ্বালানির সংকট তৈরি হলে প্রয়োজন অনুযায়ী এসব পণ্য আমদানির নিয়ম সহজ করতে পারবে সরকার।

সহজ করে বললে, আমদানির নিয়ম একদিকে সহজ করা হয়েছে, অন্যদিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ম আরও সহজ করার ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। নতুন নীতিতে রপ্তানি শিল্পের কাঁচামাল, গাড়ি ও বাইক আমদানি, প্রবাসীদের জন্য আমদানির সুবিধাসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।

তবে এসব পরিবর্তনের সবগুলো নিয়ে ব্যবসায়ীদের আপত্তি নেই, এমন নয়। বিশেষ করে তৈরি পোশাকশিল্পে নিট কাপড় আমদানির নতুন শর্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতির গল্পটা শুধু ‘এলসি থাকবে কি থাকবে না’ এতটা সরল নয়। বরং প্রশ্ন হলো, কোন আমদানি সহজ হলো, কার জন্য নতুন দরজা খুলল, কোথায় নতুন শর্ত এল এবং ব্যবসায়ীরা কেন সেগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।

প্রসঙ্গত, নতুন আমদানি নীতিটি ১৯৫০ সালের আমদানি ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩(১) ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে এবং প্রকাশের দিন থেকেই কার্যকর। এটি কার্যকর থাকবে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

ঢাকার রাস্তায় চলবে ৫০০ সিসির বাইক?

মোটরসাইকেলের ক্ষেত্রে নতুন আমদানি নীতিতে পরিবর্তনের কথা থাকলেও চূড়ান্ত গেজেটে তার সবটা রাখা হয়নি। ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ দেওয়ার যে পরিবর্তনের কথা খসড়ায় বলা হয়েছিলো, সেটি চূড়ান্ত গেজেটে রাখা হয়নি।

আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯-এর পরিশিষ্ট-১-এর ‘ক’ অংশের ক্রমিক ৮ এবং এইচএস কোড ৮৭ দশমিক ১১ অনুযায়ী, আগের মতোই ১৬৫ সিসির বেশি নতুন মোটরসাইকেল সাধারণভাবে আমদানি নিষিদ্ধ।

তবে নতুন নীতিতে একটি সুযোগ যোগ হয়েছে, নিবন্ধিত মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ৫০০ সিসি পর্যন্ত বাইক তৈরিতে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানি করতে পারবে।

অর্থাৎ, ৫০০ সিসির তৈরি বাইক বিদেশ থেকে এনে বিক্রি করার অনুমতি দেওয়া হয়নি; বরং দেশে ৫০০ সিসি পর্যন্ত বাইক তৈরির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

এখানে অবশ্য একটি ঝামেলা থেকে যাচ্ছে। কারণ বাংলাদেশে এখন ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত দেশে তৈরি মোটরসাইকেল রেজিস্ট্রেশন করা যায়। নতুন আমদানি নীতিতে ৫০০

সিসি পর্যন্ত বাইক তৈরির যন্ত্রাংশ আমদানির সুযোগ দেওয়া হলেও ৫০০ সিসি পর্যন্ত বাইক রেজিস্ট্রেশনের কোনো নতুন অনুমতি দেওয়া হয়নি।

আর দেশে তৈরি বাইক রাস্তায় চলবে কি না, সেটি আমদানি নীতির নয়, বিআরটিএর নিবন্ধন ও সড়কে চলাচলের বিধির বিষয়।

তাই নতুন নীতির মূল পরিবর্তন হলো বড় সিসির বাইক আমদানির দরজা খোলেনি, বড় সিসির বাইক দেশে তৈরির দরজা কিছুটা খুলেছে।

করা যাবে এরোপ্লেন ও হেলিকপ্টার আমদানি

এরোপ্লেন ও হেলিকপ্টার আমদানির ক্ষেত্রে নতুন আমদানি নীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯-এর আমদানি-সংক্রান্ত শর্তে বেসামরিক বিমান ও হেলিকপ্টারকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট এয়ার নেভিগেশন অর্ডার ও সার্কুলারের বিধান মেনে নতুন বা পুরোনো দুই ধরনের এয়ারক্রাফট অর্থাৎ এরোপ্লেন ও হেলিকপ্টার, আমদানি করা যাবে।

একই শর্তে এসব উড়োজাহাজের নতুন বা পুরোনো যন্ত্রাংশ, ইঞ্জিন ও ইঞ্জিনের খুচরা যন্ত্রাংশও আমদানির সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ, হেলিকপ্টার আমদানিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় না রেখে নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও বিমান চলাচলবিষয়ক নিয়ম মানার শর্তে আমদানিযোগ্য পণ্য হিসেবে স্পষ্ট করা হয়েছে।
এর আগে আমদানি নীতি আদেশ ২০২১–২০২৪-এ বেসামরিক বিমান বা হেলিকপ্টার আমদানির বিষয়টি আলাদাভাবে উল্লেখ ছিলো না।

নতুন নীতিতে সেটিই স্পষ্ট করে যোগ করা হয়েছে। ফলে পরিবর্তনটি কোনো নির্দিষ্ট মডেল বা আকারের হেলিকপ্টার আমদানির সীমা বাড়ানোর মতো নয়; বরং বেসামরিক হেলিকপ্টার ও এর যন্ত্রাংশ আমদানির আইনি কাঠামোটি এবার আমদানি নীতিতেই পরিষ্কার করা হয়েছে।

খসড়ায় পুরোনো গাড়ি আনার সুযোগ, চূড়ান্ত নীতিতে বাদ

গাড়ির ক্ষেত্রে খসড়া ও চূড়ান্ত আমদানি নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য এসেছে। খসড়ায় পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি আমদানির সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব ছিলো। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে।

আলোচনা-সমালোচনার পর শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত নীতিতে প্রস্তাবটি বাদ দেওয়া হয়েছে। ফলে গাড়ি, জিপ ও বাণিজ্যিক যানবাহনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর বয়সের শর্তই বহাল থাকছে।

অর্থাৎ খসড়ায় যে অতিরিক্ত সুযোগের কথা বলা হয়েছিলো, তা চূড়ান্ত নীতিতে আর রাখা হয়নি।

এতে গাড়ির বাজারে নতুন নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো পুরোনো গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে আগের নিয়ন্ত্রণই থাকছে। পাঁচ বছরের বেশি পুরোনো গাড়ি এনে বাজারজাত করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়নি।

পুরনো গাড়ির বিষয়ে এমন সিদ্ধান্তের একটি বাস্তব দিকও আছে। বাংলাদেশে ব্যবহৃত বা বিলাসবহুল গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে অতীতে স্ক্র্যাপ, যন্ত্রাংশ বা অন্য পণ্যের আড়ালে গাড়ি আনার মতো অভিযোগ ও কৌশল দেখা গেছে। তাই পুরোনো গাড়িকে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের তালিকায় রাখার অর্থ হলো, সরকার এই জায়গায় নিয়ন্ত্রণ একেবারে তুলে দিতে চায় না।

প্রবাসীরা এবার শিল্পে বিনিয়োগে কিছুটা সহজ সুযোগ পাবেন

নতুন আমদানি নীতিতে প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’-কে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে শিল্পে বিনিয়োগের বিষয়টি নীতিতে স্পষ্টভাবে যুক্ত হয়েছে।

ধরুন, একজন প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে একটি অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান করলেন। ওই কারখানার জন্য প্রয়োজন হলো মেশিন, যন্ত্রাংশ বা কাঁচামাল। নতুন নীতিতে এসব পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশি ও তার অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া আমদানির অর্থ পরিশোধে আধুনিক আন্তর্জাতিক পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়ম মানতে হবে।

সহজ করে বললে, নতুন নীতির বিষয়টি হলো প্রবাসীরা আগে থেকেই শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেশিন বা কাঁচামাল আমদানি করতে পারতেন। এবার তাদের আলাদাভাবে নীতির আওতায় এনে শিল্পে বিনিয়োগ ও প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে।

প্রবাসীরা এবার কীভাবে শিল্পে টাকা ও যন্ত্রপাতি আনবেন

নতুন নীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো প্রথমবারের মতো ‘প্রবাসী বাংলাদেশি’-র সংজ্ঞা যুক্ত করা। এর উদ্দেশ্য হলো বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের শুধু টাকা পাঠানোর জায়গায় না রেখে দেশে শিল্পে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।

বিষয়টি সহজ করে বললে প্রক্রিয়াটি এমন। কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি দেশে একটি অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন বা বিনিয়োগ করলেন। সেই প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন হলো কারখানার যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ বা উৎপাদনের কাঁচামাল।

নতুন নীতিতে ওই অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য এসব পণ্য আমদানির ব্যবস্থা সহজ করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনার নিয়ম মেনে আধুনিক আন্তর্জাতিক অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।

অর্থাৎ আগে একজন প্রবাসীকে দেশে বিনিয়োগের পর যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল আনার ক্ষেত্রে যে আমদানি কাঠামোর মধ্য দিয়ে যেতে হতো, নতুন নীতিতে তাঁর অবস্থানটি আলাদা করে স্বীকৃতি দেওয়া হলো। 

রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আনায় বড় পরিবর্তন

নতুন নীতির অন্যতম বড় লক্ষ্য হলো শুধু আমদানি বাড়ানো নয়, আমদানি করা পণ্য দিয়ে রপ্তানি বাড়ানো।

ধরা যাক, বাংলাদেশের একটি পোশাক কারখানা বিদেশি ক্রেতার কাছ থেকে একটি নির্দিষ্ট ধরনের পোশাকের আদেশ পেল। সেই পোশাক তৈরির জন্য যে সুতা, কাপড়, বোতাম, আনুষঙ্গিক উপকরণ বা বিশেষ ধরনের কাঁচামাল দরকার, তার সবকিছু দেশে পাওয়া গেলো না। তখন কারখানাটিকে বিদেশ থেকে সেগুলো আনতে হবে।

নতুন নীতিতে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। এমনকি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে বিনা মূল্যে বা ‘বিনা মূল্যে প্রেরিত’ ভিত্তিতে কাঁচামাল আনার সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। এর লক্ষ্য হলো রপ্তানির বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং বেশি মূল্য সংযোজন হয় এমন পণ্য তৈরি করা।

একজন রপ্তানিকারকের দৃষ্টিতে এর সরাসরি অর্থ হলো, বিদেশি ক্রেতার আদেশ পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় উপকরণ জোগাড় করতে যদি বিদেশ থেকে নির্দিষ্ট কাঁচামাল আনতে হয়, সেই আমদানির পথ আগের চেয়ে বিস্তৃত হচ্ছে। এতে উৎপাদনের সময় কমানো এবং ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পণ্য তৈরির সুযোগ বাড়তে পারে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, পোশাকের মতো রপ্তানিমুখী খাতের নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানকেও রপ্তানির জন্য কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি স্বাগত জানিয়েছেন বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম।

ব্যবসায়ীদের আপত্তি

এখানেই নতুন নীতির একটি বড় দ্বন্দ্ব। একদিকে সরকার বলছে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল আনার সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

অন্যদিকে নীতির ২৫ অনুচ্ছেদের ১২ নম্বর উপঅনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নিট ফেব্রিক আমদানিযোগ্য হবে না। এই বিধান বাতিল বা স্থগিতের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্পের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ।

বিষয়টি কেন গুরুত্বপূর্ণ? কারণ একটি পোশাক কারখানা সব সময় একই ধরনের কাপড় ব্যবহার করে না।

বিদেশি ক্রেতা কোনো নির্দিষ্ট রং, নকশা, গুণমান বা ধরনের কাপড় চাইতে পারেন। বাংলাদেশের কোনো কারখানায় সেই কাপড় তৈরি না হলে সেটি বিদেশ থেকে আনতে হবে। কিন্তু নীতিতে যদি নিট ফ্যাব্রিক আমদানির পথ বন্ধ থাকে, তাহলে কারখানাটি ক্রেতার চাহিদা অনুযায়ী পোশাক তৈরি করতে সমস্যায় পড়তে পারে।

বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাণিজ্যমন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে বলেছেন, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের চাহিদা প্রতিনিয়ত বদলায়। নির্দিষ্ট মান, ধরন, রং বা নকশার কাপড় কখনো বিদেশ থেকে সংগ্রহ করতেই হয়।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আবার বিনা মূল্যে আনা কাঁচামালের ক্ষেত্রে ৪০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত নিয়েও আপত্তি তুলেছেন।

তার যুক্তি, অন্য ক্ষেত্রে যেখানে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের কথা বলা হয়েছে, বিনা মূল্যে আনা কাঁচামালের ক্ষেত্রে কেন ৪০ শতাংশ হবে?

তার মতে, এ ধরনের পণ্যও নিরাপদে রপ্তানি করা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে জরুরি পরিবহন খরচও বিদেশি ক্রেতা বহন করেন।

অর্থাৎ ব্যবসায়ীদের আপত্তি নীতির ‘কাঁচামাল আনার সুযোগ’ নিয়ে নয়। আপত্তি হচ্ছে কোন কাঁচামাল আনা যাবে, কতটা শর্তে আনা যাবে এবং সেই শর্ত বাস্তবে রপ্তানিকারকের জন্য কতটা কার্যকর হবে এ নিয়ে।

নিয়ন্ত্রিত পণ্যের নিয়ম শিথিল করতে পারবে

নতুন আমদানি নীতিতে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারকে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এসব পণ্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ নয়, তবে আমদানিতে নির্দিষ্ট শর্ত ও অনুমোদন লাগে

তালিকায় রয়েছে ফার্নেস অয়েল, পেট্রোলিয়াম বিটুমিন, নির্দিষ্ট কীটনাশক, সামুদ্রিক মাছ ধরার কিছু জাল, শর্তসাপেক্ষে পুরোনো মোটরগাড়ি ও কিছু যন্ত্রাংশসহ বিভিন্ন পণ্য।
তবে জনস্বার্থে সরকার সাধারণ বা বিশেষ আদেশ দিয়ে এসব পণ্যের আমদানির শর্ত শিথিল করতে পারবে।

খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি বাড়ানো, নতুন বিনিয়োগ আনা, রপ্তানি বাজার ধরে রাখা, বাণিজ্য সহজ করা কিংবা আন্তর্জাতিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের প্রয়োজন হলে এই সুযোগ ব্যবহার করা যাবে।

সহজ করে বললে, কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত কোনো পণ্য দ্রুত আমদানি করা দরকার হলে, পুরো নীতি বদলানোর অপেক্ষা না করে সরকার আদেশের মাধ্যমে তার আমদানির শর্ত সহজ করতে পারবে।

মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় গুদাম ইস্যু

নতুন আমদানি নীতিতে মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল ও কেন্দ্রীয় শুল্ক-সুবিধাপ্রাপ্ত গুদাম প্রতিষ্ঠার সুযোগ রাখা হয়েছে। এর ফলে আমদানি করা পণ্য এক জায়গায় সংরক্ষণ করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে পরে আবার রপ্তানি করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিষয়টি সহজ করে ধরুন। একজন ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ কাঁচামাল আনলেন। প্রতিটি কারখানাকে আলাদাভাবে সব কাঁচামাল আমদানি ও সংরক্ষণ করতে না হয়ে যদি সেগুলো একটি কেন্দ্রীয় গুদামে রাখা যায়, তাহলে সরবরাহ ব্যবস্থাপনা সহজ হতে পারে। বিশেষ করে রপ্তানিমুখী শিল্পে এতে সময় ও খরচ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আর মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলে আমদানি করা পণ্য নির্দিষ্ট নিয়মে সংরক্ষণ, ব্যবহার বা প্রক্রিয়াজাত করে পরে পুনঃরপ্তানি করা যায়। ফলে আমদানি থেকে উৎপাদন এবং আবার রপ্তানি পুরো প্রক্রিয়াটি আরও সহজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বাড়বে। তাই কম সময়ে, কম খরচে পণ্য আনা, সংরক্ষণ ও সরবরাহের সক্ষমতা বাড়ানো ব্যবসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নতুন নীতিতে এই ব্যবস্থার সুযোগ রাখা হয়েছে মূলত সেই প্রয়োজনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।

পণ্যের পরিচয় নিয়ে জটিলতা কমানোর চেষ্টা

আরেকটি পরিবর্তন সাধারণ মানুষের কাছে ছোট মনে হলেও আমদানিকারকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির সময় প্রতিটি পণ্যের একটি এইচএস কোড থাকে। এই কোড দিয়ে পণ্যটি কোন শ্রেণির এবং তার ওপর কী ধরনের শুল্ক ও বিধিনিষেধ প্রযোজ্য, তা নির্ধারণ করা হয়।

কিন্তু পণ্যের বর্ণনা ও এইচএস কোডের মধ্যে অমিল থাকলে কাস্টমসে জটিলতা তৈরি হতে পারে। পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে, অতিরিক্ত কাগজপত্র বা ব্যাখ্যার প্রয়োজন হতে পারে এবং পণ্য খালাসে সময়ও বাড়তে পারে।

নতুন নীতিতে পণ্যের বর্ণনা, শ্রেণিবিন্যাস ও কাগজপত্রের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ নতুন আমদানি নীতিতে শুধু আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার কথা বলা হয়নি; পণ্যটি আসলে কী এবং কোন শ্রেণিতে পড়বে এই জায়গার জটিলতাও কমানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

তবে বাস্তবে এর সুফল কতটা পাওয়া যাবে, তা নির্ভর করবে কাস্টমস ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো নিয়মটি কীভাবে প্রয়োগ করে তার ওপর।

২৮ শ্রেণির পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ

আমদানি সহজ করার সুযোগ থাকলেও সব পণ্যের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়নি। নতুন নীতিতে ২৮ শ্রেণির পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।

এর মধ্যে বিভিন্ন পুরোনো ও ব্যবহৃত পণ্য, ব্যবহৃত মোটরসাইকেল এবং পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে এমন কিছু পণ্য রয়েছে।

নতুন করে নিষিদ্ধ তালিকায় যুক্ত হয়েছে প্রাণিজ উৎসের মাংস ও হাড়ের প্রক্রিয়াজাত গুঁড়া, পুরোনো বা ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং গিলনেট বা কারেন্ট জাল।

অর্থাৎ নতুন আমদানি নীতিকে শুধু ‘আমদানি খুলে দেওয়া’ হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটা পাওয়া যাবে না। যেখানে ব্যবসা সহজ করার প্রয়োজন, সেখানে সুযোগ বাড়ানো হয়েছে।

আবার কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা রাখা হয়েছে। আর নিয়ন্ত্রিত পণ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে শর্ত শিথিল করার ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতি শুধু আমদানি সহজ করা বা এলসি-নির্ভরতা কমানোর নীতি নয়। ব্যবসার জন্য বড় অঙ্কের আমদানিতে বিকল্প পথ তৈরি, রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল আনার সুযোগ বাড়ানো, প্রবাসীদের শিল্প বিনিয়োগে সুবিধা দেওয়া এবং পণ্য সংরক্ষণ ও সরবরাহের অবকাঠামো শক্ত করার চেষ্টা আছে।

আবার কিছু পণ্যে নিষেধাজ্ঞা বহাল বা নতুন করে আরোপ করা হয়েছে, কিছু আমদানিতে শর্ত রাখা হয়েছে। বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রিত পণ্যের শর্ত শিথিল করার ক্ষমতাও সরকারকে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, নতুন নীতিতে একদিকে ব্যবসার পথ কিছুটা খোলা হয়েছে, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ বা সংবেদনশীল পণ্যে নিয়ন্ত্রণ রাখা হয়েছে আর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিয়ম সামঞ্জস্য করার ক্ষমতাও সরকারের হাতে রাখা হয়েছে।