বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি করা মার্কিন ক্রেতাদের হাতেও এখন ফিরছে সেই বাড়তি শুল্কের টাকা, যার চাপ একসময় বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদেরও নিতে হয়েছিল। এর বড় উদাহরণ কার্টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের শিশু ও ছোট বাচ্চাদের পোশাকের অন্যতম বড় এই বিক্রেতা ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ডলার বাড়তি শুল্ক ফেরত পেয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় ৪০ লাখ ডলার সুদ যোগ হয়ে মোট ফেরতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৩ কোটি ২০ লাখ ডলার।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, এই অর্থ তাদের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মুনাফাতেও বড় প্রভাব ফেলেছে। অথচ ২০২৫ সালে কার্টার্স তাদের মোট পণ্যের প্রায় ৭১ শতাংশ সংগ্রহ করেছে বাংলাদেশসহ বাকি চার দেশ ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও ভারত থেকে।
গল্পের শুরুটা অবশ্য ২০২৫ সালে। ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি শুল্ক বসায়। পরে এসব শুল্ক আরোপের আইনি ভিত্তি নিয়ে মামলা হয়। ২০২৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দেয়, যে আইনের ভিত্তিতে ট্রাম্প প্রশাসন এসব শুল্ক আরোপ করেছিল, সেই আইনে প্রেসিডেন্টের এমন শুল্ক বসানোর ক্ষমতা নেই।
এরপর শুরু হয় আগে আদায় করা শুল্ক ফেরতের প্রক্রিয়া। এখন সেই ফেরতের টাকা দ্রুতই মার্কিন আমদানিকারকদের হাতে যাচ্ছে।
জুলাইয়ের শেষ নাগাদ প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার দায়ের মধ্যে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে পরিশোধ করা হয়েছে।
এখন সেই টাকা থেকে নিজেদের অর্থ দাবি করছেন বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রপ্তানিকারকরা। কিন্তু কেন? চাইলেই কি পাওয়া যাবে অর্থ?
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের দাবি
ট্রাম্প প্রশাসন যখন বাড়তি শুল্কের আইন চাপায়, বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের ওপরও আসে সেই বাড়তি খরচের চাপ। তখন অনেক মার্কিন ক্রেতা বা আমদানিকারক বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদেরও সেই খরচের অংশ বহন করতে বলেন।
“অর্ডার ধরে রাখতে অনেকেই তখন পণ্যের দাম কমিয়ে বা বাড়তি খরচের অংশ শেয়ার করে নিয়ে ছিলেন। কেউ মূল্যছাড় দিয়ে, কেউ আবার নিজেদের মুনাফার অংশ কমিয়ে ছিলেন,” বলে আলাপ-কে জানান বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আলাপকে বলেন, ক্রেতারা যখন শুল্কের টাকা ফেরত পাচ্ছেন, তখন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে শুল্ক সামলাতে যে অর্থ কম নেওয়া হয়েছিল, সেটিও ফেরত দেওয়া উচিত।
তার ভাষায়, “সরবরাহকারীদের কাছ থেকে যে অর্থ কেটে নেওয়া হয়েছিল, ফেরত পাওয়া অর্থ থেকে কোনো না কোনোভাবে সেই অর্থ তাদের ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।”
এখানে যুক্তিটা সরল। শুল্ক আইনগতভাবে পরিশোধ করেছে মার্কিন আমদানিকারক। কিন্তু সেই শুল্কের প্রভাব সবসময় শুধু আমদানিকারকের ওপর থাকেনি। অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতা দর-কষাকষি করে সরবরাহকারীর কাছ থেকে পণ্যের দাম কমিয়েছে। ফলে সরবরাহকারীর আয় কমেছে।
এখন সেই ক্রেতাই যদি আগের দেওয়া শুল্ক ফেরত পায়, তাহলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকের প্রশ্ন—যে অর্থ বাঁচাতে আমাদের পণ্যের দাম কমানো হয়েছিল, তার সুবিধা পুরোটা ক্রেতা কেন পাবে? এই প্রশ্নটা যে শুধু বাংলাদেশের এমন নয়। এটা যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করা অন্যান্য দেশের রপ্তানিকারকদেরও।
কতটা চাপ পড়েছিল বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের ওপর?
এই হিসাবের সুনির্দিষ্ট তথ্য এখনো নেই। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ—দুই সংগঠনের কাছেই রপ্তানিকারকেরা মোট কত টাকা বা কত শতাংশ শুল্কের বোঝা নিজেদের ওপর নিয়েছিলেন, তার পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
চট্টগ্রামের এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী ভাষায়, “তখন আমরা ক্রেতাদের সঙ্গে বাড়তি খরচের এক-তৃতীয়াংশ ভাগ করে নিয়েছিলাম। কিছু ক্ষেত্রে অর্ধেক পর্যন্ত দিয়েছি।”
এইচকেসি অ্যাপারেলসের রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে যায়। ফলে প্রতিষ্ঠানটির মতো যেসব কারখানা মার্কিন বাজারের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তাদের জন্য এই ফেরতের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এটাও সত্যি সবাই চাপ দেয়নি। বিজেএমইর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল আলাপ-কে বলেন “সব ক্রেতা সমানভাবে চাপ দেয়নি। কারও ক্ষেত্রে কোনো চাপ ছিলো না, আবার কেউ বড় ধরনের মূল্যছাড় চেয়েছে। তবে পুরো বিষয়টা ছিলো দ্বিপাক্ষিক। এখানে সরকার বা অন্য কেউ ছিলো না।”
তবে যারা ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড ব্যবস্থায় পণ্য পাঠিয়েছেন, তাদের ওপর সরাসরি বাড়তি শুল্কের বোঝা পড়েছে।
সহজ ভাষায়, ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড (এলডিপি) হলো, যখন বিক্রেতাই শিপিং, কাস্টমস, শুল্ক ও কর সব খরচ বহন করেন। অর্থাৎ পণ্য বিক্রি থেকে শুরু করে ক্রেতার দরজায় পৌঁছানো পর্যন্ত সব খরচের দায়িত্ব বিক্রেতার। ডেলিভার্ড ডিউটি পেইডের (ডিডিপি) এরই সমার্থক।
বাংলাদেশের বেশিরভাগ পোশাক রপ্তানি হয় ফ্রি অন বোর্ড (এফওবি) ব্যবস্থায়। অর্থাৎ সাধারণভাবে মার্কিন ক্রেতাই আমদানি পর্যায়ের শুল্ক দেয়।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু গণমাধ্যমকে বলেছেন, “বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্রগামী পোশাকের ৯০ শতাংশের বেশি এফওবি ব্যবস্থায় যায়। ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড ব্যবস্থার অংশ ১০ শতাংশেরও কম।”
বাংলাদেশ একা নয়
বাংলাদেশি রপ্তানিকারকদের মতো চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের ব্যবসায়ীরাও এখন ভাবছে—মার্কিন আমদানিকারকরা শুল্ক ফেরত পেলেও সেই সুবিধার কতটা সরবরাহকারীদের কাছে পৌঁছাবে। তবে তিন দেশের অবস্থান এক নয়।
২৩এ এপ্রিল ২০২৬ চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়ংচিয়েন বলেন, “শুল্ক ফেরতের উদ্যোগ ভুল পথ সংশোধনের ইতিবাচক পদক্ষেপ।”
চীনা রপ্তানিকারকদের তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ করে নিজেদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষার পরামর্শ দেন। অর্থাৎ বেইজিংয়ের বার্তা সরাসরি রিফান্ড দাবি নয়, বরং মার্কিন ক্রেতাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করে নিজেদের পাওনা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর ২০২৫ সালে একপর্যায়ে ভিয়েতনামের পণ্যে বাড়তি শুল্ক ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত উঠেছিল। ১৫ই এপ্রিল ২০২৬ ইনভেস্টিফাই জানায়, শুল্ক ফেরতের সুযোগ দেশটির রপ্তানিকারকদের জন্য ইতিবাচক হলেও টাকা সরাসরি কারখানায় যাবে না। কে শুল্কের খরচ বহন করেছে, চুক্তিতে কী ছিল এবং মার্কিন আমদানিকারকের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় হচ্ছে—তার ওপরই নির্ভর করবে সুবিধা।
ফলে ভিয়েতনামেও মূল প্রশ্ন, মার্কিন ক্রেতা রিফান্ড পাওয়ার পর সরবরাহকারীর জন্য কতটা রাখবে।
২২এ এপ্রিলের টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, শুল্কের চাপ সামলাতে অনেক ভারতীয় রপ্তানিকারক পণ্যের দামে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়েছিলেন। এখন তারা সেই ছাড়ের অন্তত একটি অংশ ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
ভারতীয় রপ্তানিকারক সংগঠনের মহাপরিচালক অজয় সাহাই বলেন, “বেশিরভাগ রিফান্ড যাবে মার্কিন ক্রেতার কাছে, তাই ভারতীয় রপ্তানিকারকদের টাকা ফেরত পাওয়া শেষ পর্যন্ত ক্রেতার সঙ্গে আলোচনার ওপরই নির্ভর করবে।”
বাংলাদেশের সামনে পথ কী?
চীন, ভারত ও ভিয়েতনামেও সরবরাহকারীদের কৌশল এখন প্রায় একই—সরাসরি সরকারি রিফান্ডের অপেক্ষায় না থেকে মার্কিন ক্রেতার সঙ্গে আলোচনা করে শুল্কের সময় দেওয়া ছাড় বা বহন করা খরচের একটি অংশ ফেরত নেওয়া।
বাংলাদেশকেও একই পথে হাঁটতে হবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা। কারণ মার্কিন সরকার বাংলাদেশ বা রপ্তানিকারক দেশগুলোর গার্মেন্টস কারখানাগুলোকে সরাসরি রিফান্ড দিচ্ছে না।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু গণমাধ্যমকে বলেন, “যদি কেউ আলোচনা করে থাকে, তারা নিজেদের উদ্যোগেই করছে। যারা খরচের বড় একটি অংশ বহন করেছেন, তারা ক্রেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারেন। আমরা মনে করি, সরাসরি অর্থ ফেরত না পেলেও বাড়তি ব্যবসার মাধ্যমে এই খরচ পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।”
তবে ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড ব্যবস্থায় যারা পণ্য পাঠিয়েছেন, তাদের জন্য সরাসরি আইনি পথে শুল্ক ফেরতের সুযোগও থাকতে পারে।
বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবুর ভাষায়, “যারা ল্যান্ডেড ডিউটি পেইড শর্তে রপ্তানি করেছেন, তারা আইনজীবী নিয়োগ করে অর্থ ফেরতের দাবি করতে পারেন। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন আইনজীবী এসে আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।”
অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধু ক্রেতার সঙ্গে দর-কষাকষির নয়; কিছু রপ্তানিকারকের জন্য সরাসরি আইনি দাবির পথও খোলা থাকতে পারে।
তবে পুরো বিষয়টি ক্রেতা-বিক্রেতার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কর ওপরই নির্ভর করবে বলে মনে করেন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল।
“অফিসিয়ালি তারা তো বাধ্য না। তাই এখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভিত্তিতেই ফেরত চাইতে হবে। তারা আগে যেভাবে সমঝোতার ভিত্তিতে ছাড় দিয়েছেন এখন সেভাবেই চাইতে হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
কিন্তু চাইলেও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা আইন-কানুন অনুযায়ী সরাসরি কোনো অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব না। তাহলে সেটা কীভাবে সম্ভব হতে পারে?
ব্যবসায়ীরা এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিকল্প ব্যবস্থার কথা বলছেন।
এখন সেটা হতে পারে পণ্যের দাম অর্থাৎ নতুন অর্ডারগুলোতে দাম বাড়িয়ে দিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে। অথবা আগের তুলনায় অর্ডার বাড়িয়ে দিয়ে।
মার্কিন ক্রেতারাও কি রপ্তানিকারকদের ক্ষতিপূরণ দিতে চান?
শুল্ক ফেরতের কার্যক্রম কোনো দেশের রপ্তানিকারকদের জন্য আনুষ্ঠানিভাবে শুরু না হলেও সম্ভাবনা কিন্তু তৈরি হয়েছে। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ভিএফ করপোরেশন।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের ২০এ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিশোধ করা প্রায় ১৪ কোটি ৯৭ লাখ ডলার শুল্ক ফেরতের দাবি করে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত তারা প্রায় ৪ কোটি ৯০ লাখ ডলার ফেরত পায়।
ভিএফ জানিয়েছে, ফেরত পাওয়া শুল্কের অর্থ থেকে নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহকারী ও অংশীদারকে তারা টাকা দিবে। যার পরিমাণ তারা হিসাব করেছে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলার।
এখানেই আশার আলো কারণ ভিএফের প্রধান সংগ্রহের বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে ভিয়েতনাম, বাংলাদেশ, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়া।
তবে এই অর্থের কতটা কোন দেশ পাবে তা প্রকাশ করা হয়নি।
অর্থাৎ কার্টার্সের মতো প্রতিষ্ঠানের রিফান্ড দেখাচ্ছে মার্কিন আমদানিকারকেরাই শুল্ক ফেরত পাচ্ছেন। আর ভিএফ করপোরেশনের হিসাব দেখাচ্ছে, কিছু ক্ষেত্রে সরবরাহকারীদের দেওয়ার দায়ও রিফান্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, শুল্কের সময় বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা যে খরচ বহন করেছিলেন, তার কতটা বাস্তবে বাংলাদেশে ফিরে আসে।