সহসাই কাটছে না গ্যাস সংকট

একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি গ্যাস সংকটকে আরও প্রকট করলেও সংকটের শুরু সেখান থেকে নয়।

বছরের পর বছর নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে ধীরগতি, কমতে থাকা দেশীয় উৎপাদন, আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকা এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা- সব মিলিয়ে সংকট এখন তীব্র রূপ নিয়েছে। 

ফলে সরকার একের পর এক উদ্যোগ নিলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সহসাই এই সংকট কাটার সম্ভাবনা নেই।

মহেশখালীর একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প, বিদ্যুৎ, সিএনজি স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকদের ওপর।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকছে না। অনেক শিল্পকারখানায় কম চাপের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সিএনজি স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইনের চিত্র দেখা যাচ্ছে।

এমনকি গ্যাস সংকটে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বেড়েছে বিদ্যুত ঘাটতি।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বরং একটি টার্মিনালের ত্রুটি শুধু দীর্ঘদিনের দুর্বলতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।

শিল্প থেকে রান্নাঘর বাড়ছে গ্যাস সংকট

গ্যাসের ঘাটতি এখন শুধু আবাসিক গ্রাহকদের রান্নাঘরেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে পুরো অর্থনীতি ও দৈনন্দিন জীবনে।

মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির পর জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হওয়ায় শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

ফলে অনেক কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও বয়লার চালানো যাচ্ছে না, আবার কোথাও উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে ডিজেল, ফার্নেস অয়েল বা এলপিজির মতো ব্যয়বহুল বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে, যা উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে বিদ্যুত উৎপাদনেও। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোতে জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুত উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে। একই সঙ্গে সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় দীর্ঘ লাইন সৃষ্টি হচ্ছে, যা পরিবহন খাতেও প্রভাব ফেলছে।

সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরা। রাজধানীর অনেক এলাকায় দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। অনেক পরিবারকে গভীর রাতে রান্না করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ এলপিজির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। অথচ গ্যাস না পেলেও আবাসিক গ্রাহকদের বিল দিতে হচ্ছে প্রতি মাসে।

বছরের পর বছর ধরে গ্যাসের সমস্যায় থাকা ধানমন্ডির বাসিন্দা নাজমা বেগম আলাপ-কে বলেন, “গত কয়েক বছর ধরেই মধুবাজারে গ্যাসের চাপ নাই। বার বার বলেও কোনো লাভ হয়নি। সরকার আসে সরকার যায় সমস্যার সমাধান হয় না। আমরা গ্যাসের মিটার চাই, ন্যায্য বিল চাই, হয়রানিমুক্ত গ্যাস চাই। এটা এখন সরকারি চাঁদাবাজি হয়ে গেছে। গ্যাস নেই কিন্তু প্রতি মাসে এক হাজার ৮০ টাকা বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। যা অন্যায় চাপ।”

কমছে দেশীয় গ্যাস, বাড়ছে উৎপাদনের ঘাটতি

পেট্রোবাংলার হিসাব বলছে, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। 

অথচ স্বাভাবিক সময়েও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায় গড়ে প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রতিদিনই প্রায় ১১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থাকে। 

সম্প্রতি একটি ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটির পর এই ঘাটতি আরও বেড়েছে।

সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হিসেবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদনের ধারাবাহিক পতনকে দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।

পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোর পরিচালিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন ৮৪৯ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে ৭০৯ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অর্থাৎ এই সময়ে উৎপাদন কমেছে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট।

অবশ্য দেশের উৎপাদিত গ্যাসের অর্ধেকই উত্তোলন করে আমেরিকান কোম্পানি শেভরন। কমেছে তাদেরও উৎপাদন।  

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলোর বেশিরভাগই এখন 'ম্যাচিউর' বা পরিণত পর্যায়ে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের কারণে ভূগর্ভস্থ রিজার্ভারের প্রাকৃতিক চাপ কমে যাওয়ায় একই কূপ থেকে আগের মতো গ্যাস উঠছে না। ফলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে উৎপাদন কমতেই থাকবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম আলাপ-কে বলেন, “পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমবে, এটি বহু বছর ধরেই জানা ছিল। কিন্তু সেই ঘাটতি পূরণে পর্যাপ্ত অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খনন করা হয়নি। এখন আমরা সেই সিদ্ধান্তহীনতার মূল্য দিচ্ছি।”

বাস্তবে বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের শিকড় আরও গভীরে।

একদিনে তৈরি হয়নি সংকট

বর্তমান পরিস্থিতিকে অনেকেই শুধু একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটির ফল হিসেবে দেখছেন। যা ঠিক হতে অন্তত দুই সপ্তাহ লাগবে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।

কিন্তু সংশ্লিষ্টরা বলছেন এতে হয়ত আপাত সমস্যার কিছুটা সমাধান হবে তবে বাস্তবে বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের শিকড় আরও গভীরে।

গত এক দশকে দেশে শিল্পায়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, সিএনজি ও আবাসিক খাতে গ্যাসের চাহিদা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্রগুলো পরিণত (ম্যাচিউর) পর্যায়ে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদনের কারণে এসব ক্ষেত্রের প্রাকৃতিক চাপ কমে যাওয়ায় উৎপাদনও কমেছে। অন্যদিকে নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হয়নি। অনশোর ও অফশোর—দুই ক্ষেত্রেই অনুসন্ধানের গতি ছিল প্রত্যাশার তুলনায় ধীর।

ফলে দেশীয় উৎপাদনের ঘাটতি পূরণে ২০১৮ সাল থেকে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়তে থাকে। এখন এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে একটি এলএনজি টার্মিনালে সামান্য ত্রুটিও সারা দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে বড় সংকট সৃষ্টি করছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, বর্তমান সংকটের সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়।

আলাপ-কে বলেন, “গ্যাসের ঘাটতি আজ তৈরি হয়নি। বহু বছর পর্যাপ্ত অনুসন্ধান না হওয়ার ফল এখন আমরা ভোগ করছি। আজ অনুসন্ধান বাড়ালেও তার ফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগবে।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো, নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার, জ্বালানির বহুমুখীকরণ এবং দক্ষ চাহিদা ব্যবস্থাপনা সবগুলো বিষয়েই একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নইলে একই ধরনের সংকট বারবার ফিরে আসবে।

ধীরগতির অনুসন্ধান, প্রকট উৎপাদন ঘাটতি

বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকটের পেছনে শুধু গ্যাসক্ষেত্রের স্বাভাবিক অবক্ষয় নয়, দীর্ঘদিনের দুর্বল অনুসন্ধান কার্যক্রমও বড় কারণ।

সরকার ১৫০টি কূপ খননের উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি নিলেও বাস্তব চিত্র আশাব্যঞ্জক নয়।

চার বছরে এই কর্মসূচির মাধ্যমে অতিরিক্ত যোগ হয়েছে মাত্র ১২৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

একই সময়ে পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমেছে ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে নতুন উৎপাদন পুরোনো ক্ষয়ও পূরণ করতে পারেনি।

বাপেক্স গত কয়েক বছরে একাধিক অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খনন করলেও বড় কোনো নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়নি।

অন্যদিকে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির এক দশকের বেশি সময় পার হলেও অফশোর অনুসন্ধানও প্রত্যাশিত গতি পায়নি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাস শেষ হয়ে যাওয়া নয়; সমস্যা হলো সময়মতো অনুসন্ধান না করা। গত বহু বছর ধরে সরকার দেশের ভেতর তেল, গ্যাস অনুসন্ধানে সেভাবে বড় পরিকল্পনা করেনি। আর নতুন গ্যাস খোঁজার কাজ ধারাবাহিকভাবে না হলে উৎপাদন কমবেই। কারণ গ্যাস তুলতে থাকলে স্বাভাবিকভাবেই কূপগুলোর চাপ কমবে।”

এদিকে পেট্রোবাংলা এখন দেশীয় উৎপাদন বাড়াতে নতুন রিগ কেনা, ১৫০টি কূপ খনন এবং ওয়ার্কওভার কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনা নিয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাপেক্স চলতি বছর অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের গতি বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, আগামী কয়েক বছরে কয়েক ডজন নতুন কূপ খনন করে দেশীয় উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাস যুক্ত করা।

এর পাশাপাশি তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা, বাখরাবাদসহ পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে ওয়ার্কওভার ও উন্নয়ন কূপ খননের মাধ্যমে উৎপাদন ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। কারণ নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের আগ পর্যন্ত পুরোনো ক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব উদ্যোগের সুফল পেতে আরও কয়েক বছর সময় লাগবে।

বাড়ছে আমদানি নির্ভরতা

দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় ২০১৮ সালে প্রথমবারের মতো এলএনজি আমদানি শুরু করে বাংলাদেশ। শুরুতে এটি ছিল ঘাটতি পূরণের একটি পরিপূরক ব্যবস্থা। কিন্তু এখন এটি জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় প্রতিদিন প্রায় ৯৫ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়, যা মোট সরবরাহের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।

ফলে যে কোনো একটি টার্মিনালে প্রযুক্তিগত ত্রুটি, বৈরী আবহাওয়া বা আন্তর্জাতিক সরবরাহ বিঘ্নিত হলেই দেশের গ্যাস ব্যবস্থা বড় ধাক্কা খায়। সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ডের পর একটি এফএসআরইউর সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় শিল্প, বিদ্যুৎ ও আবাসিক খাতে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

এদিকে এলএনজি আমদানির ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ১০৯টি এলএনজি কার্গো আমদানিতে প্রায় ৩ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান সম্প্রতি বলেন, ”দেশীয় গ্যাসের মজুত কমে যাওয়ায় এলএনজি আমদানি বাড়ানো ছাড়া উপায় নেই। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় অনুসন্ধান ও উৎপাদনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”

সরকারের নয়া পরিকল্পনা

গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকার এখন স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি দুই ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।

পেট্রোবাংলা বলছে, একদিকে পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রে নতুন উন্নয়ন কূপ খননের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। অন্যদিকে কূপগুলোর মেরামত ও সক্ষমতা বৃদ্ধি বাড়িয়ে উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

অর্থাৎ স্থল ও সমুদ্রে নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি আমদানির সক্ষমতা বাড়ানো, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামোর আধুনিকায়ন এবং নতুন ভাসমান এলএনজি (এফএসআরইউ) টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ এবং বাপেক্সের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরে অনশোরে নতুন অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ খননের মাধ্যমে দেশীয় উৎপাদনে অতিরিক্ত গ্যাস যোগ করার চেষ্টা করা হবে। 

একই সঙ্গে তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা, বাখরাবাদ ও রশিদপুরের মতো পরিণত গ্যাসক্ষেত্রে ওয়ার্কওভার করে উৎপাদন ধরে রাখার উদ্যোগ চলছে।

দীর্ঘমেয়াদে সরকারের সবচেয়ে বড় ভরসা এখন বঙ্গোপসাগরের অফশোর গ্যাস।

২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সালিশে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার পায়।

তখন আশা করা হয়েছিল, বঙ্গোপসাগরে মিয়ানমার ও ভারতের মতো বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার হবে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় নতুন দিগন্ত খুলবে।

কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ পায়নি।

সমুদ্র বিজয়ের পর বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে ব্লক দেওয়া হলেও কম গ্যাসের মূল্য, চুক্তির অনাকর্ষণীয় শর্ত এবং অনুসন্ধানের উচ্চ ব্যয়ের কারণে কনোকোফিলিপসের মতো প্রতিষ্ঠান কাজ ছেড়ে চলে যায়।

এরপর নতুন বিনিয়োগও কার্যত থমকে যায়। ফলে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের বিশাল অংশে এখনো কোনো অনুসন্ধানই হয়নি।

নতুন করে গভীর ও অগভীর সমুদ্রের মোট ২৬টি ব্লকে বিদেশি তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ও অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ দিতে যাচ্ছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬’-এর ঘোষণা দেওয়া হয়।

আনুষ্ঠানিক এ ঘোষণার পর আগামী ১লা জুন থেকে আগ্রহী প্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্রের প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করতে পারবে বলে জানানো হয়।

একই সঙ্গে সমুদ্রে পরিচালিত জরিপের তথ্যও কেনার সুযোগ থাকবে। দরপত্র কেনা ও জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০এ নভেম্বর।

এরই মধ্যে ৫৫টি আন্তর্জাতিক কোম্পানিকে সরাসরি ই-মেইলের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানিয়েছে পেট্রোবাংলা।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দরপত্র আহ্বান করলেই গ্যাস পাওয়া যায় না। প্রথমে ব্লক বরাদ্দ, এরপর দুই ও তিন মাত্রিক (২ডি ও ৩ডি) সিসমিক জরিপ, সম্ভাব্য মজুত চিহ্নিতকরণ, অনুসন্ধান কূপ খনন, কূপ পরীক্ষা, উন্নয়ন কূপ খনন এবং শেষে বাণিজ্যিক উৎপাদন এই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হতে সাধারণত চার থেকে সাত বছর, অনেক ক্ষেত্রে তারও বেশি সময় লাগে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম মনে করেন, বাংলাদেশের অবশিষ্ট বড় গ্যাস সম্ভাবনার উল্লেখযোগ্য অংশই এখন ‘অফশোরে’ অর্থাৎ সমুদ্রে।

সহসাই সমাধান নেই কেন?

স্থলভাগে নতুন কূপ খনন এবং সমুদ্রে অনুসন্ধান জোরদারের পাশাপাশি সরকার এলএনজি আমদানির সক্ষমতাও বাড়াচ্ছে। মহেশখালীতে আরও একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। 

একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তিও বাড়ানো হচ্ছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বিঘ্নিত হলেও দেশে গ্যাসের সংকট কিছুটা সামাল দেওয়া যায়।

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এলএনজি ঘাটতি পূরণের একটি উপায় হলেও এটি কখনোই দেশীয় উৎপাদনের বিকল্প হতে পারে না। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ বাড়ে। আবার বৈরী আবহাওয়া, প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে সমস্যা দেখা দিলেই এর প্রভাব সরাসরি দেশের গ্যাস সরবরাহে পড়ে।

চলমান সংকট দ্রুত কাটবে না বলে মনে করেন সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর।

আলাপ-কে তিনি বলেন, "একটি এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় সরবরাহ কমেছে। অন্যদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনও কমছে। নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্রের খবরও নেই। বিদেশ থেকে আরও এলএনজি আনলেও সেটি পুরোপুরি সরবরাহ করা সব সময় সম্ভব হবে না। তাই সহসাই এই সংকট কাটবে বলে মনে হয় না।"

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, গ্যাসের সংকট আরও বাড়বে। ফলে নতুন উৎস থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্যাস যোগ না হলে বর্তমান ঘাটতি আরও প্রকট হতে পারে। এতে আমদানি করেও সংকট মেটানো যাবে না। না কারণ অতিরিক্ত চাপ নেওয়ার মতো সঞ্চালন লাইন নেই।

অন্যদিকে নতুন কূপ খনন করলেই সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস পাওয়া যায় না। একটি কূপ খনন, পরীক্ষা এবং বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনে আনতে সাধারণত এক থেকে দুই বছর সময় লাগে। ফলে এসব উদ্যোগের সুফলও তাৎক্ষণিকভাবে মিলবে না।

ম. তামিম বলেন, “আজ যদি আমরা অনুসন্ধান দ্বিগুণও করি, আগামী ছয় মাসে তার সুফল পাওয়া যাবে না। গ্যাস অনুসন্ধান একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। পরিকল্পনা, জরিপ, কূপ খনন, পরীক্ষা সব মিলিয়ে সময় লাগে।”

আর সমুদ্রে অনুসন্ধান নিয়ে তার ভাষ্য, “এটিও তাৎক্ষণিক সমাধান নয়। আজ চুক্তি হলেও আগামীকাল গ্যাস পাওয়া যাবে না। সমুদ্রে অনুসন্ধান সব সময়ই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।”

একটি এলএনজি টার্মিনালের ত্রুটি শুধু একটি বাস্তবতা সামনে এনেছে- বাংলাদেশের গ্যাস সংকট আসলে আজকের নয়, বহু বছরের।

পুরোনো গ্যাসক্ষেত্র ফুরিয়ে আসছে, নতুন বড় আবিষ্কার নেই, অনুসন্ধানের ঘাটতি রয়ে গেছে, আর আমদানিনির্ভরতা বাড়ছে। সরকার নতুন কূপ খনন করছে, সমুদ্রে অনুসন্ধান বাড়ানোর চেষ্টা করছে, এলএনজি অবকাঠামোও সম্প্রসারণ করছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফল মিলতে সময় লাগবে।

অর্থাৎ, বর্তমান সংকটের কোনো তাৎক্ষণিক সুইচ নেই। আজ যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি; তাই একদিনে শেষও হবে না। দেশের গ্যাস খাতে স্বস্তি ফিরবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরে অনুসন্ধান, বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নের গতি কতটা বাড়ানো যায় সেই পরীক্ষার ওপর।