আর্জেন্টিনা বিদায় নিলে কি বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যেত?

একটি গোল, একটি হার, একটি বিদায়; আর তাতেই কি কমে যেতে পারে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য? শুনতে অবাক লাগলেও উত্তরটা হ্যাঁ।

ফুটবল বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার ভাগ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের বড় একটি মৌসুমি অর্থনীতি। ব্রাজিল ইতোমধ্যেই বিদায় নিয়েছে। আর্জেন্টিনাও যদি আগেভাগে ছিটকে যেত, তাহলে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগতে পারত বাংলাদেশের জার্সির বাজারে।

এর বাইরে বিজ্ঞাপন, ডিজিটাল স্ট্রিমিং, ইলেকট্রনিক্স বিক্রেতা, মোবাইল কোম্পানি, চা, কফি, স্ন্যাকস, ফাস্টফুড, রেস্তোরাঁ, প্রজেক্টর, ভ্রাম্যমাণ পতাকা বিক্রেতা এবং এমনকি কনটেন্ট নির্মাতাদের ব্যবসাও থমকে যেতো রাতারাতি।

“গতকাল আর্জেন্টিনার ম্যাচের আগে আমাদের সেল ছিল এক লাখ ২০ হাজার টাকার মতো কিন্তু ৯০ মিনিট শেষে সেল হয়েছে আড়াই লাখ টাকার বেশি। দ্বিগুণের বেশি ব্যবসা হয়েছে শুধু খেলার সময়টাতে,” কথাগুলো আলাপ-কে বলছিলেন এক্সপ্রেসো লাউঞ্জের ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম। তার প্রতিষ্ঠান এবার বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বড় স্ক্রিনে লাইভ দেখানোর ব্যবস্থা করেছে।

যদিও বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলে না, আয়োজনও করে না, তবু বিশ্বকাপ ঘিরে চলে বড় অংকের ব্যবসা, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। আর সেই অর্থনীতির বড় অংশই দাঁড়িয়ে থাকে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তার ওপর।

সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ক্রীড়া আসর নয়, এটি কয়েক শত কোটি টাকার মৌসুমি অর্থনীতি যা টিকে থাকে দুই দলের খেলার ওপর।

বিশ্বকাপ অর্থনীতির কেন্দ্রে দক্ষিণ আমেরিকার দুই দেশ

বাংলাদেশে ফুটবল সমর্থকদের সবচেয়ে বড় দুটি অংশ ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনাকে ঘিরেই। বাজারের চিত্রও সেটিই বলছে।

ব্রাজিলের হারের পর হতাশ রেডিয়েন্ট ফ্যাশনের সেলস এক্সিকিউটিভ মোহাম্মদ রাহিম।

“ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, পর্তুগালের জার্সির সঙ্গে এবার ইংল্যান্ডেরও কিছু জার্সি বিক্রি হয়েছে। গতকাল আর্জেন্টিনার জয়ের পর আজ আর্জেন্টিনার জার্সি বিক্রি অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু ব্রাজিলের হারের পর এখন চিন্তায় আছি এগুলোর কি হবে? বড় লস হয়ে গেল,” আলাপ-কে বলছিলেন তিনি।

ঢাকার বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে গ্যালাক্সি স্পোর্টসের ব্যবস্থাপক মুকুল পাটোয়ারীর ভাষ্য, তাদের বিক্রি হওয়া জার্সির প্রায় ৬০ শতাংশই আর্জেন্টিনার। এরপরই রয়েছে ব্রাজিল। ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান বা স্পেনের জার্সির চাহিদা থাকলেও তা তুলনামূলক অনেক কম।

বাংলাদেশ স্পোর্টস অ্যাকসেসরিজ মার্চেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের হিসাবে, দেশের স্পোর্টস সামগ্রীর বাজারের আকার প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার।

ফুটবল বিশ্বকাপ ঘিরে এই বাজার ভিন্ন মাত্রা পায়। যার বড় অংশজুড়েই থাকে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের জার্সি, পতাকা, ফুটবল, স্কার্ফ, হেডব্যান্ড ও অন্যান্য স্যুভেনির সামগ্রীর বিক্রি বেড়ে যায় অন্যান্য বছরগুলোর তুলনায়।

রপ্তানিতে ফ্যান জার্সি

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ফিফার অফিশিয়াল জার্সি কিংবা অংশগ্রহণকারী কোনো দলের জার্সিতে এবার জায়গা করে নিতে পারেনি বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ থাকছে দর্শকদের জন্য তৈরি ‘ফ্যান জার্সি’ ও টি-শার্টে।

বিশ্বকাপ ফুটবলের জার্সির বাজার কয়েক বিলিয়ন ডলারের। বৈশ্বিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘গ্লোবাল গ্রোথ ইনসাইটস’-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ বিশ্বকাপে জার্সির বাজারের আকার ৮৩৯ কোটি মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বলছে, ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষ্যে ফুটবল ও ফিফার লোগো-থাকা জার্সি, টি-শার্ট ও হুডি মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হয়েছে ২৩ লাখ ৬৫ হাজার পিস পোশাক।

এসব পোশাকের রপ্তানিমূল্য প্রায় ৩৭ লাখ মার্কিন ডলার–বাংলাদেশি মুদ্রায় ৪৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা। ঢাকা ও চট্টগ্রামের ৩৩টি কারখানা এসব পণ্য রপ্তানি করেছে ১৮টি দেশে।

বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় এসব পণ্য রপ্তানি হয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, স্পেন, নেদারল্যান্ডস, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারেও গেছে বাংলাদেশে তৈরি ফ্যান জার্সি।

ওয়ালমার্ট, প্রাইমার্ক, নেক্সট, এমঅ্যান্ডএস, পুমা, ডেক্যাথলনসহ ৩৬টি প্রতিষ্ঠান এসব পণ্য কিনেছে বাংলাদেশ থেকে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ( বিকেএমইএ) সাবেক সভাপতি ফজলুল হক আলাপ-কে বলেন, “বাংলাদেশে অনেক বছর আগে বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের জার্সি তৈরি করেছে। কিন্তু এ বছর হয়তো কোনো অর্ডার পায়নি। তবে ফ্যান জার্সি কিন্তু বিভিন্ন দেশে গেছে। এখানে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের জার্সি বেশি হলেও প্রায় সব দেশেরেই ফ্যান জার্সি বানায় বাংলাদেশ।”

দেশের ভেতরের জার্সি ব্যবসা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “দেশের ভেতরে যেটা বিক্রি হয় সেটার কিন্তু কোনো লাইসেন্স নেই, আমরা বলি ফেইক জার্সি। অর্থাৎ কোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠান আপনাকে জার্সি বানানোর লাইসেন্স দেয়নি। এ জন্য এ ধরনের জার্সি ব্যবসার কোনো পরিসংখ্যান নেই।”

যদি ব্রাজিলের মতো আর্জেন্টিনাও আগেভাগে বাদ পড়ত, তাহলে স্থানীয় উৎপাদক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও খুচরা বিক্রেতারা সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে পড়ত বলে মনে করেন তিনি।

আর তাতে কোটি টাকার পণ্য অবিক্রীত থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতো।

বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানগুলো বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার বিশেষ অয়োজন করে।

জমজমাট ইলেকট্রনিক্স ও রেস্তোরাঁ ব্যবসা

বিশ্বকাপ মৌসুমে দেশের টেলিভিশন বাজারের আকার এই বছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছে যেতে পারে বলে মনে করছেন ফেয়ার ইলেকট্রনিকসের কনজ্যুমার ইলেকট্রনিক্স বিভাগের হেড অব প্রোডাক্ট মো. মুশফিকুর রহমান।

“ঈদুল আজহার পরপরই বিশ্বকাপ শুরু হওয়ায় এবার বড় স্ক্রিনের স্মার্ট টিভির চাহিদা আগের আসরগুলোর তুলনায় আরও বেশি। এখন ক্রেতারা শুধু এইচডি বা ফুল এইচডি নয়, বরং ইউএইচডি, কিউএলইডি, মিনি এলইডি ও ওএলইডি টিভির প্রতিও বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। যাতে বড় পর্দায় খেলা দেখতে পারে,” গণমাধ্যমকে বলেছেন তিনি। 

বিশ্বকাপের গভীর রাতের ম্যাচগুলোকে ঘিরে দেশের হাজারো চায়ের দোকান, রেস্তোরাঁ ও ফাস্টফুডের দোকান ভোর পর্যন্ত খোলা থাকে। মানুষ রাত জেগে চা, কফি, কোমল পানীয় ও খাবার-দাবার কিনে খেলা দেখে। 

“এবার আমরা বড় দলগুলোর সব ম্যাচই দেখার ব্যবস্থা করেছি। এ জন্য বড় টিভি ও প্রজেক্টর কেনা হয়েছে। প্রচুর ক্রেতা আসেন খেলা দেখার জন্য,” এক্সপ্রেসো লাউঞ্জের ম্যানেজার আরিফুল ইসলাম বলেন। বিভিন্ন রেস্তোরাঁ ও খাবারের দোকানগুলো বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার বিশেষ অয়োজন করে।

এর ফলে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বিক্রি অনেকটাই বেড়ে যায় বলেও জানান তিনি।

তবে ব্রাজিলের বিদায় নিয়ে আফসোস করে জানালেন, “ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার ম্যাচ মানে সর্বোচ্চ বিক্রি। দ্রুত ব্রাজিলের বিদায় হয়ে যাওয়ায় আমাদের ব্যবসায় ভালো প্রভাব ফেলবে। এখন আর্জেন্টিনা আশা করি শেষ পর্যন্ত টিকে থাকবে। তাহলে কিছুটা হলেও টার্গেট পূরণ হবে।”

বিশ্বকাপে অন্যান্য খাত

একইভাবে বড় পর্দায় খেলা দেখানোর জন্য প্রজেক্টরের চাহিদা বাড়ে। মোবাইল অ্যাপে খেলা দেখার কারণে বাড়ে ডেটার ব্যবহার ও ডিজিটাল স্ট্রিমিং।

সামাজিক মাধ্যমে বিশ্বকাপভিত্তিক কনটেন্ট তৈরি করে আয় করেন অসংখ্য কনটেন্ট ক্রিয়েটর। বিজ্ঞাপনদাতারাও এই সময় প্রচারণার বাজেট বাড়িয়ে দেন।

এই পুরো চেইনটির কেন্দ্রেই রয়েছে দর্শকের আগ্রহ এমনটাই জানালেন বাংলালিংকের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস তৌহিদ আহমেদ।

বাংলালিংকের ডিজিটাল এন্টারটেইনমেন্ট এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্ম টফি’র ব্যবসা নিয়ে আলাপ-কে তিনি বলেছেন, “অন্যান্য সময়ের চেয়ে বিশ্বকাপের সময়ে ট্রফির সাবস্ক্রাইবার অনেক বেড়েছে। আর এই চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের খেলার দিন।”

ব্রাজিলের বিদায় তাদের ব্যবসায় প্রভাব ফেলবে বলেও মনে করেন তিনি।

আর্জেন্টিনাও বাদ পড়লে কী হতো

বিশ্বকাপের আগে স্থানীয় কারখানাগুলো কয়েক মাস ধরে মূলত ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার জার্সিই উৎপাদন করে। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর এসব জার্সির চাহিদা প্রায় শূন্যে নেমে আসে। ফলে টুর্নামেন্ট চলাকালেই অধিকাংশ পণ্য বিক্রি করতে হয়।

ব্রাজিল বিদায় নেওয়ার পর থেকেই ব্রাজিলের জার্সি ও পতাকার বিক্রি কমতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। তবে বাজারে বড় ধরনের ধস নামেনি।

কারণ আর্জেন্টিনা এখনও টুর্নামেন্টে রয়েছে। বরং অনেক দোকানে এখন আর্জেন্টিনার জার্সির চাহিদা আরও বেড়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাংলাদেশের বাজারে বিশ্বকাপের শেষভাগের উত্তেজনা মূলত নির্ভর করে এই দুই দলের অন্তত একটি দল টিকে থাকার ওপর।

“দেশভিত্তিক জার্সিগুলো বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পর বিক্রি করা খুব কঠিন হয়ে যায়। তাই এই ব্যবসায় সবসময়ই ঝুঁকি থাকে,” বলেছেন প্লামি ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল হক।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বকাপের মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই তৈরি হয় নকআউট পর্বে, যখন দর্শকের আগ্রহ সর্বোচ্চ থাকে। আর বাংলাদেশের বাস্তবতায় সেই আগ্রহের সবচেয়ে বড় উৎস ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। যা এখন পুরোপুরি টিকে আছে আর্জেন্টিনার ওপর।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ তাই শুধু ফুটবলের লড়াই নয়, এটি আবেগনির্ভর এক মৌসুমি অর্থনীতিও।

আর সেই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি এখনও ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা। একটি দল বিদায় নেওয়ায় বাজারে কিছুটা প্রভাব পড়েছে। অন্য দলটিও যদি আগেভাগে বিদায় নিত, তাহলে শত শত কোটি টাকার এই উৎসবমুখর অর্থনীতির গতি নিঃসন্দেহে অনেকটাই কমে যেত।