টিআইএন, আয়কর, সিগারেটের শুল্কসহ যেসব পরিবর্তন আসতে পারে প্রস্তাবিত বাজেটে 

জাতীয় সংসদে বাজেট পাস হতে আর মাত্র দুই দিন বাকি। সাধারণত এই পর্যায়ে বাজেটে বড় পরিবর্তনের সুযোগ থাকে না থাকলেও ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী, ব্যাংকার, কর বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন অংশীজনের আপত্তির মুখে কয়েকটি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ কর ও শুল্ক প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

পাশাপাশি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানির লভ্যাংশ কর, সোনার ওপর মূলধনি লাভ কর (ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের করপোরেট কর, তৈরি পোশাক শিল্পের উৎসে কর, শিল্পের কাঁচামাল আমদানির শুল্ক এবং করদাতাদের জন্য ডিজিটাল সুবিধাসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে।

ব্যবসায়ী সংগঠন, উন্নয়ন সহযোগী, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত পর্যালোচনা করেই এসব প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে।

এর মধ্যে আরেকটি আলোচিত বিষয় ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো।

সম্প্রতি সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠকেও বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা আলাপ-কে বলেন, “সংসদে প্রস্তাবিত অর্থবিল, ২০২৬-এর বেশকিছু বিষয়ে সংশোধনী আনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব পাওয়া গেছে। তবে এখনই এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে সরকারের মধ্যে আলোচনা চলছে।”

সরকারের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসার পর প্রয়োজনীয় সংশোধনী সহকারে অর্থবিলে সেগুলো সংযুক্ত করা হবে বলেও জানান তিনি।

২৯এ জুন জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের মাধ্যমে কর ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাবগুলো চূড়ান্ত হবে। আর ৩০এ জুন বাজেট পাস হওয়ার হবে। নতুন অর্থবছর শুরু হবে ১লা জুলাই।

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হচ্ছে না

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত ছিলো ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব।

সরকারের যুক্তি ছিলো, ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় থাকা ব্যক্তিদের করজালের মধ্যে আনা গেলে রাজস্ব আহরণের ভিত্তি আরও বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে কর ফাঁকি রোধ এবং অস্বাভাবিক আর্থিক লেনদেন নজরদারিতেও এটি সহায়ক হবে।

কিন্তু বাজেট ঘোষণার পর থেকেই এ সিদ্ধান্ত নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।

ব্যাংকার ও কর বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর আয় করযোগ্য নয়। অথচ শিক্ষা, চিকিৎসা, সঞ্চয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ গ্রহণ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনেই তাদের ব্যাংক হিসাব খুলতে হয়। টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে এসব মানুষ প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে পারেন এবং অনেকে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে থাকতে আগ্রহী হতে পারেন।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “ক্রেডিট কার্ডধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করার পর কার্ড নেওয়ার হার কমে গিয়েছিল। এখন নতুন করে ব্যাংক হিসাবধারীদের জন্য টিআইএন বাধ্যতামূলক করা হলে ব্যাংক লেনদেনও কমে যেতে পারে।”

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৭ কোটি ব্যাংক হিসাব থাকলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হিসাবধারীর কোনো টিআইএন নেই।

কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া আলাপ-কে বলেন, “ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানুষের মধ্যে যদি ধারণা তৈরি হয় যে ব্যাংক হিসাব খুললেই অতিরিক্ত জটিলতায় পড়বেন, তাহলে তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।”

করমুক্ত আয়সীমা কত হবে

ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের জন্য করমুক্ত আয়ের সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হতে পারে বলেও আলোচনা হচ্ছে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতির চাপ বিবেচনায় আগামী অর্থবছরের জন্য এ সীমা আরও বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। এতে এক অর্থবছরেই করমুক্ত আয়ের সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বৃদ্ধি পেতে যাচ্ছে।

শেয়ারবাজারের লভ্যাংশ কর

শেয়ারবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর আরোপের নতুন প্রস্তাবটিও সংশোধনের তালিকায় রয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেটে বিদ্যমান ২০ শতাংশ কর তুলে দিয়ে কোম্পানির নিয়মিত করহার অনুযায়ী লভ্যাংশ কর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

অর্থাৎ কোনো প্রতিষ্ঠানের করহার সাড়ে ২৭ শতাংশ হলে সেই হারেই লভ্যাংশ আয়ের ওপর কর দিতে হতো। আবার কারও করহার সাড়ে ১২ শতাংশ হলে সেটিই প্রযোজ্য হতো।

কিন্তু শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন পক্ষের আপত্তির পর সরকার এখন আগের ২০ শতাংশ করহার বহাল রাখার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

এ ছাড়া নিট মুনাফার ৩০ শতাংশ লভ্যাংশ বিতরণে ব্যর্থ কোম্পানির অবণ্টিত মুনাফার ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ অতিরিক্ত করের বিধান নিয়েও পুনর্বিবেচনা চলছে।

সোনার মূলধনি লাভের ওপর কর

অর্থবিলের আরেকটি আলোচিত প্রস্তাব ছিল সোনা, রুপা, গহনা, মূল্যবান পাথর, হীরা, মুদ্রা, ডিজিটাল মুদ্রা, শিল্পকর্ম, প্রাচীন নিদর্শন এবং ক্লাব সদস্যপদ বিক্রি বা হস্তান্তর থেকে অর্জিত লাভকে মূলধনি লাভ হিসেবে গণ্য করে ১৫ শতাংশ কর আরোপ।

একইভাবে ট্রেজারি বিল, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, ডিবেঞ্চার, সুকুক, অন্যান্য শরিয়াহভিত্তিক সিকিউরিটিজ এবং বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও স্টক বিক্রি থেকে অর্জিত মূলধনি লাভের ওপরও ১৫ শতাংশ করের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় সোনা বিক্রির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ করহার বেশি হয়ে যাচ্ছে বলে মত দিয়েছেন অংশীজনরা।

এ কারণে সরকার শুধু সোনার ক্ষেত্রে মূলধনি লাভ কর ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়টি বিবেচনা করছে।

শিক্ষা খাতে করেও আসতে পারে স্বস্তি

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট কর নিয়েও নতুন করে ভাবছে সরকার।

বর্তমানে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, ডেন্টাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং শুধু আইসিটি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ১০ শতাংশ করপোরেট করের প্রস্তাব রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

তৈরি পোশাকের উৎসে করে ইতিবাচক সাড়া

রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে উৎসে কর কমানোর বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, রপ্তানি আয়ের বিপরীতে উৎসে করের হার ১ শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৬৫ শতাংশ নির্ধারণের বিষয়ে নীতিগত সম্মতি রয়েছে।

একই সঙ্গে সাব-কন্ট্রাক্ট মূল্যের ওপর আরোপিত ১ শতাংশ দ্বৈত উৎসে কর প্রত্যাহারের বিষয়টিও বিবেচনায় আছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, উচ্চ উৎপাদন ব্যয় এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান ধরে রাখতে এ খাতে কিছুটা কর-স্বস্তি প্রয়োজন।

প্লাস্টিকের কাঁচামালে শুল্ক নিয়ে নতুন ভাবনা

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রস্তাবিত বাজেটে প্লাস্টিক শিল্পের অন্যতম প্রধান দুই কাঁচামাল পিভিসি (পলিভিনাইল ক্লোরাইড) ও পিইটি (পলিইথিলিন টেরেফথালেট) রেজিনের আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করার প্রস্তাব করেন।

এই প্রস্তাবের পর উদ্যোক্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বাংলাদেশ প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির সাবেক সভাপতি মো. ইউসুফ আশরাফ বাজেট দেখে বলেছিলেন, “প্লাস্টিক খাতের জন্য উল্লেখযোগ্য কোনো সুযোগ নেই। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমরা আগেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। রপ্তানি পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এর মধ্যে কাঁচামালের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি আমাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করবে।”

তবে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের দাবির প্রেক্ষিতে সরকার এ নিয়ে ভাবছে বলে জানা গেছে।

আলোচনায় নিকোটিনের শুল্ক

অন্যদিকে তামাক শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে আরোপিত সম্পূরক শুল্কও সংশোধনের আওতায় আসতে পারে।

প্রস্তাবিত বাজেটে নিকোটিন গ্র্যানুলস ও নিকোটিন পাউচ আমদানিতে ৩৫০ শতাংশ পর্যন্ত সম্পূরক শুল্ক আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছিল।

তবে সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কিছু ক্ষেত্রে শুল্কহার সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

আর সেটা হলে ইতোমধ্যেই বেড়ে যাওয়া সেগারেটের দাম কিছুটা কমতে পারে।

কর ও শুল্ক প্রস্তাব ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি করেছে, সেগুলোতেই বাস্তবতার আলোকে শেষ মুহূর্তে সমন্বয়ের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা।

“প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটের আকার, ঘাটতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ কিংবা বেসরকারি খাতের নেতৃত্বে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য-এসবের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তবে কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। এগুলে বাজেট পাশের আগে সমন্বয় করা হচ্ছে।,” আলাপ-কে বলেন তিনি।