প্রস্তাবিত বাজেটকে উচ্চাভিলাষী বলছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। এর ভিত্তি ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন আছে সংস্থাটির।
সিপিডি বলছে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, দুর্বল রাজস্ব আহরণ, স্থবির বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রেক্ষাপটে বাজেটের অনেক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
শুক্রবার ‘২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পরবর্তী প্রতিক্রিয়া’ সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাজেট যে ভিত্তির ওপর তৈরি করা হয়েছে, সেই ভিত্তিই ঠিক নেই। এখন এটা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক ও বাস্তবায়ন সক্ষমতার ওপর, যা বড় চ্যালেঞ্জ।”
তিনি আরও বলেন, “বাজেট তৈরিতে চতুর্থ কোয়ার্টারকে ধরা হয়েছে, যখন সাধারণত প্রবৃদ্ধি বেড়ে যায়, মূল্যস্ফীতি কমে যায়। এই প্রাক্কলন আসলে বাস্তবসম্মত নয়। বরং তারা যেটা পেয়েছে সেটা মাথায় রেখে বাস্তবসম্মতভাবে বাজেট করলে ভালো হতো।”
যদিও বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে, তা মানতে নারাজ অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, “চ্যালেঞ্জটা বড় হয়ে গেছে। কারণ সমস্যাগুলো আমরা ইনহেরিটেট করেছি।”
বাস্তবায়ন সম্পর্কে তিনি বলছেন, “আমরা বাজেটে রোডম্যাপ দিয়েছি। বাস্তবায়ন করতে গেলে কী কী করতে হবে সেটাও বলেছি।”
বাস্তবতা বনাম উচ্চাকাঙ্ক্ষা
সিপিডির মতে, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মুখে আছে। গত কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি, রাজস্ব আদায়ে দুর্বলতা এবং ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিকে চাপে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি সংকট।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, বাজেটের মূল দর্শন মানব উন্নয়ন, বেসরকারি খাতনির্ভর প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করা। কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণমূলক খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি লক্ষ্যমাত্রা আরও বাস্তবসম্মত হওয়া প্রয়োজন ছিল।”
প্রস্তাবিত বাজেটে আগামী অর্থবছরের জন্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু সিপিডির মতে, বর্তমান বিনিয়োগ পরিস্থিতি, আর্থিক খাতের দুর্বলতা এবং জ্বালানি সংকট বিবেচনায় এই প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন
চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯ শতাংশ থাকার পর এক বছরের মধ্যে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা সহজ হবে না।
সিপিডির মতে, মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে হলে শুধু মুদ্রানীতি নয়, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য ও জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ ও বাস্তবসম্মত মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি আরও কিছুদিন অব্যাহত রাখতে হবে।”
সরকারি ব্যয়ের মাধ্যমে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান না বাড়লে মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে বলেই মনে করছে সিপিডি।
একই সঙ্গে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপরও গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সবশেষ মে মাসে মূল্যস্ফীতি যখন সাড়ে ৯ শতাংশের কাছাকাছি, তখন নতুন বাজেটে তা সাড়ে ৭ শতাংশে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, "আমরা বিগত সরকারের কাছ থেকে ৯ শতাংশের ওপরে থাকা দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ইনহেরিট (উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত) করেছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও আমদানিজনিত বৈশ্বিক চাপ। পুলিশ বা র্যাব দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। আমাদের মূল কৌশল হলো অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ‘কস্ট অফ ডুইং বিজনেস’ বা ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা।"
অর্থমন্ত্রী ব্যবসার খরচ বৃদ্ধির পেছনে বন্দর ও খালাস প্রক্রিয়ায় সময় নষ্ট এবং বিভিন্ন স্তরের অনিয়মকে দায়ী করে বলেন, “বাজেট বক্তৃতায় অনেকগুলো ‘ডিরেগুলেশন’ (নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ) ও সংস্কারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এগুলো বাস্তবায়িত হলে অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদন ও সরবরাহ খরচ কমবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে।”
এছাড়া স্পট মার্কেট থেকে জরুরি ক্রয়ের পরিবর্তে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৩ মাসের রিজার্ভ নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি কেনাকাটার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো গড়ার ওপর জোর দেন তিনি।
রাজস্ব আদায় ও ব্যাংকিং
সিপিডির পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রতি বছরই রাজস্ব আহরণে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা বাস্তবে অর্জিত হয় না।
চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে।
সংস্থাটি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
তাদের মতে, প্রশাসনিক আধুনিকায়ন, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন, অটোমেশন এবং কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে।
বরং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
আর সেটা হলে একদিকে মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
ফাহমিদা খাতুনের ভাষায়, “ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ বাড়লে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে যেতে পারে।”
বিদেশি ও ব্যাংক ঋণ ও ভবিষ্যৎ চাপ
বিদেশি ঋণের ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সুশাসন ও স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সিপিডি।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “স্বচ্ছতা ও সুশাসনের সঙ্গে বিদেশি ঋণ ব্যবহার করা না গেলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে।”
তবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ঋণের তুলনায় বৈদেশিক ঋণের ওপর তুলনামূলক বেশি নির্ভরতার পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি, যাতে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত না হয়।
৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, কর ব্যবস্থার স্বয়ংক্রিয়করণ ও প্রশাসনিক সংস্কার ছাড়া এই লক্ষ্য পূরণ না হলে সরকারকে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহকে সংকুচিত করবে।
ব্যাংকিং খাতের চরম সংকটের চিত্র নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে অত্যন্ত উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “বিগত বছরগুলোতে ব্যাংক খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ চুরি হয়ে গেছে। লুটপাট ও অনিয়মের কারণে অনেকেই ১২ বছর ধরে নিজেদের আমানত পাচ্ছিলেন না।
ব্যাংকে বিরাট মূলধন ঘাটতি থাকায় তহবিল খরচ (কস্ট অফ ফান্ড) অনেক বেড়ে গেছে, যা মূল্যস্ফীতিকেও উস্কে দিচ্ছে। তবে আমরা যে কঠোর কার্যক্রম হাতে নিয়েছি, তাতে আমানতকারীরা পর্যায়ক্রমে তাদের টাকা ফেরত পাবেন।”
উন্নয়ন ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রশ্নে সতর্কতা
প্রস্তাবিত বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার ৩ লাখ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩০ শতাংশের বেশি।
তবে সিপিডি বলছে, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতা এখনও বড় উদ্বেগের বিষয়। চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল মাত্র ৩৫ দশমিক ৪ শতাংশ।
ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, “উন্নয়ন বাজেটে থোক বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কিন্তু ব্যয়ের ক্ষেত্রে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।”
সংস্থাটি আরও সতর্ক করেছে যে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কম, যা ব্যয় বৃদ্ধি ও উন্নয়ন কার্যক্রমে বিলম্ব সৃষ্টি করতে পারে।
ইতিবাচক দিকও দেখছে সিপিডি
সমালোচনার পাশাপাশি বাজেটের কয়েকটি উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেও দেখছে সিপিডি।
বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, সৌর প্যানেল ও বৈদ্যুতিক যানবাহনে কর ছাড়, দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি, কৃষি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য প্রণোদনামূলক পদক্ষেপের প্রশংসা করেছে সংস্থাটি।
তবে তারা মনে করে, শুধু বরাদ্দ বৃদ্ধি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নই এসব উদ্যোগের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
বাস্তবায়নেই সাফল্য-ব্যর্থতার মাপকাঠি
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী তার সমাপনী বক্তব্যে পুনর্ব্যক্ত করেন যে, “মাত্র দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত নিয়ে এই "ইনক্লুসিভ" বা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট তৈরি করা হয়েছে।”
তবে সিপিডির মূল্যায়নে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এর আকার বা লক্ষ্য নয়, বরং বাস্তবায়ন সক্ষমতা।
রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান তৈরি এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাঠামোগত সংস্কার ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে না পারলে বাজেটের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যগুলো কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
সিপিডির ভাষায়, বাজেটে ইতিবাচক উদ্যোগের ঘাটতি নেই, কিন্তু অর্থনীতিকে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির পথে নিতে হলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাস্তবায়ন।