বাজেট ২০২৬-২৭

বাজেট ঘাটতি মেটানোর টাকা কোথায়

বাংলাদেশের নতুন অর্থবছর শুরু হচ্ছে এক অভূতপূর্ব সংখ্যা দিয়ে। প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট। স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বড় এই আর্থিক পরিকল্পনা একদিকে যেমন উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করছে, অন্যদিকে তেমনি সামনে এনেছে এক কঠিন বাস্তবতা- এই বিশাল অঙ্কের অর্থ আসবে কোথা থেকে?

নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের রোডম্যাপ তৈরি এবং ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে এই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে।

তবে এই বিশাল সংখ্যার আড়ালে মূল প্রশ্নটি এখন আরও স্পষ্ট- এই বিপুল পরিমাণ অর্থের জোগান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, এবারের বাজেটের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন কেবল কত ব্যয় করা হবে তা নয়; বরং এই ব্যয়ের অর্থ কীভাবে জোগান দেওয়া হবে- সেটিই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। 

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ভাষণে “৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব” আদায়ের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। 

সরকারের এমন পরিকল্পনাকে উচ্চাভিলাষী দাবি করেছেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) অব বাংলাদেশ এর পরিচালক ড. আহমদ আহসান।

“এ বছর যে রাজস্ব আহরণ হবে আমার হিসাবে তার থেকে অন্তত আরও ৪০ থেকে ৪২ শতাংশ বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে। যেখানে বাজেটে আমরা বলছি- টাকার অঙ্কে জিডিপি বাড়বে ১৫ শতাংশের মতো (প্রকৃত অর্থে নয়), সেখানে ৪২ শতাংশ বেশি রাজস্ব; এটা একটা বড় উচ্চাভিলাষী টার্গেট হয়ে গেলো,” আলাপ-কে বলেন তিনি।

দেশের অর্থনীতি বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, তারল্য সংকট এবং রাজস্ব আদায়ের ধীরগতির মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে এত বড় বাজেটের অর্থ সংকুলান করা সরকারের জন্য এক পর্বতসম চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। 

এ অবস্থায় রাজস্ব আদায়ের এমন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আহমদ আহসান বলেন, “এটা কীভাবে অর্জনের পরিকল্পনা করা হয়েছে সেটা আমাদের দেখতে হবে। এ মুহূর্তে এটা আমার কাছে পরিষ্কার না। কারণ প্রতিবারই আমরা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারি না।”

রাজকীয় রাজস্ব পরিকল্পনা বনাম রূঢ় বাস্তবতা

বাজেটের আকার বাড়াতে সরকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে রেকর্ড ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে সিংহভাগ, অর্থাৎ ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকাই আদায় করতে হবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে।

সাধারণ ভাবে বললে- আগামী অর্থবছরে সরকার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আপনার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে গড়ে ৪০ হাজার টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে।

তবে সরকারের এই লক্ষ্যকে অবাস্তব বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

“এটা হিসটোরিকভাবে একটি কমন বিষয় যে, আমাদের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য কখনোই পূরণ হয় না। এবারও যে লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে এটা অর্জন সম্ভব নয়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি। 

সরকার যখন গত বছরের তুলনায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তখন বাস্তবতা হচ্ছে, ২০২৫-অর্থ বছরেই রাজস্ব কম আদায় হবে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি।

তার মানে আগামী অর্থবছরে আসল অর্জনের তুলনায় অন্তত আড়াই লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের স্বপ্ন দেখছে সরকার।

আড়াই লাখ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আয়ের স্বপ্ন দেখছে সরকার

অবিশ্বাস এই লক্ষ্যমাত্রা কতটুকু অর্জন সম্ভব- এমন প্রশ্নের জবাবে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান আলাপ-কে বলেন, “আমরা সব সময়ই চাই বড় বাজেট হোক। এটা অর্থনীতির জন্য ভালো কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের রাজস্ব সক্ষমতা দিন দিন কমছে। কর জিডিপি কমছে।”

এর পেছনে কাঠামোগত দুর্বলতা অন্যতম প্রধান কারণ। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে মাত্র ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। যার চলতি অর্থবছরেও এনবিআর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বড় অঙ্কের রাজস্ব ঘাটতির দিকেই এগোচ্ছে।

ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বনাম বেসরকারি খাত

রাজস্বের বিশাল লক্ষ্য যদি পূরণ হয়েও যায় তাতেও কিন্তু হিসাব মিলছে না। 

কারণ বিশাল বাজেটে এরপরও ঘাটতি থাকছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। 

এই ঘাটতি মেটাতে সরকারকে পুরোপুরি নির্ভর করতে হচ্ছে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর।

যদিও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ‘ঋণনির্ভর অর্থনীতি’ থেকে বেরিয়ে আসার প্রত্যয় জানিয়েছেন। বাজেট বক্তৃতায় কয়েকবার বলেছেন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া কমিয়ে আনার সংকল্পের কথা।

তবে তার পরও সরকার অভ্যন্তরীণ খাতের ঋণ উৎসগুলো থেকে যে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার কথা জানিয়েছে, তার মধ্যে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই নেবে দেশের ব্যাংকগুলো থেকে।

আর এখানেই বড় ঝুঁকি দেখছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর।

তার ভাষায়, “দেশের ব্যাংকিং খাত ইতোমধ্যেই আমানতকারীদের আস্থা সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ইসলামি ব্যাংকের চলমান সংকট যে অবস্থায় যাচ্ছে তাতে ব্যাংকিং খাত থেকে এত ঋণ নেওয়া কঠিন হবে। যদি সেটা করতেই হয় তাহলে নিতে হবে টাকা ছাপিয়ে।”

ব্যাংকিং খাতের ওপর ঋণ নির্ভরতা বেসরকারি খাতকে বিপদে ফেলবে বলেই মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শহীদুল ইসলাম জাহিদ।

“বর্তমানে ঋণের সুদহার ১৫ শতাংশে ঠেকেছে। বেসরকারি বিনিয়োগ স্থবির। ব্যাংক থেকে সরকারের এভাবে ঋণ নেওয়া বেসরকারি খাতের রক্তশূন্যতা আরও বাড়াবে,” বলেন তিনি।

অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বৈদেশিক ঋণ প্রত্যাশা অনুযায়ী না এলে সরকারকে দেশীয় উৎস, বিশেষ করে ব্যাংক খাত থেকে আরও বেশি ঋণ নিতে হতে পারে।

এতে একদিকে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়বে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রাপ্তি আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। 

ফলে “বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে”, বলে মনে করেন সিপিড ‘র সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।

বিদেশি ঋণে চ্যালেঞ্জ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি অর্থায়নের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভর করেছে সরকার। বাজেট অনুযায়ী, ঘাটতি পূরণে প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। 

তবে অর্থনীতিবিদদের প্রশ্ন, বর্তমান বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কতটা সহজ হবে।

বিশেষ করে যখন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদেশিক ঋণ ছাড়ের গতি প্রত্যাশার তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে।

বাজেটে ঘাটতি মেটাতে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেশি।

অনেক উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও বহুপাক্ষিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এখন অর্থ ছাড়ের সঙ্গে সংস্কার বাস্তবায়নের শর্ত আরও কঠোরভাবে যুক্ত করছে। 

ফলে শুধু ঋণ অনুমোদন পেলেই হবে না, নির্ধারিত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনার দক্ষতাও নিশ্চিত করতে হবে।

এছাড়া বৈদেশিক ঋণের বড় অংশ সাধারণত প্রকল্পভিত্তিক হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যবহার করার সুযোগও সীমিত।

অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদের মতে, বাজেটের অর্থায়ন কাঠামোর অন্যতম দুর্বল দিক হচ্ছে বৈদেশিক ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। 

তিনি আলাপ-কে বলেন, “ঘাটতি বাজেট পূরণে বিশাল একটি নির্ভরতা রয়েছে বৈদেশিক ঋণে। যদি আইএমএফ ঋণটা তাড়াতাড়ি না দেয় তাহলে বিদেশি সূত্র থেকে টাকা আনা খুবই চ্যালেঞ্জিং হবে।”

ডলারের বিনিময় হার, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারের পরিস্থিতিও ঋণ সংগ্রহের সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

একদিকে সরকার রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে করের মাধ্যমে টাকা তুলে নেবে, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ সংকুচিত করবে।

যা আবার মাথাপিছু প্রায় ১৬,৩০০ টাকার নতুন ঋণের বোঝা প্রতিটি নাগরিকের কাঁধে চেপে বসছে।

একদিকে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য, অন্যদিকে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি পূরণে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা- সবমিলে এবারের বাজেট কীভাবে বাস্তবায়ন হয় সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।