কাঁচাবাজারে পলিথিন ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলেন এষা রহমান। বাজেটের প্রত্যাশা নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই একরাশ ক্লান্তি নিয়ে বললেন, “আমরা মধ্যবিত্ত, সত্যি খুব হিমশিম অবস্থায় আছি। মাস শেষে যা টাকা হাতে আসে, তা দিয়ে আর সংসার চালানো কঠিন হয়ে হচ্ছে। নিত্যপণ্যের দাম কমবে কি না-বাজেটে আমরা শুধু এইটুকুই বুঝতে চাই।”
নতুন সরকারের বিশাল বাজেটকে অনেকেই যখন "উচ্চাভিলাষী" বলছেন, তখন মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ঠিক এমনই।
চাল, ডাল, তেল কিংবা সবজির বাজারে গিয়ে যখন মধ্যবিত্ত হিসাব মেলাতে পারছে না, তরুণরা যখন চাকরির বাজারে হন্যে হয়ে ঘুরছে, আর ব্যবসায়ীরা যখন চড়া সুদের হার ও ডলার সংকটে বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছে না- তখন এবারের বাজেট কেবলই একটি বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; বরং এটি বিএনপির রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং খাদের কিনারে থাকা অর্থনীতিকে টেনে তোলার প্রথম বড় ‘লিটমাস টেস্ট’।
“আগামী বাজেটে সরকারের আয়, ব্যয় এবং কীভাবে অর্থায়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনা করছে, সেটিই হবে মূল দেখার বিষয়। বাজেটে সরকার সম্পদের পুনর্বণ্টন করতে পারছে কি না, সেটির একটি লিটমাস টেস্ট হয়ে যাবে,” আলাপ-কে বলেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসায় গতি ফেরানো, বিনিয়োগ চাঙা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর আলাপ-কে বলেন, “বিনিয়োগ আসলে উৎপাদন হবে। উৎপাদন হলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। তাই বিনিয়োগের জন্য যা যা করা হবে, তা আগামী বাজেটে প্রতিফলিত হবে।”
রেকর্ড বাজেটে প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এবারের সম্ভাব্য বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মতো। চলতি বছরের সংশোধিত বাজেটের (৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা) তুলনায় প্রায় ১৯ শতাংশ বেশি। আকারের দিক থেকে দেশের ইতিহাসে এই বাজেট রেকর্ড সৃষ্টি করছে।
বিশাল বাজেটের পেছনে সরকারের নিজস্ব যুক্তি রয়েছে- নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা এবং নতুন সরকারি বেতন কাঠামোর বোঝা সামলানো।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সিরিজ বৈঠক করে এই বাজেটের সারসংক্ষেপ চূড়ান্ত করেছেন, যেখানে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে ‘১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে’ নিয়ে যাওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপরেখা রয়েছে।
এসব প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জের বিষয় বিবেচনা রেখে এবারের বাজেটকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা।
তিনি বলেন, আগামী পাঁচ বছরে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। প্রথমত পুনরুদ্ধার কররা, এরপর স্থিতিশীলতা আনা। আর তৃতীয়ত হলো- রিকনস্ট্রাকশন ফর অ্যাক্সিলারেশন করা।
“যাতে ২০৩৪ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
তবে এই বিশাল সংখ্যার বিপরীতে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অর্থায়নের উৎস। প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতি ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
এই ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে মূল্যস্ফীতি
গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দিকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরে নেমে এলেও বর্তমানে তা আবার ৯ শতাংশের ওপরে উঠে গেছে।
সর্বশেষ গত মে মাসে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়েছে ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। যা গত ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সরকার আগামী অর্থবছরের জন্য মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে। এই লক্ষ্য অর্জনও সহজ হবে না বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
সাধারণ জনগণও তাকিয়ে আছে বাজারের স্বস্তির দিকে।
সাধারণ মানুষের রান্নাঘর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের নীতি-নির্ধারণী টেবিল, সবখানেই দুশ্চিন্তা বেড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন।
আর এটা বাজেট তৈরির আগে দুশ্চিন্তায় ফেলবে বলেই মনে করছেন তিনি।
“২০২২ সালের শুরু থেকেই টানা মূল্যস্ফীতির চাপে ভুগছে বাংলাদেশের মানুষ। উচ্চ সুদের হার চালু রেখে কিছুটা মূল্যস্ফীতি কমানোর ইঙ্গিত মিলেছিল, কিন্তু গত কয়েক মাসে তা আবারো বেড়ে গিয়ে দুশ্চিন্তা তৈরি করছে। সরকারকে তাই বাজেটে এই নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা দিতে হবে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
এ নিয়ে তিনি আরও বলেন, “আসলে মূল্যস্ফীতি তো শুধু বাজেট বা নীতি সুদহারে নির্ভর করে না, এখানে বাজার ব্যবস্থাপনাও অন্যতম বড় ইস্যু। তবে বাজেটে সরকারের চেষ্টার একটা ধারণা পাওয়া যায়। আর এখানে রাজনীতি, ব্যবসা, অর্থনীতির সমন্বয় জরুরি, যেটা একটা সমন্বিত প্রক্রিয়া,” বলেন তিনি।
এ বিষয়ে সম্প্রতি সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, সুদের হার কমানো, টাকার বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং মানুষের রুটি-রুজি বাড়ানোর মতো অর্থনীতির মূল বিষয়গুলো বৃহৎভাবে বাজেটের মনোযোগের ভেতরে আসছে না। বাজেটে সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।”
বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে চ্যালেঞ্জ
দেশে যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ছে তখন বিনিয়োগ বাড়ানো অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠে আসছে। অন্যদিকে বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গেই জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ঋণের সুদ বাড়লে বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ২০ শতাংশে।
বিনিয়োগের এই স্থবিরতা দেশের বেকারত্ব সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ২০২৪ সালের সরকারি হিসাবমতেই দেশে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ।
সিপিডি'র নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন নীতিগত দ্বন্দ্ব নিয়ে বলেন, “বেকারত্বের কারণেই তো দারিদ্র্য বাড়ছে, বৈষম্য বাড়ছে। সরকারের আগামী দিনের ব্যয়ের একটা বড় অংশ উৎপাদনমুখী ও বিনিয়োগমুখী হতে হবে, যাতে কর্মসংস্থান বাড়ে।”
ঋণ আর বকেয়া সুদের ফাঁদ
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন অর্থবছরে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন প্রায়ই কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ঘাটতিও হতে যাচ্ছে বিশাল। সুতরাং, এবারের বিশাল বাজেট এবং রাজস্ব আয়ের দুর্বল অবস্থা বিবেচনায় নিশ্চিত ভাবেই বাজেটে বাড়বে ঋণ নির্ভরতা।
বাজেটের এই ঋণনির্ভরতা নিয়ে তীব্র শঙ্কা প্রকাশ করেছেন সিপিডি’র সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
“রাজস্ব ব্যয়ে এবার ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মতো রাখতে হবে কেবলমাত্র ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য, যা অর্থনীতিতে বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।”
এই ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেবে। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক খাত থেকেই নেওয়া হতে পারে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা সতর্ক করে বলছেন, সরকার বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হতে পারে। ফলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বাজেটের কঠিন সমীকরণ
নতুন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটকে ঘিরে প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি চ্যালেঞ্জও কম নয়।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন মনে করেন, “সরকার একদিকে ঋণনির্ভর অর্থনীতি থেকে বের হতে চায়, অন্যদিকে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোও বাস্তবায়ন করতে চায়। কিন্তু সীমিত রাজস্ব ও ব্যয়ের চাপের মধ্যে এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করা সহজ হবে না।”
এর সঙ্গে সরকারি কর্মচারীদের নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবি এবং করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত করার মতো দাবি যুক্ত হওয়ায় বাজেটের ওপর চাপ আরও বাড়ছে। এমন বাস্তবতায় সরকারকে আয়, ব্যয় ও জনআকাঙ্ক্ষার মধ্যে সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে বলেও মনে করেন তিনি।
এই সবের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির সুনির্দিষ্ট আদেশের পর সংসদ সচিবালয় বাজেট অধিবেশনের সব প্রস্তুতি শেষ করেছে। এখন অপেক্ষা অর্থমন্ত্রীর ব্রিফকেস খোলার।
তবে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার হিসাবের চেয়েও সাধারণ মানুষের কাছে বড় প্রশ্ন- বাজারে গিয়ে তারা স্বস্তি পাবেন কি না, তরুণরা চাকরি পাবেন কি না?
নতুন সরকারের প্রতি মানুষের প্রত্যাশার জানালাটি খুব বেশি দিন খোলা থাকে না; আর সেই জানালা সচল রাখার চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে বাজেটের বাস্তবমুখী বাস্তবায়নের ওপরই।
সেই অর্থে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সত্যিই সরকারের জন্য একটি লিটমাস টেস্ট। সফল হলে এটি অর্থনীতিতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে; ব্যর্থ হলে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান আরও বাড়বে।