দেশে জ্বালানি সংকট নেই, সরকারের ভাষ্য এমনই। কিন্তু পেট্রোল পাম্পের সামনে দীর্ঘ লাইন, কোথাও পাম্প বন্ধ হয়ে যাওয়া, আর তার মধ্যেই একের পর এক সাশ্রয়মূলক সিদ্ধান্ত। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতা। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি সংকট না থাকলেও চাপ তৈরি হয়েছে, আর সেই চাপই নীতিগত পদক্ষেপে প্রতিফলিত হচ্ছে।
এই দ্বৈত বাস্তবতাই এখন সামনে আসছে সংসদ, নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত এবং মাঠের পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে। একদিকে সরকার বলছে সরবরাহ স্বাভাবিক, অন্যদিকে ব্যয় কমানো, সময়সূচি সীমিত করা এবং চাহিদা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা। সবকিছু মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক জটিল চিত্র, যেখানে সংকটের চিত্রটা স্পষ্ট হচ্ছে না।
জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সবশেষ সিদ্ধান্ত আসে ২রা এপ্রিল রাত ১১টার পর। পৌনে ৯টায় শুরু হওয়া মন্ত্রিসভার বৈঠক চলে দুই ঘণ্টা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে চলা বৈঠকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অথচ একইদিন বিকেলে সংসদে জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী নিজেই স্পষ্ট করেছিলেন দেশে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই।
দোসরা এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপির সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ সরাসরি প্রশ্ন তোলেন, যদি সংকট না-ই থাকে, তাহলে দেশের বিভিন্ন জায়গায় পাম্প বন্ধ হচ্ছে কেন, মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকছে কেন।
তিনি বলেন, মন্ত্রীদের বক্তব্য আর মাঠের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। তার ভাষায়, সিলেটে পাম্প বন্ধ হয়ে গেছে, রাস্তায় গাড়ির দীর্ঘ সারি। সবাই প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। কিন্তু দুঃখজনকভাবে মন্ত্রীরা বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছেন।
তবে সরকারের ব্যাখ্যা ভিন্ন।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংসদে জানান, সরবরাহে কোনো ঘাটতি নেই। প্রতিটি পাম্পে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল দেওয়ার কথা, তা ঠিকভাবেই দেওয়া হচ্ছে।
তার মতে, সমস্যার মূল কারণ সরবরাহ নয়, বরং আচমকা বেড়ে যাওয়া চাহিদা।
তিনি বলেন, ইরান-সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পর মানুষ হঠাৎ করে বেশি করে তেল কিনতে শুরু করেছে। আগে যে তেল বিক্রি হতে একদিন বা দেড় দিন সময় লাগত, এখন তা দুই ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে প্যানিক বায়িং তৈরি হয়েছে এবং সেখান থেকেই দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি।
কাগজে-কলমে এই ব্যাখ্যা যুক্তিসঙ্গত মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অন্য প্রশ্ন তোলে। যদি সরবরাহ ঠিকই থাকে, তাহলে সেই সরবরাহ কেন চাহিদা সামলাতে পারছে না?
আর ঠিক এই প্রশ্নের মাঝেই এসেছে সরকারের আরেকটি বড় সিদ্ধান্তের প্যাকেজ।
জ্বালানি সাশ্রয়ের কথা বলে সরকার অফিসের সময় কমিয়ে দিয়েছে। আগামী রবিবার থেকে সব সরকারি-বেসরকারি অফিস চলবে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত। ব্যাংক বন্ধ হবে বিকেল ৩টায়। দোকানপাট ও শপিংমল বন্ধ রাখতে হবে সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে।
এতে করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ কমানোর একটি সরাসরি চেষ্টা স্পষ্ট।
শুধু এখানেই থেমে থাকেনি সিদ্ধান্ত। সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁটের ঘোষণা এসেছে। আগামী তিন মাস নতুন কোনো যানবাহন কেনা হবে না। জলযান, আকাশযান, এমনকি কম্পিউটার সামগ্রী কেনাও বন্ধ রাখা হবে।
অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ অর্ধেকে নামানো হয়েছে, বিদেশি প্রশিক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ। সভা-সেমিনারের খরচও ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে সরকারি ব্যয় ৩০ শতাংশ কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একদিন অনলাইন ক্লাসের ব্যাপারেও আলোচনা হচ্ছে।
এই ধরনের সিদ্ধান্ত সাধারণত তখনই নেওয়া হয়, যখন সরবরাহ বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি হয়। অর্থাৎ কোনো না কোনো ধরনের সংকট বা সংকটের আশঙ্কা থাকে।
এখানেই তৈরি হচ্ছে মূল দ্বন্দ্ব।
একদিকে সরকার বলছে, জ্বালানির কোনো সংকট নেই, সরবরাহ স্বাভাবিক।
অন্যদিকে একই সরকার জ্বালানি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ, ব্যয় কমানো এবং কার্যক্রম সীমিত করার পথে হাঁটছে।
সংসদের ভেতরে প্রশ্ন, বাইরে বাস্তবতা, আর নীতিগত পদক্ষেপ এই তিনটি স্তর এক জায়গায় এসে মেলে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সংকট না থাকলেও এটা সাশ্রয়ের প্রস্তুতি হয়ে থাকতে পারে। অর্থাৎ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সংকট স্বীকার না করলেও, নীতিগত পদক্ষেপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করে।
সরকার বলছে সংকট নেই, কিন্তু মানুষ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে, পাম্প বন্ধ দেখে, অফিসের সময় কমতে দেখে, তখন বাস্তবতা আর ঘোষণার মধ্যে বিশ্বাসের ফাঁক তৈরি হয়। এই ফাঁকটাই এখন বড় হয়ে উঠছে।
আসলে পরিস্থিতি কী?
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আমাদের স্টকে কত তেল আছে, কয়লা আছে, গ্যাসের কী রকম মজুত আছে। সে নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য তো আমরা পাই না।
তিনি বলেন, ইরান থেকে যে ৬টা জাহাজ ছাড়ার কথা ছিল, তার পাঁচটার কোনো খবর নেই। এই পরিস্থিতিতে কাজের এমন অবহেলা কীভাবে হয় বলে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম মনে করেন এই মুহূর্ত সরবরাহ ঘাটতি নেই। তবে প্রস্তুতির দরকার আছে সামনে।
আলাপকে তিনি বলেন, সরকারের সিদ্ধান্তলো হচ্ছে সাশ্রয় এবং সংরক্ষণের প্রস্তুতি। কারণ দীর্ঘ যুদ্ধ কতদিন দীর্ঘায়িত হবে। সংরক্ষণ ব্যবস্থা কতদিন সামনে রাখা যাবে সেটা তো অনিশ্চিত! আমাদের এবং চেষ্টা করতে হচ্ছে।
বুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক এই অধ্যাপক বলেন, “এই যুদ্ধ দীর্ঘদিন চললে তেলের দাম বাড়তে পারে। সরকার হয়তো স্বল্পকালীন পরিকল্পনা করছে যে সংকটটা ভর্তুকি দিয়ে কাটানো যাবে। কিন্তু দীর্ঘায়িত হলে দাম বাড়াতেই হবে।”
এই প্রভাব পৃথিবীর অর্থনীতির ওপরেই পড়ছে অলরেডি শুরু হয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
তবে জ্বালানির দাম বাড়ানো নিয়ে সরকারকে অন্য জটিলতায় পড়তে হতে পারে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।
আলাপকে তিনি বলেন, সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা দাম বাড়াবে না। তার মানে আইএমএফ প্রোগ্রামের অধীনে একটা রিফর্ম যেটা হয়েছিল। এর কার্যকরিতা আপাতত স্থগিত হল।
তিনি মনে করিয়ে দেন, “এপ্রিল মাসে যখন অর্থমন্ত্রী এবং গভর্নর সাহেব ওয়াশিংটনে যাবেন এবং এই সিক্সথ এবং সেভেন্থ ইনস্টলমেন্টের ছাড়ের শর্তগুলো আলাপ হবে। তখন তো তারা জানতে চাইবে যে আগে আমাদের এই সেইম প্রোগ্রামের অধীনে যেই রিফর্মগুলি করেছি এগুলো টিকেছে কি না।”
“আপনি যত দাম বাড়াবেন, আপনার বিনিয়োগের রিকোয়ারমেন্টটাও তো বেড়ে যাচ্ছে। চাহিদা তো কমার কথা।”
‘শর্টেজ সিচুয়েশনে’ চাহিদা ব্যবস্থাপনা বড় অস্ত্র মন্তব্য করে এই বিশ্লেষক বলেন, “যেখানে বাজেটে অর্থায়নের চাহিদা বাড়ছে সেখানে একটা চলমান সহায়ক কর্মসূচিকে আননেসেসারিলি বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। যেখানে এই পলিসিটা এই সময়ে সবচেয়ে বেশি কাজে আসতো।”
এ কারণে আইএমএফ এর আগামী কিস্তির ছাড়ও ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে মনে করেন তিনি।
‘প্যানিক বায়িং’
প্যানিক বায়িং নিয়ে কিছু করার নেই বলে মনে করেন ম. তামিম। এই তিনি বলেন, “আমাদের হাতে এটা থামানোর কোনো চাবিকাঠি নাই। একমাত্র যুদ্ধ বন্ধ হলে এই প্যানিক কমবে।”
ড. জাহিদও বলেন, “প্যানিক বায়িং কিছুটা হচ্ছে, ভবিষ্যতে জ্বালানি থাকছে না তাই আজকেই ট্যাংক ভরে রাখছে। অস্বীকারের কিছু নেই।”
তবে কেউ কেউ এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটা চক্র তৈরি হয়েছে যারা তেল দেওয়ার কথা বলে অতিরিক্ত মুনাফা করছে।
“কারা করছে, কীভাবে করছে, পাম্প যারা তেল দেয় বা ডিপো থেকে তেল বের হয়,কোন জায়গা থেকে লিকেজ হয় সেটা বের করতে হবে।”
প্যানিক বায়িং নিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, “প্যানিক বায়িং কিছুটা হচ্ছে। ভবিষ্যতে জ্বালানি থাকবে না সেজন্য আজকেই ট্যাংকটা ভরে রাখে বা অতিরিক্ত জ্বালানি ড্রামে মজুত করার প্রবণতা বেড়েছে”।
তবে এই পরিস্থিতিতে আরেকটা চক্র সুবিধা নেওয়া চেষ্টা করছে বলে মত দেন ড. জাহিদ। তিনি বলেন, যেটাকে অপরচুনিস্টিক বিহেভিয়ার বলি আমরা।
“এদের দালাল বলতে পারেন আপনি। আমি তেলের ব্যবস্থা করে দেব। আমাকে এক ড্রাম তেল ব্যবস্থা আমাকে প্রতি ড্রামে এত হাজার টাকা দেবেন। এই ধরনের একটা চক্র আমার মনে হয় তৈরি হয়েছে।”
সরবরাহ ব্যবস্থা এই চক্রের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে মনে করেন ড. জাহিদ হোসেন।
তিনি বলেন, “এই ধরনের চক্র টিকতে পারে না যদি না যারা এই সাপ্লাই সাইডে যুক্ত আছেন তাদের সহযোগিতা না থাকে। তাকে তো তেলটা পেতে হবে।
“এখানে কারা করছে, কিভাবে করছে। পাম্প যারা তেল দেয় বা ডিপো থেকে যে তেল বের হয় কোন জায়গা থেকে লিকেজটা হয় এটা তো আপনাকে চিহ্নিত করতে হবে।”
দাম বাড়বে তেলের?
এই সংকটে তেলের দাম নির্ধারণ বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে মত দেন ড. জাহিদ। তার ভাষায়, টাকার অংকে তেলের দাম না বাড়লেও সময়ের অংকে তো দাম বেড়ে গেছে।
“পাঁচ ঘণ্টা পাম্পে লাইন ধরে দাঁড়ায় আছেন। তারপরে হয়তো আপনি ১০ লিটার, মোটরসাইকেল হলে পাঁচ লিটার পাচ্ছেন। তো ওই পাঁচ ঘণ্টাকে আপনি মূল্যটা দিতে হচ্ছে না।”
টাকার অংকে দামটা বাড়ালে সাশ্রয়ী হওয়ার সম্ভাবনা ও মজুত প্রবাণতা কমে যায় বলে পরামর্শ দেন তিনি।
“কোথাও না কোথায় গিয়ে তো এর একটা পেইন আপনাকে ফিল করতে হবে। কাজেই এখানে তো লজিক্যাল জায়গা কোনটা কোথায় গিয়ে পেইনটা ফিল করা উচিত?”
যারা ব্যবহার করে তাদেরই দাম দেওয়া উচিত বলে মত দেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, “এটাই তো ইকোনমিক লজিক। তো সেটা থেকে আমরা কেন এই এই ধরনের সিচুয়েশনে দামটা এডজাস্ট করলাম না। এটা আমার কাছে বোধগম্য নয়।”