টিকা বন্ধ থাকায় বাংলাদেশে যখন হাম মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন বিশ্বজুড়ে চোখ রাঙাচ্ছে কোভিড-১৯ এর নতুন ভ্যারিয়েন্ট, যার অনানুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘সিকাডা’।
এই ভ্যারিয়েন্টটি ৭০ থেকে ৭৫টি জিনগত পরিবর্তন বা মিউটেশন বহন করছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। কোভিডের আগের ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় এটা বেশি।
এই ভাইরাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে স্পাইক প্রোটিনে, যার মাধ্যমে মানবদেহের কোষে প্রবেশ করে সিকাডা।
এই পরিবর্তনগুলোই ভ্যারিয়েন্টটিকে আরও জটিল করে তুলছে বলে মনে করছেন ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞরা।
বেশি সংখ্যক মিউটেশনের কারণে গত দুই বছর ধরে অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টগুলোর চেয়ে অনেকটাই আলাদা।
বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এই মিউটেশনের কারণে ভাইরাসটি মানুষের শরীরে আগের সংক্রমণ বা ভ্যাকসিন থেকে তৈরি হওয়া রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আংশিকভাবে ফাঁকি দিতে সক্ষম হতে পারে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদে বলা হচ্ছে, নতুন এই ভাইরাস নিয়ে ইতোমধ্যেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে আতঙ্ক।
বাড়ছে সিকাডা শনাক্ত
সবশেষ ৩০শে মার্চ ইউরোপিয়ান মেডিকেল জার্নাল তাদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, ইতোমধ্যে বিশ্বের ২৩টি দেশে সিকাডা শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ভ্যারিয়েন্টটি প্রায় এক বছর আগে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম শনাক্ত হলেও গত বছর সেপ্টেম্বর থেকে এটি ছড়াতে শুরু করে।
তবে ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারির মধ্যে দ্রুত হারে বেড়েছে সিকাডায় আক্রান্তের সংখ্যা।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) এর ১১ই ফেব্রুয়ারি তথ্য বলছে, সিকাডা ভ্যারিয়েন্টটি এরই মধ্যে দেশটির ২৫টি অঙ্গরাজ্যের ১৩২টি স্থানের বর্জ্য পানির নমুনায় শনাক্ত হয়েছে।
যার মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া, নিউইয়র্ক, টেক্সাসসহ আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্য রয়েছে।
ওয়েস্টওয়াটার সার্ভেইলেন্স বা বর্জ্য পানি নজরদারি এমন একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে কোভিড ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগাম সতর্কতা পাওয়া যায়।
এর কারণ হিসাবে বলা হচ্ছে, আক্রান্ত ব্যক্তির মল ও প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয় কোভিড ভাইরাস। আর সেই ভাইরাসের জেনেটিক উপাদান জমা হয় পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায়।
তাই বিজ্ঞানীরা সেই পানি পরীক্ষা করে আগেভাগেই ভাইরাসের উপস্থিতি ধরতে পারেন।
সহজ করে বললে, কোভিডের টেস্ট করানোর আগেই বর্জ্য পানি পরীক্ষার মাধ্যমে এর আগাম সিগন্যাল পাওয়া যায়। যা সংক্রমণ বাড়ার আগেই সতর্ক করে।
লক্ষণ কী?
সিকাডা‘র লক্ষণ সম্পর্কে জানতে চাইলে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. তাহমিনা শিরীন জানান, ভ্যারিয়েন্টটি নতুন হলেও লক্ষণগুলোও আগের মতোই।
“সিকাডার কমন উপসর্গ হলো কাশি ও তীব্র গলা ব্যথা। যা ‘রেজার ব্লেড থ্রোট’ বা গলায় ব্লেড দিয়ে কাটার মতো তীব্র ব্যথার মতো মনে হতে পারে,” আলাপ-কে বলেছেন তিনি।
এর পাশাপাশি, সর্দি ও নাক দিয়ে পানি পড়া, অতিরিক্ত ক্লান্তি, তীব্র মাথাব্যথা ও জ্বর থাকতে পারে বলেও জানান তিনি।
টিকায় কতটা ভরসা?
এই মিউটেটেড ভ্যারিয়েন্টটির সঙ্গে মানুষের ইমিউন সিস্টেম পরিচিত নয়। তবে, টিকা নেওয়া থাকলে বা আগের সংক্রমণ থেকে শরীরে তৈরি অ্যান্টিবডির জেরে এই ভ্যারিয়েন্ট বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
এ নিয়ে এখনো কোনে পরীক্ষা না হওয়ায় টিকা নেওয়া থাকলেও তা সিকাডা’র ক্ষেত্রে সফলভাবে কাজ করবে কি না এ নিয়ে সন্দেহ রয়েছে তাহমিনা শিরীনের।
বাংলাদেশ এর জন্য কতটা প্রস্তুত এ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বুস্টার ডোজ দেওয়ার সময় শেষ হয়ে গেছে। তাছাড়া, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে এই ভ্যারিয়েন্টের কোনো রোগি পাওয়া যায় নি। আর স্ট্যাডি রেজাল্টও নেই। তাই এ নিয়ে সেভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।”
এখনও পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ মেলেনি যে, সিকাডা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের তুলনায় বেশি ক্ষতিকর। হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়নি।
নতুন এই ভ্যারিয়েন্টটি ‘আন্ডার মনিটরিং’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। অর্থাৎ, আপাতত নজর রাখা হচ্ছে করোনার সিকাডার ওপর।
তাই বিশেষজ্ঞরা একে এখনই 'আতঙ্ক নয়, বরং দেখছেন সচেতনতার' বিষয় হিসেবে।