মার্চ ১৯৭১। ঢাকার আকাশে তখনো বারুদের গন্ধ জমাট বাঁধেনি। রাজনৈতিক অচলাবস্থা দানা বাঁধছিলো। তখনও অবশ্য সমাধানের একটি সম্ভাবনা টিকে ছিল।
ঢাকায় দায়িত্বরত যুক্তরাষ্ট্রের কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড নিয়মিতভাবে ওয়াশিংটনে টেলিগ্রাম বার্তা পাঠাচ্ছিলেন।
তিনি জানাচ্ছিলেন, একটি রাষ্ট্র ভাঙনের প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এখনো আলাপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এই গল্প সেই টেলিগ্রামগুলোর। যেখানে একদিকে আছে রাজনৈতিক সমঝোতার শেষ চেষ্টা অন্যদিকে ধাপে ধাপে উন্মোচিত হয়েছে গণহত্যার বাস্তবতা। আর্চার ব্লাড ইতি টেনেছেন নজিরবিহীন এক কূটনৈতিক প্রতিবাদের মধ্যে দিয়ে।
আলোচনার শেষ আলো
একাত্তরের ১০ই মার্চ। ওয়াশিংটনে পাঠানো টেলিগ্রামে ব্লাড জানিয়েছেন, শেখ মুজিবুর রহমানের বার্তা নিয়ে জনৈক আলমগীর রহমান তার সাথে দেখা করতে এসেছেন।
তিনি ব্লাডকে জানিয়েছেন মুজিব রাজনৈতিক সমাধান চান, রক্তপাত এড়াতে চান। এমনকি ‘কনফেডারেশন’ ধরনের কোনও সমাধান সম্ভব।
টেলিগ্রামটির মূলে ছিল একটি প্রশ্ন, যা ভবিষ্যত ইঙ্গিত করছিলো। বার্তাবাহকের মাধ্যমে মুজিব জানতে চেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া কী?
প্রশ্নটি ছিলো, “যুক্তরাষ্ট্র কি এমন একটি সামরিক সংঘাত দেখতে চায়, যার পরিণতিতে বাংলায় কমিউনিস্ট আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আছে। নাকি বর্তমান সংকটের একটি রাজনৈতিক সমাধানকে প্রাধান্য দেবে?”
ব্লাড এই প্রশ্নের উত্তরে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র অবশ্যই রাজনৈতিক সমাধানকে সমর্থন করে।
আর ওয়াশিংটনকে তিনি জানান, ‘শান্তিপূর্ণ’ সমাধানের বদলে ‘রাজনৈতিক সমাধান’ প্রত্যাশার মানে হলো সামরিক আগ্রাসনকে সমর্থন না করা।
টেলিগ্রামটির শেষে ব্লাড এমন জরুরি পরিস্থিতিতে ‘ইতিবাচক’ হওয়ার প্রত্যাশা জানান।
বদলে যাওয়া ভাষা
পঁচিশে মার্চ ঢাকায় ঘটে যায় নারকীয় হত্যাকাণ্ড। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর চলে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নির্বিচার নিধনযজ্ঞ।
ওই রাত সব হিসাব পাল্টে দেয়। আঠাশে মার্চ ব্লাডের টেলিগ্রাম বার্তার শিরোনামই ছিল ‘সিলেক্টিভ জোনোসাইড’ অর্থাৎ ’বাছাইকৃত গণহত্যা’।
ব্লাড লেখেন, “ঢাকায় আমরা পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সন্ত্রাসের রাজত্বের নীরব ও আতঙ্কিত সাক্ষী হয়ে আছি।”
এই লাইনটি শুধু একটি পর্যবেক্ষণ নয়, এটি এক কূটনীতিকের মানসিক অবস্থার প্রকাশ। এরপর তিনি যা লেখেন তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পরিকল্পিত সহিংসতার চিত্র।
“ক্রমাগত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছে আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি তালিকা আছে, যাদের তারা ঘরে ঘরে খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যা করছে।”
ব্লাডের বার্তাতে লেখা ছিল ‘systematically eliminating’। এই শব্দ দুটিতে স্পষ্ট যে এটি হঠাৎ কোন সহিংসতা নয় বরং সংগঠিত নির্মূল অভিযান।
টেলিগ্রামে তিনি হত্যার শিকার শিক্ষকদের নাম উল্লেখ করেন। জানান ছাত্রনেতাদের টার্গেট করা হচ্ছে, এমনকি সংসদ সদস্যদেরও খুঁজে বের করে হত্যা করা হচ্ছে।
আরেক লাইনে তিনি লেখেন, “পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর সহায়তায় অবাঙালি মুসলমানরা ‘সিস্টেমেটিকালি’ দরিদ্র মানুষের বসতিতে হামলা চালাচ্ছে এবং বাঙালি ও হিন্দুদের হত্যা করছে।”
ঢাকার রাস্তাঘাটের অবস্থা তিনি এক লাইনে বর্ণনা করেন। “ঢাকার রাস্তাগুলো ভরে গেছে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হিন্দু ও অন্যান্য মানুষের স্রোতে।”
টেলিগ্রামের শেষে তিনি ওয়াশিংটনের অবস্থানকে প্রশ্ন করে লেখেন, “অতএব, আমি প্রশ্ন তুলছি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বর্তমান অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে, যেখানে পাকিস্তান সরকারের মিথ্যা দাবিকে বিশ্বাস করার ভান করা হচ্ছে…”
ব্লাড লেখেন যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ জানানো উচিত। “নিজেদের নাগরিকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত এই সন্ত্রাস নিয়ে আমাদের অন্তত বিস্ময় প্রকাশ করা উচিত।”
সহিংসতার নকশা
মাত্র ১৮ দিনের ব্যবধানে ঢাকার চিত্র পুরো বদলে যায়। আলোচনার সম্ভাবনার জায়গা দখল করে নেয় সহিংসতা।
ঢাকায় তখন দিন-রাতের পার্থক্য মুছে গেছে। পঁচিশে মার্চের অভিযানের পর শহরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ধোঁয়া, পোড়া গন্ধ আর আতঙ্কের ভেতর থেকেই আসছিল একের পর এক খণ্ডচিত্র।
বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করে ব্লাড বাস্তবতা বোঝার চেষ্টা করছিলেন ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কূটনীতিকরা।
তার ভিত্তিতে লেখা ২৯এ মার্চের টেলিগ্রামটি আগের দিনের চেয়েও কঠিন পরিস্থিতি তুলে ধরে।
একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে ব্লাড লেখেন, “ব্যাপারটা ছিল এমন প্রথমে বাড়িতে আগুন লাগানো হয় আর তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে আসা মানুষদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।”
টেলিগ্রামে তিনি উল্লেখ করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিখোঁজ বা নিহত হচ্ছেন, সেনারা লুটপাট করছে, পুলিশ কার্যত অচল, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস ক্যাম্পে শত শত নিহত, হিন্দুদের ওপর বিশেষভাবে আক্রমণ হচ্ছে।
ক্ষয়ক্ষতির নির্দিষ্ট সংখ্যা দিতে না পারলেও ব্লাডের সূত্রগুলো একমত, সংখ্যা ‘খুব বেশি’। বিশেষ করে হিন্দুরা লক্ষ্যবস্তু ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছিল সব ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক উৎস নিশ্চিহ্ন করাই এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সম্ভাব্য কারণ।
সহিংসতা কেবল রাজনৈতিক বা বুদ্ধিজীবী মহলে সীমাবদ্ধ ছিল না। ব্লাড একজন প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় বলেন, “সরকার বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই, এমন একটি পরিবারকেও সেনাবাহিনী হত্যা করেছে।”
শহরে তখন বাঙালি-অবাঙালি উত্তেজনা তীব্র। এমনকি কনস্যুলেট কর্মকর্তারা একটি হত্যাকাণ্ড দেখেছেন বলেও টেলিগ্রামে উল্লেখ আছে।
পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ওপর হামলার বর্ণনাও উঠে আসে টেলিগ্রামে। এক হাজার সদস্যের মধ্যে ৭০০ জন নিহত, ২০০ জন বন্দি এবং মাত্র ১০০ জন পালাতে পেরেছেন বলে উল্লেখ করা হয়।
ইউএসএআইডি’র এক কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, “পুলিশ এখন আর কার্যকর কোনো বাহিনী না।”
রাজারবাগ পুলিশ লাইন ধ্বংস, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, ঢাকায় কার্যত কোনো পুলিশ দৃশ্যমান ছিল না।
ব্লাডের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, “দেখা যাচ্ছে সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল, প্রথমতঃ সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত করে প্রতিরোধের ইচ্ছা ভেঙে দেওয়া এবং দ্বিতীয়তঃ সমাজের সেই সব অংশকে নির্মূল করা, যারা সম্ভাব্য হুমকি হতে পারে…”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হত্যাযজ্ঞ
ঢাকার ঘটনাগুলো তখন আর বিচ্ছিন্ন খবর নয়। হয়ে উঠেছে পূর্ণাঙ্গ ট্র্যাজেডি। ত্রিশে মার্চ ওয়াশিংটনে ব্লাডের পাঠানো টেলিগ্রামের শিরোনামেই সব স্পষ্ট ছিল, ‘কিলিংস’।
এই টেলিগ্রামে তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল তুলে ধরেন ঢাকার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘটে যাওয়া হত্যাযজ্ঞের প্রত্যক্ষ বর্ণনা।
জাতিসংঘের ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশনের এক মার্কিন কর্মকর্তা ২৭এ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘুরে এসে যে অভিজ্ঞতার কথা জানান, তা ছিল শিউরে ওঠার মতো।
তিনি জানান, “ইকবাল হলে ছাত্রদের যে অস্ত্র ছিল, তা কেবল সেনাবাহিনীকে আরও উত্তেজিত করে তোলে।”
তিনি লেখেন, “ছাত্রদের হয় কক্ষের ভেতরেই গুলি করে মারা হয়, নয়তো দলবেঁধে বের হলে মেশিনগানে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয়।”
তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন প্রায় ২৫টি মরদেহের স্তুপ। তাকে জানানো হয়, আগের মরদেহগুলো সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তিনি সেখানে থাকাকালেই একটি ফাঁকা সামরিক ট্রাক এসে মরদেহ নিয়ে যায়।
টেলিগ্রামের সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল “কোকেয়া (রোকেয়া হল) গার্লস হলের” ঘটনা। “ভবনে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়, আর মেয়েরা বেরিয়ে আসার সময় তাদের মেশিনগান দিয়ে গুলি করা হয়।”
প্রায় ৪০ জন ছাত্রী নিহত হন বলে উল্লেখ করা হয়। “এই আক্রমণের লক্ষ্য ছিল নারী ছাত্রনেতৃত্বকে নির্মূল করা।”
আরেক লাইনে ব্লাড লেখেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের সব নথি সেনাবাহিনী পুড়িয়ে দিয়েছে, যা একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে মনে হয়।”
টেলিগ্রামের শেষ অংশে ব্লাড পর্যবেক্ষণে বলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘ট্রাবল মেকিং’ জেনারেশনের সব চিহ্ন মুছে ফেলার একটি অভিযান চলছে।”
কূটনীতিকের বিরল প্রতিবাদ
পাঁচদিন ধরে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন আর্চার কে ব্লাড। পরে ৬ই এপ্রিল যে টেলিগ্রাম পাঠান স্টেট ডিপার্টমেন্টে, তা ছিল ওই সময়ের মার্কিননীতির বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান।
সেই বার্তার শিরোনামই ছিল ‘ডিসেন্ট ফ্রম ইউএস পলিসি টুয়ার্ডস ইস্ট পাকিস্তান’ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তান বিষয়ে মার্কিননীতিতে আপত্তি।
এতে ২০জন মার্কিন কর্মকর্তা সই করেন। টেলিগ্রামের শুরুতেই বলা হয়, “বর্তমান নীতির মৌলিক দিকগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত আপত্তি জানানোকে আমরা আমাদের দায়িত্ব মনে করছি।”
কূটনীতির প্রচলিত সীমা ভেঙে সরসারি আঙুল তোলেন নিজ দেশের নীতির বিরুদ্ধে। “আমাদের সরকার গণতন্ত্র দমনকে নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের সরকার নৃশংসতাকে নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছে।”
তাদের অভিযোগ, পশ্চিম পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত সরকারকে তুষ্ট করতে “আমাদের সরকার অতিরিক্ত নমনীয়তা দেখাচ্ছে"।
এই অবস্থানকে তারা বর্ণনা করেন, ‘মোরাল ব্যাংকরাপ্সি’ বা নৈতিক দেউলিয়াত্ব হিসাবে।
তারা বলেন, “বহুল ব্যবহৃত শব্দ ‘জেনোসাইড’ এখানে প্রযোজ্য।”
এরপর নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, “আমরা বর্তমান নীতির বিরুদ্ধে আমাদের আপত্তি জানাচ্ছি।”
তারা আহ্বান জানান, “মুক্ত বিশ্বের নৈতিক নেতৃত্ব হিসেবে আমাদের অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে হবে।”
সই করা ২০ জন কর্মকর্তার বক্তব্যের সাথে একমত পোষণ করে ব্লাড লেখেন, “উল্লিখিত কর্মকর্তাদের এই ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে আমি সমর্থন করি।”
টেলিগ্রামের মন্তব্য অংশে ব্লাড লেখেন, “সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল হলো বাঙালিদের বিজয় এবং একটি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।”
তিনি সতর্ক করে দিয়ে লেখেন, “সম্ভাব্য পরাজিত পক্ষকে একতরফাভাবে সমর্থন দিয়ে আমরা একটি মূল্যবান সম্পদ হারাব, এটি বোকামি হবে।”
অবশেষে ওয়াশিংটনের জবাব এলো
টানা কয়েকটি টেলিগ্রাম বার্তায় মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতা তুলে ধরছিলেন আর্চার ব্লাড। সাতই এপ্রিল ঘুম ভাঙে ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের।
ছয়ই এপ্রিলের বিখ্যাত ‘ডিসেন্ট টেলিগ্রামের’ পরদিনই ঢাকায় প্রতিক্রিয়া পাঠায় ওয়াশিংটন। ঢাকার কর্মকর্তাদের অনুভূতি বুঝতে পারছে বলে স্বীকার করে স্টেট ডিপার্টমেন্ট।
“আপনাদের সহকর্মীদের প্রকাশ করা অনুভূতির গভীরতা আমরা পুরোপুরি উপলব্ধি করছি।”
মূল আপত্তিগুলোকে দুই ভাগে ভাগ করে তারা। পাকিস্তানের পদক্ষেপের নিন্দা না করা এবং নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ।
তৎকালীন ইউএস সেক্রেটারি অব স্টেট উইলিয়াম রজার্স ব্যাখ্যায় স্বীকার করে নেন যে তারা কয়েকটি কারণে প্রকাশ্য বক্তব্য থেকে বিরত থেকেছে।
“আমেরিকানদের নিরাপদ সরিয়ে নেওয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
দ্বিতীয় কারণ হিসাবে তিনি বলেন, “পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে আমরা মূলত একটি অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখি।”
আর তৃতীয় কারণ হিসেবে তারা উল্লেখ করেন তথ্যের অনিশ্চয়তা। তাদের মতে নানা দিক থেকে বিপরীতধর্মী তথ্য আসছিল।
তবে রজার্স দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্র একদম নীরব ছিল না। মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত একাধিক বিবৃতিতে উদ্বেগ জানানোর বিষয় উল্লেখ করেন তিনি।
ছাব্বিশে মার্চের বক্তব্য, “আমরা উদ্বেগের সঙ্গে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি।”
দোসরা এপ্রিলের বক্তব্য, “প্রাণহানির খবরে আমরা স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন।”
একই সঙ্গে তিনি লেখেন, “নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।”
এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে ওয়াশিংটনের অবস্থান। তারা উদ্বেগ জানাচ্ছে কিন্তু সরাসরি দায় নির্ধারণ বা কঠোর ভাষায় নিন্দা করতে রাজি নয়।
টেলিগ্রামের শেষ দিকে এসে ওয়াশিংটন একটি কৌশলগত দিক উল্লেখ করে। তারা লেখে, “যদি শেষ পর্যন্ত বাঙালিদের বিজয় ও একটি স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে সেটির প্রভাব আমাদের নীতিতে বিবেচনা করতে হবে।”
প্রতিবাদের শেষ পেরেক
ঢাকায় যখন একজন কূটনীতিক এবং তার সহকর্মীরা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী এবং মার্কিননীতিকে নৈতিক সংকট হিসেবে দেখছিলেন, তখন ওয়াশিংটন দেখছিল কৌশল, নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক ভারসাম্যের দৃষ্টিকোণ থেকে।
এই পার্থক্যটাই একাত্তরের মার্কিন নীতির ভেতরের দ্বন্দ্বকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করে।
ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়ার পরও থামেননি ঢাকার মার্কিন কনসাল জেনারেল। দশই এপ্রিল আরেক টেলিগ্রামে আরও বিশদ ব্যাখ্যায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেন; জানান কেন তারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সঙ্গে একমত নন।
এই টেলিগ্রামে তারা শুধু আপত্তিই তোলেননি বরং ওয়াশিংটনের বিশ্লেষণকেই চ্যালেঞ্জ করেছেন।
তারা জানান, পশ্চিম পাকিস্তান যদি সামরিক হস্তক্ষেপ করে তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে রক্তপাত ঠেকানোর উদ্যোগ নেওয়া। এমনকি তাতে ইসলামাবাদ ক্ষুদ্ধ হলেও।
“রক্তপাত ঠেকাতে আমাদের যা সম্ভব করা উচিত … প্রয়োজনে পশ্চিম পাকিস্তানকে বিরক্ত করার ঝুঁকি নেওয়া উচিত।”
তারা সরাসরি অভিযোগ করেন, “এই নীতিকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেই আমাদের উদ্বেগ।”
ওয়াশিংটনের বিশ্লেষণ নিয়ে তাদের ঘোর আপত্তি ছিল। বিশেষ করে ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশ্য নিয়ে তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন।
“রাজনৈতিক সমাধানের ক্ষেত্রে ইয়াহিয়ার আন্তরিকতা নিয়ে আমরা প্রশ্ন তুলি।”
ওয়াশিংটনের যুক্তি খণ্ডন করে ব্লাড লেখেন, “নৈতিক আদর্শ এখানে অবশ্যই প্রাসঙ্গিক ।”
তারা মনে করিয়ে দেন, “আমরা যে ভয়াবহতার কথা বলেছি, তা বাস্তব—কোনো আবেগতাড়িত অতিরঞ্জন নয়।”
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসাবে দেখার যুক্তিও আমলে নেননি ব্লাড ও তার সহকর্মীরা। তিনি লেখেন, “আমরা এটিকে নিছক অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে দেখি না।”
ফের তারা ‘জেনোসাইড’ শব্দটি ব্যবহার করে লেখেন, “জেনোসাইডের নিন্দা করা আন্তর্জাতিক নৈতিক দায়িত্ব।”
উপসংহারে তারা লেখেন, “একটি স্বাধীন ‘বাংলাদেশ’ এখন অনিবার্য।”
আর্চার কে ব্লাডের এই তারবার্তাগুলো সাক্ষ্য দেয় ঢাকায় বসে মার্কিন কূটনীতিকরা একাত্তরের ভয়াবহতা শুধু দেখেননি, বরং নিজ দেশের নীতিকে চ্যালেঞ্জ করছিলেন।
তথ্যসূত্র: ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের ‘অফিস অব দ্য হিস্টোরিয়ান’