জঙ্গলে হাঁটতে থাকা রক্তাক্ত মেয়েটির সঙ্গে কী হয়েছিল

পাহাড় জঙ্গলে ঘেরা চট্টগ্রামের সীতাকুন্ড। তার মধ্যে রাস্তায় ব্লকের কাজ করছিল কিছু শ্রমিক। তাদের একজন হঠাৎ করে দেখতে পেল জঙ্গল দিয়ে হেঁটে আসছে ছোট্ট একটা মেয়ে। বয়স হবে সাত বা আট। রক্ত ঝরছে মেয়েটির গলা থেকে। কথা বলতে পারছে না মেয়েটি। ইশারায় কিছু একটা বোঝানোর চেষ্টা করছে।

এই খবরটি হয়তো আপনাদের অনেককেই নাড়া দিয়েছে। সবশেষ খবর অনুযায়ী শিশুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে। কিন্তু কী ঘটেছিল মেয়েটির সাথে?

রবিবার দুপুরের ঘটনা। রক্তাক্ত অবস্থায় মেয়েটিকে দেখে উদ্ধার করে রাস্তায় কাজ করতে থাকা শ্রমিকরা। গলার কাটা অংশ কাপড় দিয়ে বেঁধে দ্রুত একটি ট্রাকে করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান তারা।  

মেয়েটিকে দুপুর দুইটার দিকে সীতাকুন্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আনা হয় বলে জানান সেখানকার কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলতাব হোসেন।

তিনি বলেন, “২০-২৫ বছরের দুই তিন জন ছেলে ঘটনাস্থল থেকে মেয়েটিকে আমাদের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসে। ওরা ওখানে কাজ করছিল, তাদের ভাষ্য অনুযায়ী।” 

মেয়েটির প্রাথমিক অবস্থা বেশ আশঙ্কাজনক ছিল বলে জানিয়েছেন তিনি। 

“গলা থেকে ব্লিডিং হচ্ছিল, শ্বাসনালীর কাছাকাছি কাটা পড়েছিল, শ্বাসনালীরও কিছু অংশ কাটা গিয়েছিল। পরে প্রাথমিকভাবে ব্লিডিং কন্ট্রোল করার জন্য যা করার প্রয়োজন তা করা হয়”, বলেন তিনি।

আলতাব হোসেন জানান, মেয়েটিকে যখন নিয়ে আসা হয়, তখন তার শরীরের নিচের অংশে কোনো পোশাক ছিল না।

“গলা কাটা ছাড়াও যৌনাঙ্গের বাহিরের অংশে এক্সটারনাল ইনজুরিও ছিলো।” 

এ থেকে ধারণা করা যায় শিশুটিকে যৌন নির্যাতন করা হয়েছে। এ আশঙ্কা থেকেই পুলিশের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তবে পুলিশ আসার আগেই মেয়েটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তবে তাকে যারা উদ্ধার করে এনেছিল তাদের যেতে দেননি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকেরা। পরে পুলিশ সেখানে এসে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে।

আলতাব হোসেন জানান, মেয়েটির পরিচয় জানতে সোশ্যাল মিডিয়ায় তার ছবি দেওয়া হয়, যা দেখে সাড়া দেন মেয়ের বাবা।

যেখানে মেয়েটিকে পাওয়া যায় তার থেকে ৫-৭ কিলোমিটার দূরে মেয়েটির বাড়ি, জানান সীতাকুন্ড মডেল থানার ওসি মহিনুল ইসলাম। 

“ক্লাস টুতে পড়তো মেয়েটা। মেয়েটাকে যে কেউ ফুসলিয়ে নিয়ে আসছে হয়তো, বাড়ি থেকে কমপক্ষে ৫-৭ কিমি দূরে, পরিচিত লোক ছাড়া আসতে পারার কথা না”, বলেন ওসি।  

এত দূরে মেয়েটা গেল কীভাবে তা জানতে পুলিশ ইতোমধ্যে মেয়ের বাবাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। জড়িতদের খুঁজে বের করতে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।  

এ ঘটনায় মেয়েটির মা একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। 

মেয়েটির বাবা জানাচ্ছেন, রবিবার সকাল সাড়ে নয়টার দিকে দাদাবাড়িতে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে বের হয়েছিল মেয়েটি। দাদাবাড়ি তাদের বাসা থেকে ১৫-২০ মিনিট হাঁটা দূরত্বে। 

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর মেয়েটির পরিচয় জানতে দেওয়া পোস্টটি ভুক্তভোগীর চাচার চোখে পড়ে। একটার দিকে ছবি দেখে বাবাকে কল করলে তারা জানতে পারে, সেদিন আর দাদাবাড়িতে যায়নি মেয়েটা। বাবা ধারনা করছেন, সকালে যাওয়ার পথেই কেউ হয়তো তুলে নিয়ে গেছে।

ফেইসবুকে দেওয়া সেই ছবি দেখে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যোগাযোগ করেন তিনি। পরে অ্যাম্বুলেন্সে করে নেওয়ার সময় রাস্তা থেকে গাড়িতে ওঠে মেয়ের সাথে হাসপাতালে যান বাবা। এখন চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসাধীন আছে বলে জানান তিনি। 

সীতাকুন্ড থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাকিলা ইয়াসমিন সূচনা জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত দুটো অস্ত্রোপচার হয়েছে মেয়েটির।

ভুক্তভোগীর সাথে কথা বলতে পারলে অনেক কিছুই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

মেয়েটি ধর্ষণের শিকার হয়েছে কি না তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে এখনও আমাদের হাসপাতাল থেকে কিছু জানানো হয়নি। ডাক্তাররা আগে তার জীবন বাঁচাতে যা করার করছেন, তারপর সেই পরীক্ষা করা হবে।”

তবে ভুক্তভোগীর সাথে আর কথা হবে না কারো। রবিবার রাত সাড়ে তিনটার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে মেয়েটি মারা গেছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার মরদেহ হস্তান্তর করা হবে পরিবারের কাছে।