বাংলাদেশের জনসংখ্যার বেশিরভাগই নারী। তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন নিয়ে নানা উদ্যোগ ও পলিসি গ্রহণ করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই পলিসি বাস্তবায়নেই তৈরি হয় বড় চ্যালেঞ্জ। রবিবার ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে এমনটাই জানিয়েছেন আলোচকরা।
এই সেমিনারে প্রথমবারের মতো জনসমক্ষে বক্তব্য রেখেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তিনি বলেছেন, “ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও আমরা একসাথে বসেছি, কথা বলছি, এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।”
ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে রবিবার অনুষ্ঠিত ‘জাতি গঠনে নারী: নীতি, সম্ভাবনা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক সেমিনারে তিনি বলেন, “আমরা কেউ-ই একরকম না। আমাদের আদর্শ, অভিজ্ঞতা, দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা। তবুও আমরা একসঙ্গে বসেছি, আলোচনা করছি। কারণ আমরা সবাই দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য ভাবছি। এই ভিন্নতা নিয়ে একসঙ্গে কথা বলছি, শুনছি-এটাই গণতন্ত্রের আসল সৌন্দর্য।”
সেমিনারে নারী উন্নয়ন ও ভবিষ্যতে জাতি গঠনে নারীদের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারীরা। আলোচক প্যানেলে ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সিপিডি পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তামারা আবেদ, বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী।
আলোচকরা বাংলাদেশের সমাজে নারীদের বিভিন্ন সমস্যা ও এর থেকে উত্তরণের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। তাদের পরে বক্তব্য দিতে আসেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন, “আমার আগে সম্মানিত প্যানেলিস্টরা কথা বলেছেন। তাদের সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। আপনারা অনেক কিছুই বলেছেন। হয়তোবা আমি আমিও বলে ফেলব। আমাদের একটা মাইন সিমিলারিটি আছে। খুব ভালো লেগেছে আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে, ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে।”
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়ে তিনি বলেন, “পলিসি লেভেলটায় আমার প্রথম বক্তব্য এটা, আমি এমন কেউ নই যার কাছে সব প্রশ্নের উত্তর আছে, বা সব সমস্যার সমাধান জানান। তবুও আমি বিশ্বাস করি, নিজের ছোট্ট জায়গা থেকেও সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করা, এই আন্তরিকতা আমাদের সবার মধ্যে থাকা উচিত। আজ আমি এসেছি শুনতে, শিখতে এবং একসাথে কাজ করার নিয়ে এগিয়ে যেতে।”
পরিবারই প্রথম
জাইমা রহমান বলেন, নারীর ভূমিকা সম্পর্কে তার সবচেয়ে প্রাথমিক উপলব্ধি এসেছে পরিবার থেকে। তিনি বলেন, সমাজে নারীর ভূমিকা সম্পর্কে আমার প্রথম ধারণা এসেছে আমার পরিবার থেকেই। আমাদের অনেকের ক্ষেত্রেই এটা সত্যি। নীতি, আইন বা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানার অনেক আগেই আমাদের ঘর হয়ে ওঠে প্রথম শ্রেণিকক্ষ। সেখানেই আমরা শিখি কী সম্ভব, কী গ্রহণযোগ্য আর কী প্রত্যাশিত।
“আমার মা একজন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে সরকারি হাসপাতালে কাজ করেছেন, অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক পরিবেশে। কিন্তু পরিবার থেকে পাওয়া সমর্থন আর উৎসাহই তাকে পেশা ও পরিবার দুটোই সামলাতে সাহায্য করেছে”, যোগ করেন জাইমা রহমান।
“আমাদের ঘরে কোনোদিন প্রশ্নই ওঠেনি যে একজন নারী কি পরিবার সামলানোর পাশাপাশি একজন আদর্শ চিকিৎসক হতে পারেন কি না।”- বলেন জাইমা রহমান।
এরপর নিজের নানির উদাহরণও টানেন তিনি। বলেন, “১৯৭৯ সালে আমার নানি সাঈদা ইকবাল মণ্ডবানু নিজের বাড়িতেই সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য একটি বিনামূল্যের প্রাথমিক বিদ্যালয় চালু করেন। ব্যক্তিগত যত্ন আর দায়িত্ববোধ থেকে শুরু হওয়া এই স্কুল এখন বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন এনজিও ‘সুরভি।”
ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রে
জাইমা রহমান বলেন, নারীর মর্যাদা শুধু ব্যক্তিগত পরিসরে নয়, রাষ্ট্রীয় নীতিতেও প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। তিনি বলেন, “নারীর মর্যাদা ব্যক্তিগত ও প্রকাশ্য দুই জায়গাতেই স্বীকৃত হওয়া দরকার– এই বিশ্বাসটাই আমার দাদা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেও প্রতিফলিত হয়েছিল। “তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীদের বাদ দিয়ে কোনো উন্নয়নই পূর্ণতা পায় না।”
এই বিশ্বাস থেকেই নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠনের মতো সিদ্ধান্ত এসেছে বলেও উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। নারী ও কন্যাশিশুদের জীবন উন্নয়নে ইচ্ছা আর কাঠামো দুটোরই প্রয়োজন আছে এই বিশ্বাস থেকেই এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
অর্থনৈতিক স্বাধীনতা
জাইমা রহমান বলেন, বাংলাদেশে এখনো নারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি কাজ করে। কিন্তু তারা অর্থনৈতিকভাবে সেই সম্মান পান না। অথচ তাদের এই কাজ আমাদের জিডিপির ১৯ শতাংশ পূরণ করে।
তারপরও নারীদের বিষয়টি জাতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সময় উপেক্ষিত থেকে যায় বলেও মন্তব্য করেন ব্যারিস্টার জাইমা।
তাই নারীদের ক্ষমতায় ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কোনো জেন্ডার ইস্যু নয়, বরং এটি একটি অর্থনৈতিক বিষয় বলে মত দেন জাইমা রহমান।
নারী শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের প্রসঙ্গে জাইমা রহমান বলেন, “নারীদের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা সহায়তা প্রকল্পের মাধ্যমে প্রথমবারের মতো মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গসমতা অর্জিত হয়েছিল—যেটি পরে বাংলাদেশের বাইরেও একটি মডেল হিসেবে অনুসরণ করা হয়।”
এই পর্যায়ে তিনি নিজের একটা অভিজ্ঞতার কথা বলেন। তিনি বলেন, দাদি বেগম খালেদা জিয়া লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নাইজেরিয়ার এক নার্স বাবাকে (তারেক রহমান) বাংলাদেশে নারী শিক্ষা, নারী স্বাস্থ্য এবং নারীদের অগ্রগতির জন্য তার (খালেদা জিয়ার) অবদানের কথা বলেছিলেন। নাইজেরিয়ায় নারীদের উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার প্রণীত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন বলেন সেই নার্স।
সমাজকর্মী ও উদ্যোক্তা তামারা আবেদ বলেন, নারীদের শুধু জনসংখ্যার অংশ হিসেবে না দেখে মানবসম্পদ বা হিউম্যান ক্যাপিটাল হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। নারীদের মধ্যে যে লুকায়িত সম্ভাবনা রয়েছে, তা সামনে নিয়ে আসার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন নারীর উন্নয়নের আরেকটি বড় বাধার কথা সামনে আনেন। তিনি বলেন, নারীদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ‘একসেস টু ফিন্যান্স’। তিনি জানান, উদ্যোক্তা হলেও অনেক সময় ব্যাংক থেকে ঋণ পেতে সমস্যা হয় নারীদের। কোনো কিছু মর্টগেজ রাখতে পারেন না। অনেক সময় পরিবারের সদস্যরাও ‘নিশ্চয়তা দানকারী’ হয় না, এমনকি স্বামীও। আবার ঋণ নিলেও তা ব্যবহারের পূর্ণ স্বাধীনতাও অনেক সময় নারীদের থাকে না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, ‘শুধু রাজনীতিতে নয়, দেশের অর্থনীতিতেও নারীদের অংশগ্রহণ চিন্তা করতে হবে, যাতে দেশের অর্থনীতিতে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কর্মসংস্থানে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হলে দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত এলাকায় নারীদের আর্থিক সহায়তা বাড়াতে হবে। নারীদের কাজকে মার্কেটিং, ব্র্যান্ডিং ও ডিজাইন সাপোর্ট দিলে তাদের জীবনযাপনের চিত্র পাল্টে যাবে।’
নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে বিএনপির নেওয়া উদ্যোগের কথা জানান আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানান, বিএনপির যদি ক্ষমতায় আসে তবে প্রত্যেক নারীকে আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। তিনি বলেন,“ আমরা জানি এটা পর্যাপ্ত নয়। নারীরা বাসায় যে কাজ করে তার তুলনায় এটি খুবই নগন্য। তবে এটি সম্মান হিসেবে তাদের দিতে চাই আমরা।”
সাবেক এই মন্ত্রী আরও বলেন, “এটা আমাদের রাজনৈতিক বক্তব্য না। আমরা হিসেব করে দেখেছি কত কোটি নারী আছে। তাদের এই টাকা দিলে আমাদের কত টাকা বাজেট লাগবে। সেটা কীভাবে আসবে, সবকিছুই আমরা পরিকল্পনা করেছি, হিসেব করেছি। সেভাবেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছি।
পলিসি আর বাস্তবতার দূরত্ব
জাইমা রহমান বলেন, নারীদের এই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভূক্তি শুধু বিশ্বাস করলেই হবে না, পদক্ষেপ নিতে হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের বাবা, ভাই, স্বামী, বন্ধু, সহকর্মী যার পুরুষ আছেন। তাদের সহায়তা জরুরি।
“আপনারা যদি নারীর ত্যাগকে স্বাভাবিকই ধরে নেন, তবে তারা বঞ্চিতই থেকে যাবে। বিশেষ করে বাবাবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এই ধারণা ভেঙে ফেলার ক্ষেত্রে।”
বাংলাদেশে নারী ক্ষমতায়ন নিয়ে নীতিমালা ও অঙ্গীকারের অভাব নেই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে তার বাস্তব প্রয়োগে বড় ঘাটতি রয়ে গেছে বলেও মত দেন ব্যারিস্টার জাইমা। তিনি বলেন, অনেক মেয়েই পড়াশোনা শুরু করলেও কিশোর বয়সেই ঝড়ে পড়ে।
ড. ফাহমিদা বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, অনেক নীতিই তৈরি হয় শহুরে বাস্তবতা মাথায় রেখে, যেখানে গ্রাম বা প্রান্তিক নারীদের অভিজ্ঞতা প্রতিফলিত হয় না। ফলে নীতির ভাষা আর নারীদের দৈনন্দিন লড়াইয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়।
তামারা আবেদ যোগ করেন, বাস্তব পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নতুন পলিসি নয়, পুরোনো মানসিকতা ভাঙার কাজটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নীতির প্রয়োগ যারা করবেন, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো না গেলে নারী নেতৃত্বের প্রশ্নটি কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যাবে।
জাইমা রহমান বলেন, “আমি আজ এখানে দাঁড়িয়েছি ভিন্ন এক অনুভূতি ও আবেগ নিয়ে। বাংলাদেশের পলিসি লেভেলে এটা আমার প্রথম বক্তব্য। আমি এমন কেউ নই যার কাছে সব সমস্যার উত্তর আছে বা সব সমস্যার সমাধান আছে। তবুও আমি বিশ্বাস করি, নিজের ছোট্ট জায়গা থেকে সমাজের জন্য, দেশের জন্য কিছু করার আন্তরিকতা আমাদের সবার মধ্যে থাকা উচিত।”