বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে পরিণত হবে বাংলাদেশ, হাতে সময় মাত্র দুই দশক

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত ঠিক হবে আগামী দুই দশকে। তারুণ্যনির্ভর বাংলাদেশের যে গর্ব তা ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।

২০৫১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৪র শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। অর্থাৎ তরুণদের বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিণত হবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে।

এই যাত্রা শুরু হবে ২০২৭ সাল থেকেই। ওই বছর ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সের জনসংখ্যা হবে ৭ শতাংশের বেশি।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন উঠে এসেছে বাংলাদেশে এখন কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত তুলনামূলক বেশি। কর্মসংস্থান, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হলে এই জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টই দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

‘ডেমোগ্রাফিক চেইঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া’ প্রতিবেদন বলছে, বাংলাদেশ এমন এক জনমিতিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব আগামী কয়েক দশকে দেশের শ্রমবাজার, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সামাজিক নিরাপত্তার ওপর পড়বে।

বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী আড়াই দশকের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি বয়স্ক জনগোষ্ঠীনির্ভর সমাজের মুখোমুখি হতে হবে।

তবে শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সামনে একই ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। যদিও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে দেশগুলো এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

উন্নত দেশগুলো যখন জনসংখ্যায় বার্ধক্যের মুখোমুখি হয়েছিল, তখন তাদের তুলনামূলক বেশি অর্থনৈতিক সম্পদ, উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পেনশন কাঠামো ছিল। বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগ হলো, তুলনামূলক কম মাথাপিছু আয় নিয়েই এই পরিবর্তন সামাল দিতে হবে।

২০৫১ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার ১৪র শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছর বা তার বেশি। অর্থাৎ তরুণদের বাংলাদেশ ধীরে ধীরে পরিণত হবে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর দেশে।

জনসংখ্যার সুবিধা আর কত দিন

একটি দেশের জনসংখ্যার বড় অংশ যখন কর্মক্ষম বয়সে থাকে এবং নির্ভরশীল শিশু ও প্রবীণ মানুষের অনুপাত তুলনামূলক কম থাকে, তখন অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সুযোগ তৈরি হয়।

অর্থনীতিতে একে বলা হয় ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ট বা জনমিতিক লভ্যাংশ। বাংলাদেশ গত কয়েক দশক ধরে এই সুবিধা পাচ্ছে। জন্মহার কমে আসা এবং মানুষের গড় আয়ু বাড়ার ফলে জনসংখ্যার বয়সভিত্তিক কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে। এখন মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সের।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় ২০২৩ সালে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের হার ছিল মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এই অনুপাত ২০৩৪ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাবে ২০৪৫ সালে।

কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বাড়লেও ওই হারে কর্মসংস্থান তৈরি করাও জরুরি। শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হয়।

২০২২ সালের শেষ দিকে জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তারের পর এআইয়ের প্রভাবে বেশি পরিবর্তন হতে পারে এমন পেশাগুলোতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমে গেছে পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

তরুণ আছে, কিন্তু মানসম্মত চাকরি কোথায়

বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দুশ্চিন্তা কর্মসংস্থান। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু ওই অনুপাতে উৎপাদনশীল ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনটি বলছে, এই অঞ্চলের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৬০ শতাংশ কোনও না কোনো কাজে যুক্ত। অন্যান্য উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোতে এই হার ৬৯ শতাংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৩৪ শতাংশ কৃষির বাইরে তুলনামূলক বেশি উৎপাদনশীল খাতে কাজ করেন, যেখানে অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলে এই হার ৫১ শতাংশ।

কর্মরত মানুষের মধ্যেও ৮৮ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে যুক্ত। মানে শুধু চুক্তিহীন চাকরি নয় বরং, অনিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা, প্রশিক্ষণের সুযোগ কম থাকা এবং অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার অনিশ্চয়তায় আছে এই জনগোষ্ঠী।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় অনানুষ্ঠানিক কর্মীরা আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের তুলনায় ৪৫ থেকে ৮৪ শতাংশ পর্যন্ত কম আয় করেন।

এই ব্যবধান শুধু ব্যক্তিগত আয়ের বৈষম্য তৈরি করে না, সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাও কমিয়ে দেয়। বাংলাদেশ, ভারত ও নেপালে অনানুষ্ঠানিক ব্যবসা শুরু করা উদ্যোক্তাদের ৪৫ থেকে ৭০ শতাংশ জানিয়েছেন, বিকল্প আয়ের সুযোগ না থাকায় তারা ব্যবসা শুরু করতে বাধ্য হয়েছেন।

বাংলাদেশের কর্মক্ষম বয়সী নারীদের একটি বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারেন, তাহলে দেশের শ্রমশক্তি বাড়বে, পরিবারের আয় বাড়বে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

প্রতিযোগী যখন এআই

বিশ্বব্যাপী চাকরির বাজারে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। প্রযুক্তির এই পরিবর্তন শুধু ভবিষ্যতের বিষয় নয়, ইতোমধ্যে চাকরির বাজারে এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দক্ষিণ এশিয়ার চাকরির বিজ্ঞাপনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২২ সালের শেষ দিকে জেনারেটিভ এআইয়ের বিস্তারের পর এআইয়ের প্রভাবে বেশি পরিবর্তন হতে পারে এমন পেশাগুলোতে চাকরির বিজ্ঞাপন কমে গেছে পাঁচ ভাগের এক ভাগ।

বিশেষ করে কল সেন্টার, সাধারণ হিসাবরক্ষণ এবং একই ধরনের কাজ করতে হয় এমন চাকরির ক্ষেত্রে এই প্রভাব বেশি। মাধ্যমিক শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া এ ধরনের চাকরির বিজ্ঞাপন প্রায় ২৪ শতাংশ কমেছে।

স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীদের জন্য চাকরির বিজ্ঞাপনে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়নি। এআইয়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে চাকরি শুরু করবেন এমন পর্যায়ে থাকা তরুণদের ওপর।

বিশ্বব্যাংক এটিও বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে এমন চাকরিগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশে কর্মীদের পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বদলে এআইকে কাজের সহায়ক বা পরিপূরক প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনা আছে।

অর্থাৎ শুধু ডিগ্রি অর্জন করাই ভবিষ্যতের চাকরির বাজারে টিকে থাকার নিশ্চয়তা দেয় না। ডিজিটাল দক্ষতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সমস্যা সমাধান এবং পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

জনসংখ্যার বার্ধক্যকে শুধু অর্থনৈতিক বোঝা হিসাবে দেখাও আবার ঠিক নয়। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে, তাদের জন্য নতুন ধরনের পণ্য ও সেবার চাহিদাও তৈরি হয়।

নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত নিয়ে আলোচনায় নারীর কর্মসংস্থান এখন আর কোনো সামাজিক ইস্যু নয়। বরং এটি সরাসরি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার মাত্র ৩৫ শতাংশ, যা অন্যান্য উন্নয়নশীল অঞ্চলের তুলনায় অন্যতম সর্বনিম্ন। নারীদের শিক্ষা ও দক্ষতা বাড়লেও শ্রমবাজারে তাদের অংশগ্রহণ একই গতিতে বাড়ছে না। এর পেছনে রয়েছে সামাজিক বাধা, নিরাপদ যাতায়াতের সীমাবদ্ধতা, শিশুর পরিচর্যার দায়িত্ব এবং অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের অসম বণ্টন।

বাংলাদেশের কর্মক্ষম বয়সী নারীদের একটি বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত হতে পারেন, তাহলে দেশের শ্রমশক্তি বাড়বে, পরিবারের আয় বাড়বে এবং অর্থনীতির সামগ্রিক উৎপাদনক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

বিশ্বব্যাংকের মডেলভিত্তিক পূর্বাভাসে দেখা গেছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণের উন্নতি ঘটাতে পারলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু প্রকৃত জিডিপি বর্তমান পূর্বাভাসের তুলনায় ৪ শতাংশ বেশি হতে পারে।

নারী-পুরুষের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের ব্যবধান দূর করতে পারলে এই অর্জন ১৩ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। তবে এগুলো নিশ্চিত প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নয়, বরং বিভিন্ন সংস্কার বাস্তবায়িত হলে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফলের মডেলভিত্তিক হিসাব।

প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু ওই অনুপাতে উৎপাদনশীল ও আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।

আয়ু বেশি, কিন্তু সুস্থতা আছে কি

বাংলাদেশের জনমিতিক পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের আয়ু বেড়ে যাওয়া। কিন্তু দীর্ঘ জীবন এবং সুস্থ জীবন এক নয়।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় জন্ম নেওয়া একটি শিশু গড়ে ৭২ বছর বাঁচার প্রত্যাশা করতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৬১ বছর কাটবে পূর্ণ সুস্থতায়।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অসংক্রামক রোগের বিস্তার। হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসতন্ত্রের রোগ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় মোট আক্রান্তের দুই তৃতীয়াংশ। ২০০০ সালে যা ছিল ৩৬ শতাংশ।

বাংলাদেশে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রোগের চিকিৎসা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিচর্যার প্রয়োজন বাড়বে। শুধু হাসপাতালনির্ভর চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়ে এই চাহিদা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও নেপালে এক তৃতীয়াংশেরও কম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অসংক্রামক রোগের প্রয়োজনীয় সেবা দেওয়ার সক্ষমতা আছে।

ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শুধু রোগ হওয়ার পর চিকিৎসা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। বরং স্থানীয় পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করা, প্রতিরোধ এবং নিয়মিত পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ মানুষকে নিজের আয় থেকে বহন করতে হয়, তাই দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা পরিবারের সঞ্চয় ও শিক্ষাব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি করে।

‘ডেমোগ্রাফিক চেঞ্জ ইন সাউথ এশিয়া: ফ্রম টেলউইন্ডস টু হেডউইন্ডস ফর ডেভেলপমেন্ট’ শীর্ষক ২০২৬ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিশ্বব্যাংক।

অবসর সুবিধা নেই, ভাবনাও নেই

বাংলাদেশে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা থাকলেও বেসরকারি খাত, পেশাজীবী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমিক এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য অবসরকালীন জীবযাপন প্রায় অনিশ্চিত।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক পেনশন ব্যবস্থা নেই। ২০২৩ সালে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালু হলেও এতে অংশগ্রহণ স্বেচ্ছামূলক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বয়স্ক ভাতা কর্মসূচিতে নির্দিষ্ট আয়সীমার নিচের প্রবীণরা অন্তর্ভুক্ত হন। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই ভাতার পরিমাণ দরিদ্র গ্রামীণ পরিবারের গড় আয়ের মাত্র ৫ থেকে ৮ শতাংশের সমান। মূল্যস্ফীতির কারণে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতাও কমেছে।

আগামী ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লে তাদের চিকিৎসা ও জীবনযাপনের ব্যয় কে বহন দুরুহ হয়ে উঠবে।

বিশ্বব্যাংক বলছে, শুধু সরকারি পেনশন বা স্বেচ্ছায় সঞ্চয় দিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা যাবে না। বরং আনুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের সঞ্চয় সুরক্ষিত রাখা এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের পেনশন ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং ন্যূনতম সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৩ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় জন্ম নেওয়া একটি শিশু গড়ে ৭২ বছর বাঁচার প্রত্যাশা করতে পারে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৬১ বছর কাটবে পূর্ণ সুস্থতায়।

ভবিষ্যতে নতুন অর্থনীতি

জনসংখ্যার বার্ধক্যকে শুধু অর্থনৈতিক বোঝা হিসাবে দেখাও আবার ঠিক নয়। প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বেড়ে গেলে, তাদের জন্য নতুন ধরনের পণ্য ও সেবার চাহিদাও তৈরি হয়।

স্বাস্থ্যসেবা, পুনর্বাসন, প্রযুক্তি, হোম কেয়ার, প্রবীণবান্ধব আবাসন, আর্থিক সেবা এবং বিশেষায়িত পরিবহনের মতো খাতে নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। বিশ্বব্যাংক এই সম্ভাবনাকে ‘সিলভার ইকনমি’ বা প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অর্থনীতি হিসেবে বিবেচনা করেছে।

বাংলাদেশে এই খাতে এখনও বাজার তৈরি হয়নি। তবে ভবিষ্যতে এটি নতুন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী এবং দক্ষ কর্মীদের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে।

প্রশিক্ষিত কেয়ারগিভার, স্বাস্থ্যসেবা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করা গেলে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে প্রবীণদের জীবনমানও উন্নত হবে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মীর সংখ্যা ২০২৩ সালের ১ কোটি ৩০ লাখ থেকে বেড়ে ২০৫০ সালে ৩ কোটি ১০ লাখে পৌঁছাতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন উঠে এসেছে বাংলাদেশে এখন কর্মক্ষম মানুষের অনুপাত তুলনামূলক বেশি। কর্মসংস্থান, দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ না হলে এই জনমিতিক সুবিধা বা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টই দেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে করণীয় কী

প্রতিবেদনের বিশ্বব্যাংকে পরামর্শ অনুযায়ী বাংলাদেশকে দুটি কাজ একই সঙ্গে করতে হবে। একদিকে বর্তমান কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। অন্যদিকে ভবিষ্যতের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্য, পেনশন ও সামাজিক নিরাপত্তার কাঠামো তৈরি করতে হবে।

এ জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত মানসম্মত কর্মসংস্থান। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের ঋণ পাওয়া সহজ করা, ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা জরুরি।

শিক্ষাব্যবস্থায় গুণগত মান এবং শ্রমবাজার অনুযায়ী দক্ষতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিক চিকিৎসা এবং অসংক্রামক রোগ ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

পেনশন ব্যবস্থাকে অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করতে হবে। এই সবকিছুর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর কর-জিডিপির অনুপাত গড়ে ১২ শতাংশের নিচে। যেখানে দীর্ঘমেয়াদে প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা ঠিক রাখতে অন্তত ১৫ শতাংশের মতো রাজস্ব সক্ষমতা প্রয়োজন। যদিও এটি আঞ্চলিক গড়ের হিসাব, বাংলাদেশের পরিসংখ্যান নয়।

আগামী দশকই ঠিক করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যত

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো, তরুণ জনগোষ্ঠী দেশের জন্য সুযোগ তৈরি করে, কিন্তু সেই সুযোগ নিজে থেকেই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করে না।

এই জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগাতে হলে, কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত চাকরি, সুস্থতা, শিক্ষা ও দক্ষতা প্রয়োজন। একই সাথে দরকার কর্মজীবন শেষে আর্থিক নিরাপত্তা।
বাংলাদেশের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। বর্তমান তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল শক্তিতে রূপান্তর করার পাশাপাশি আগামী দিনের প্রবীণ জনগোষ্ঠীর জন্য প্রস্তুতি নেওয়াও জরুরি।

জনসংখ্যার পরিবর্তনকে শুধু পরিসংখ্যান হিসাবে না দেখে, ভবিষ্যত নিয়ে নতুন ভাবতে হবে। বাংলাদেশের সামনে এখনও সুযোগ আছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগানোর জন্য সময় অফুরন্ত নয়।