যে দুর্যোগ দেশব্যাপী হলো রবিবার, তা কেটে গেলেও দুর্বিপাকে আটকে গেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার এইচএসসি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ-স্লোগানে কেটে যাওয়ার পর রেশ বুধবার এসেও ঠেকেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার ব্যাখ্যা দিয়েছে, শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাও সোশ্যাল মিডিয়ায় সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। তারপরও পূর্বঘোষণা অনুযায়ী, পরীক্ষা শেষে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে ‘লংমার্চ’ কর্মসূচি পালন করার ঘোষণা এসেছিলো মঙ্গলবার রাতেই।
সবশেষ খবরে জানা যায়, বুধবার দুপুর ১টার পর শিক্ষার্থীরা রাজধানীর উত্তরার বিএনএস সেন্টারের সামনে, সায়েন্সল্যাবে জড়ো হয়েছেন। আন্দোলনকে সমর্থন করে ফেইসবুকেও তৈরি হয়েছে বেশ কয়েকটি গ্রুপ। ‘ব্রয়লার চিকেন পার্টি’ ফেইসবুক পেইজ আত্মপ্রকাশ করে সেখান থেকে বলা হয়েছে, “স্টেপ ডাউন মিলন”। এছাড়াও বুধবার দুপুরে তারা পেইজ থেকে সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগের দাবিতে আমাদের আন্দোলনে কোন রাজনৈতিক দলকে সংশ্লিষ্ট না হওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। আমাদের দাবি আমাদেরকে আদায় করতে দিন। এই আন্দোলনকে কোন রাজনৈতিক ফ্রেমিং করা হোক তা আমরা চাই না।”
দুঃখ প্রকাশ করার পরও কেন পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে সিটি কলেজের শিক্ষার্থী আবদুল আলীম আলাপ-কে বলেন, “পদত্যাগ না করলে কোনো ক্ষমা নেই। তিনি এর আগেও অনেক মন্তব্য করেছেন। ভবিষ্যতেও যে করবেন না সেই নিশ্চয়তা আমাদের কাছে নেই। ”
ক্ষোভের সূত্রপাত
সোশ্যাল মিডিয়ায় শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ও সিটি কলেজের এক পরীক্ষার্থীর মধ্যে কথোপকথন ভাইরাল হয়। যেখানে শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, “আমি এই ভাবে মিটিংয়ে বলেছিলাম- এরা তো ফার্মের মুরগি, এগুলো তো মাথায় বৃষ্টি পড়লেই জ্বর আসে। আমার মেয়ের তাই হয়। একদিন বৃষ্টিতে ভিজবে জ্বর আসবে, তখন পরের তিনদিন তো আর পরীক্ষা দিতে পারবে না এরা।”
ভিডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হলে শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের সমালোচনার মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী। এরপরই প্ল্যাকার্ডসহ রাজপথে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন শিক্ষার্থীরা।
সংসদে দুঃখ প্রকাশের পরও কমছে না ক্ষোভ
জাতীয় সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের অধিবেশনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আমার ব্যক্তিগত মন্তব্য নিয়ে অনেকেই আপত্তি করেছেন। সেই ব্যাপারেও বলতে চাই। আমি কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কিছু বলি নাই। যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন ‘সিম্প্লি’ আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।”
সংসদে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, চট্টগ্রাম বোর্ডের আওতাধীন জেলাগুলোতে বন্যার কারণে পরীক্ষা স্থগিত করতে হয়েছে এবং এই পরীক্ষাগুলো পুনরায় নিতেই হবে। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের দাবি ও অভিযোগ জানালেও মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছিল। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে চট্টগ্রাম বোর্ডের জন্য যখন পদার্থবিজ্ঞান দ্বিতীয়পত্র, যুক্তিবিদ্যা এবং হিসাববিজ্ঞান বিষয়ের পরীক্ষা অন্য আরেকটি প্রশ্নপত্র সেটে নেওয়া হবে, ঠিক সেই সময়েই স্থগিত হওয়া পরীক্ষাগুলো পুনরায় নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
শিক্ষামন্ত্রীর আরও একটি ভিডিও এর আগেও ভাইরাল হয়। যেখানে তিনি পড়াশোনা না করলে আর পাস করা যাবে না। নকল করা যাবে না। এ ধরনের মন্তব্য করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক ব্যবহারকারী শিক্ষামন্ত্রীর আগের বিভিন্ন বক্তব্যও সামনে আনছেন। তাদের দাবি, এসব বক্তব্য শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক ছিল।
শিক্ষার্থীদের যেখানে আপত্তি
পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের প্রশ্নপত্রে ভুল এবং প্রশ্নের মান নিয়েও আপত্তি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
তাদের অভিযোগ, প্রশ্নপত্রের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে ভুল ছিলো, যার কারণে অনেক পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নাম্বার দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান।
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যমে জানান, তাদের আট দফা দাবির মধ্যে প্রধান তিন দাবিগুলো হলো—পরীক্ষা গ্রহণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত করা, পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের ভুল প্রশ্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের নাম্বার প্রদান, শিক্ষামন্ত্রীকে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে ক্ষমা চাওয়া এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা।
তারা আরও দাবি করেন, দেশের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন, ভবিষ্যৎ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়নে যথাযথ পরিকল্পনা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
পদার্থ বিজ্ঞান প্রশ্নপত্রে ভুল কেন
এইচএসসি পরীক্ষায় পদার্থবিজ্ঞান প্রথম পত্রের সৃজনশীল অংশের প্রশ্নপত্রে ‘ভুল’ ছিলো বলে আন্দোলনে অভিযোগ করেছেন পরীক্ষার্থীরা।
মঙ্গলবার সংসদে এই ‘ভুল’ স্বীকারও করে মন্ত্রী বলেন, “আমরা দায়িত্ব পেয়েছি মাত্র চার মাস আগে। প্রশ্নের মডারেশন আগেই সম্পন্ন হয়েছিল। আপনারা জানেন, প্রশ্ন মডারেশনের প্রক্রিয়া দুই বছর আগে থেকে শুরু করতে হয়। আমরা এসে নতুন করে কোনো প্রশ্ন প্রস্তুত করতে পারিনি। বিগত সরকারের সময় যারা মডারেটর ছিলেন, তারাই এই প্রশ্নপত্র প্রস্তুত করেছেন। তবুও আমরা তাৎক্ষণিক ঘোষণা দিয়েছি, পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের দুটি প্রশ্ন (৬ ও ৭) ভুল হয়েছে, সেখানে আমরা পূর্ণ মার্ক দিয়ে দেবো।“
এদিকে প্রশ্নপত্রে গুরুতর ত্রুটি ও অসংগতির ঘটনায় ‘প্রশ্নপত্র পরিশোধনের’ দায়িত্বে থাকা চার শিক্ষককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, সিলেট।
মঙ্গলবার সিলেট শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক বিলকিস ইয়াছমীন স্বাক্ষরিত পৃথক নোটিশে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
নোটিশে বলা হয়, গত ১৩ই জুলাই অনুষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞান (তত্ত্বীয়) প্রথম পত্রের পরীক্ষায় ২০২৬ সালের সিলেবাস অনুযায়ী প্রণীত প্রশ্নপত্রের সৃজনশীল অংশের ৬ ও ৭ নম্বর প্রশ্নে মারাত্মক ত্রুটি ও অসংগতি পরিলক্ষিত হয়েছে। প্রশ্নপত্রে এমন ভুল থাকায় পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা চরম মানসিক চাপের মুখে পড়ে।
নোটিশে আরও বলা হয়, একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক ও প্রশ্নপত্র পরিশোধক হিসেবে এ ধরনের ত্রুটি থেকে যাওয়া চরম দায়িত্বহীনতা এবং পেশাগত কর্তব্যে অবহেলার শামিল। একই সঙ্গে এ ঘটনায় সিলেট শিক্ষা বোর্ডের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়।
প্রশ্নপত্র পরিশোধনে এমন গুরুতর ত্রুটি ও অসংগতির জন্য সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তা নোটিশ পাওয়ার তিন কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।
যাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে তারা হলেন, শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক মো. মুজিবুর রহমান, বৃন্দাবন সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক কাজী জুনায়েদ আল আমিন, এমসি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোছাদ্দেক হোসেন খান এবং সিলেট সরকারি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রভাষক মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন।
আলোচনায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার পোস্ট
মঙ্গলবার যখন রাজপথে আন্দোলনে থমকে গেছে পুরো শহর, একইসঙ্গে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে আন্দোলন, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন শিক্ষামন্ত্রী। সেই বৈঠকের ফলাফল এখনও অজানা। যদিও কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
এদিকে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন।
নিজের পোস্টে তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে অনেক শিক্ষার্থী কষ্ট করে পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, এটি যেমন সত্য; তেমনি বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিয়েছে, এটিও সত্য। কিছু কেন্দ্রে ভোগান্তি হয়েছে, আবার দেশের বড় অংশের শিক্ষার্থী কোনও ধরনের বন্যা, জলাবদ্ধতা বা দুর্ভোগের মুখোমুখি হয়নি।”
বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীদের উদ্বেগ নিয়ে তিনি পোস্টে বলেন, “বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সব দিক বিবেচনা করেছে। বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবকসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভারী বর্ষণের কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও সার্বিক পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে”।
তিনি পোস্টে উল্লেখ করেন সারা দেশে ২ হাজার ৬৯৭টি কেন্দ্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে মুষ্টিমেয় কয়েকটি কেন্দ্রের ছবি ও ভিডিও পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে না।