দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম, প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর উপলক্ষে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশের ভবিষ্যত অংশীদারত্বের জন্য বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়েছে।
মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে ২২এ জুন দেশটিতে সফর করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটি তার প্রথম বিদেশ সফর এবং মালয়েশিয়ায় প্রথম সরকারি সফর। সফরে পুত্রাজায়ার পারদানা পুত্রা কমপ্লেক্সে তাকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা জানানো হয়। পরে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে দুই নেতা বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ককে আরও গভীর করার প্রতিশ্রুতি দেন। দীর্ঘদিন স্থগিত থাকা জয়েন্ট কমিশন বৈঠক এবং দ্বিপক্ষীয় পরামর্শ সভা পুনরায় চালুর বিষয়েও সম্মতি জানানো হয়।
মালয়েশিয়ার আনোয়ার ইব্রাহিম তার দেওয়া বক্তব্যে বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের বন্ধন, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, তার নেতৃত্বে বাংলাদেশে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের নতুন অধ্যায় শুরু হবে বলে তিনি আশা করেন।
মালয়েশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী। বিশেষ করে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ডিজিটাল অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে দুই দেশের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ অংশীদারত্ব গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার এবং মালয়েশিয়া দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে চায়। পাশাপাশি, বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও আশাবাদ প্রকাশ করেন।
বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন লক্ষ্য
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। দুই দেশ বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া এবং ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল গঠনের অগ্রগতিকে স্বাগত জানানো হয়েছে।
টেলিযোগাযোগ, জ্বালানি, অবকাঠামো, বন্দর, লজিস্টিকস, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকনডাক্টর ও স্মার্ট ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে দুই দেশ।
বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা
মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের প্রশংসা করেছে দেশটি। নতুন শ্রমিক নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তাব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে নতুন শ্রমিক কোটার অনুমোদন মালয়েশিয়ার নিয়োগকারীদের চাহিদা ও খাতভিত্তিক প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করবে বলে জানানো হয়। বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপদ ও নিয়মিত অভিবাসন নিশ্চিত করতে যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক আয়োজন এবং নতুন সমঝোতা স্মারক তৈরির বিষয়েও দুই দেশ সম্মত হয়েছে।
এআই, সেমিকন্ডাক্টর ও ডিজিটাল খাতে সহযোগিতা
উদীয়মান প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের সেমিকনডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়নে যৌথ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি এবং বিশেষজ্ঞ বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
শিক্ষা, পর্যটন ও জ্বালানি খাতে সম্প্রসারণ
বর্তমানে মালয়েশিয়ায় প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। দুই দেশ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অংশীদারত্ব, গবেষণা এবং কারিগরি শিক্ষায় সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এদিকে মালয়েশিয়ার ‘ ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিক্যাল ট্যুরিজম ২০২৬’ কর্মসূচির আওতায় পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়ানোর আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে।
জ্বালানি খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। এলএনজি সরবরাহ, পেট্রোলিয়াম পণ্য, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও খনিজ সম্পদ খাতে মালয়েশীয় বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক ইস্যুতে একমত
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, সামরিক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে অংশীদারত্ব বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দুই দেশ।
সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস উগ্রবাদ মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদারের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বাংলাদেশের পাশে থাকার কথা জানিয়েছে মালয়েশিয়া। নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশটি।
এছাড়া বাংলাদেশকে আসিয়ান সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার প্রচেষ্টায় সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য জোটে যোগদানের আকাঙ্ক্ষার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে মালয়েশিয়া।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে ন্যায়সঙ্গত ও স্থায়ী শান্তির পক্ষে অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন এই দুই নেতা। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্য নিরাপত্তা, মানবপাচার ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও দেশটির সরকারকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও আতিথেয়তার জন্য ধন্যবাদ জানান।