বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচাইতে ভয়ঙ্কর শিল্প দুর্ঘটনা ছিল ‘রানা প্লাজা’। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল কর্মব্যস্ত গার্মেন্টস কারখানা ভবন রানা প্লাজা চোখের পলকে ধসে পড়ে ১ হাজার ১২৭ জন শ্রমিক নিহত হন, আহত হন প্রায় ২ হাজার ৫০০ জন। যাদের অধিকাংশই ছিলেন নারী পোশাক শ্রমিক।
সেই বছরেরই ২৫ মে এক সম্পাদকীয়তে ইকোনমিক ও পলিটিক্যাল উইকলি এই ঘটনা সম্পর্কে বলেছে, “এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, এটি ছিল সুস্পষ্ট অবহেলা, দায়িত্বহীনতা এবং মুনাফাকেন্দ্রিক মানসিকতার ফল।”
ইকোনমিক ও পলিকিট্যাল উইকলি তাদের সম্পাদকীয়তে আরও উল্লেখ করেছে, এই দায় শুধুমাত্র স্থানীয় মালিক বা কর্তৃপক্ষের ওপর বর্তায় না। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এর জন্য দায়ী। ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় ব্র্যান্ডগুলো উৎপাদন খরচ কমানোর জন্য সবসময় চাপ তৈরি করে আসছে। এই চাপ সামাল দিতে গিয়েই কারখানাগুলো তাদের শ্রমিকদের মজুরি কমিয়ে দেয়। শ্রমিকদের অধিকারকে উপেক্ষা করে নিরাপত্তা ব্যয়ও কমিয়ে রাখে।
রানা প্লাজার ঘটনার পরই বিশ্বব্যাপী ব্র্যান্ডগুলো নড়েচড়ে বসে। এমনকি বসে ছিল না বাংলাদেশও। সবাই মিলে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণের বিষয়ে উদ্যোগী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংগঠনগুলোর সমর্থনে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে অর্থায়ন করতে বলা হয়।
"পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন ক্রাইসিস হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এটাকে অপরচ্যুনিটি হিসেবে নিয়ে টার্ন অ্যারাউন্ড করে আজকের এখানে এসেছে। রানা প্লাজার ঘটনাটা কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের পুরো সেক্টরের জন্য পজেটিভ ইমপ্যাক্ট হয়েছে," আলাপ-কে বলেছেনবাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি এবং তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী।
"গ্লোবালি বাংলাদেশের আরএমজি সেক্টর এখন একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, বাই হ্যাভিং নট ওনলি দ্য কমপ্লায়েন্ট ফ্যাক্টরি বাট অলসো দ্যা লিড সার্টিফাইড ফ্যাক্টরি। বাংলাদেশ ইজ দ্য ওনলি কান্ট্রি গ্লোবালি যে প্রাউডলি বলতে পারে তার যেসব ফ্যাক্টরি এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড তার একটিও কমপ্লায়েন্সের বাইরে নয়। এটা আর কোনো দেশ ক্লেইম করতে পারবে না। আজকে হাইয়েস্ট নাম্বার অব গ্রিন সার্টিফাইড ফ্যাক্টরি কিন্তু এখন বাংলাদেশে। যা ২৬৮’র ওপরে। এর বাইরে যারা আছে তাদের সবগুলোই কমপ্লায়েন্ট এবং আন্তর্জাতিক মান সম্পন্ন।"
বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন ট্রাজেডি আর ঘটেনি মন্তব্য করে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো অধ্যাপক ড. মুস্তাফিজুর রহমান আলাপ-কে বলেছেন, "এতগুলো মানুষ মারা গেলো, এতগুলো মানুষ আহত হলো...তবে তারপর যেটা হয়েছে সেটা দৃষ্টান্ত। অনেক পজেটিভ পরিবর্তন এসেছে। আর বাংলাদেশ এটা সাকসেফুলি অ্যাড্রেস করেছে।"
রানা প্লাজা বিশ্ববাসীর সামনের একটি কঠিন শিক্ষা হাজির করে। যে শিক্ষাটি ছিল, মানব জীবনের মূল্য কখনোই মুনাফার চেয়ে কম হতে পারে না। যার প্রেক্ষিতে নেওয়া হয় নানান উদ্যোগ।
শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় আসে বৈশ্বিক উদ্যোগ
রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর গড়ে ওঠে ‘অ্যাকোর্ড অন ফায়ার অ্যান্ড বিল্ডিং সেইফটি ইন বাংলাদেশ।’ যাকে পোশাক শিল্প খাতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি যুগান্তকারী চুক্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। রানা প্লাজা ঘটনার আগে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পোশাক শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করতো ইন্টারন্যাশনাল টেক্সটাইল, গার্মেন্ট অ্যান্ড লেদার ওয়ার্কার্স ফেডারেশন (আইটিজিএলডাব্লিউএফ)। এই সংগঠনটি ২০১২ সালে অন্যান্য শিল্পখাতের ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে একীভূত হয়ে ইন্ডাস্ট্রিঅল গ্লোবাল ইউনিয়ন গঠন করে। শুরুতে অনেকের আশঙ্কা ছিল, বৃহৎ এই সংগঠনে পোশাক খাতের শ্রমিকদের সমস্যা হয়তো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলবে। বাস্তবতা হলো, রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সেই আশঙ্কা ভুল প্রমাণ হয়।
ইন্ডাস্ট্রিঅল, ইউএনআই গ্লোবাল ইউনিয়ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব শ্রমিক সংগঠনসহ আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও সরবরাহকারীদের এক টেবিলে নিয়ে আসে। এই আলোচনার মাধ্যমেই তৈরি হয় অ্যাকর্ড। যা এখন শক্তিশালী ও আইনি চুক্তি হিসেবে পরিচিত।
অ্যাকোর্ড প্রতিষ্ঠানগুলোকে একটি আইনি বাধ্যবাধকতার মধ্যে নিয়ে আসে। আগে যেখানে যে যার মতো নীতিমালা মেনে চলতো, সেখানে এই চুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। চুক্তি অনুযায়ী, স্বাক্ষরকারী প্রতিটি ব্র্যান্ডকে কারখানার নিরাপত্তা বিষয়ক উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর সর্বোচ্চ ৫ লাখ মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয় করতে হবে।
শুরুতে চ্যালেঞ্জ ছিল। অ্যাকর্ড বাস্তবায়নে খুব কম প্রতিষ্ঠানই চুক্তিতে যুক্ত হয়েছিল। কিন্তু রানা প্লাজার ঘটনা বদলে দেয় সব কিছু। এখন প্রায় ১৮০টি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড এই চুক্তিতে সই করেছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশে হাজার হাজার কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে, অসংখ্য অগ্নি ও ভবনজনিত ঝুঁকি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং বিপজ্জনক কারখানাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই পদক্ষেপগুলো না থাকলে আরও একটি রানা প্লাজার মতো দুর্ঘটনা ঘটতে পারতো।
সে সময় যে সব সুপারিশ করা হয়েছিল সেগুলো ব্যবসায়ীরা কীভাবে নিয়েছিলেন, জানতে চাইলে বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী আলাপ-কে বলেন, "এটা ব্যবসায়ীরাও ভালো ভাবে নিয়েছিল। তারা ডানে বামে না তাকিয়ে, পয়সার দিকে না তাকিয়ে, দে ওয়েন্ট ফর দ্য ইনভেস্টমেন্ট। যদিও তারা সেটা উঠিয়ে আনতে পারছে না, তারপরও বাংলাদেশে সব ফ্যাক্টরি কিন্তু কমপ্লায়েন্ট হয়েছে। রানা প্লাজার ঘটনার পর, শুধু যে গার্মেন্টসগুলো কমপ্লায়েন্ট হয়েছে তাই নয়, সে সব বিষয়গুলো মানা হচ্ছে কিনা তা মনিটরিংও করা হচ্ছে। মালিকরদের ক্ষেত্রে অনেক কষ্ট হলেও আমরা কিন্তু এগুলো মেইনটেইন করছি।"
রানা প্লাজার ঘটনার পরপর বিদেশি ক্রেতাদের প্রধান দুইটি জোট বড় ধরনের ভূমিকা রাখে, বলে মনে করেন সিপিডি ফেলো ড. মুস্তাফিজুর।
“এরপরই আমাদের দেশে অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স হলো। স্ট্রাকচারাল সেফটি, ফায়ার সেফটি, ইলেট্রিকাল সেফটি এই তিনটি নিয়েই তো তারা কাজ করেছিল। তাদের সুপারিশে বেশ বড় ধরনের পরিবর্তন এই সেক্টরে এসেছে। আগে আমরা দেখতাম, একটা রেসিডেন্সিয়াল বিল্ডিয়ে ইচ্ছে হলেই একটা ফ্যাক্টরি করে ফেলা হতো; এটা এখন নেই," আলাপ-কে বলেন তিনি।
রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় গার্মেন্টস সেক্টরের কাজ দেওয়া ও পাওয়ার সামগ্রিক চিত্রটাই পালটে গেছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ। “এই ঘটনার পর আমাদের উৎপাদকরাও অনেক কনশাস হয়েছে। বায়ারদের ডিমান্ডও জিরো টলারেন্স হয়েছে। সুতরাং আগে যে প্যাটার্নে হতো, যেমন সাব কনট্রাক্টিং, যেখানে আমি জানি না ও কীভাবে করতেছে, এগুলো এখন আর নাই। এখন বায়াররা একচুয়াল প্রডিউসারদের সাথেই ডিল করে। এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশই নয়, গোটা বিশ্বের গার্মেন্টস সেক্টরের ওপরেই পজেটিভ প্রভাব ফেলেছে।"
অ্যাকোর্ড মডেল আন্তর্জাতিকভাবে বেশি কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানেও অনুসরণ করা হয় এই মডেল। তবে বাস্তবে নিরাপত্তা উন্নয়নের খরচ বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশের কারখানাগুলোকে নিরাপত্তা মান উন্নত করতে বলা হলেও শুরুতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক সহায়তা ছিল না। ফলে অধিকাংশ কারখানাকে ঋণ নিয়ে এই সংস্কার কাজ সম্পন্ন করতে হয়।
এই প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে অ্যাকর্ড একটি 'ফ্যাক্টরি রিমিডিয়েশন ফান্ড' গঠন করে, যার মাধ্যমে কিছু আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু হয়। পরে ২০১৯ সালে এই উদ্যোগটি রূপান্তরিত হয়ে আরএমজি সাস্টেইনিবিলিটি কাউন্সিলে (আরএসসি) পরিণত হয়, যা বাংলাদেশের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি সংস্থা।
আরএসসি আগের অ্যাকর্ডের কাঠামো ও কার্যক্রম গ্রহণ করলেও এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে—স্থানীয় উৎপাদকদের সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে এর ফলে শ্রমিক ও তাদের প্রতিনিধিদের প্রভাব কিছুটা কমে যায়।
বর্তমানে একটি নতুন আন্তর্জাতিক চুক্তি, ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকোর্ড গঠিত হয়েছে, যেখানে শ্রমিক সংগঠন, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতারা যুক্ত হয়েছে। এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এতে অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি প্রতিকার নিশ্চিত করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, যা আগের অনেক স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগে অনুপস্থিত ছিল।
বাংলাদেশ শ্রম আইন পরিবর্তনে তৈরি হয় চাপ: ২০২৬ সালে পরিবর্তন
রানা প্লাজার দুর্ঘটনা বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬-এর দুর্বলতাগুলোকে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে, কর্মস্থলে মৃত্যু বা আঘাতপ্রাপ্ত শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করে না। এ বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয় ব্যাপক সমালোচনা।
আইন অনুযায়ী কর্মস্থলে মৃত্যু বা স্থায়ী অক্ষমতার জন্য ক্ষতিপূরণের বিধান থাকলেও সেটি খুবই নগন্য। আইনে বলা আছে, কমপক্ষে দুই বছর কাজ করার পর শ্রমিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় মৃত্যুর ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকা এবং স্থায়ী অক্ষমতার ক্ষেত্রে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। পরে ২০১৮ সালের সংশোধনীতে ক্ষতিপূরণের অংশ কিছু বাড়িয়ে যথাক্রমে ২ লাখ এবং ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা করা হয়।
আইনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, পাঁচ হাজার বা তার বেশি শ্রমিক রয়েছে এমন কারখানায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। একইসঙ্গে কোনো শ্রমিক রোগে আক্রান্ত হলে তার চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় মালিককে বহন করতে হবে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্টের (ব্লাস্ট) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শ্রম আদালতে পরিচালিত ৮০টি মামলার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বর্তমান ব্যবস্থাটি অনেকাংশে মালিকদের সদিচ্ছার উপর নির্ভর করে। তাদের সক্ষমতার উপর নয়।
তাছাড়া, বিশেষায়িত শ্রম আদালতের ঘাটতির কারণে বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, যা শ্রমিকদের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে যায়।
সর্বশেষ অন্তর্বর্তী সরকার শ্রম আইন অধ্যাদেশ জারি করে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার অধ্যাদেশটি বিল হিসেবে সংসদে পাস করে। শ্রম আইন ২০০৬ এখন বাংলাদেশ শ্রম আইন (সংশোধন) ২০২৬ হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমান সংশোধিত ৪২ নং আইনের ধারায় ১৫১ক নতুন করে যুক্ত হয়েছে। যেখানে কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিলের কথা বলা হয়েছে। এই ধারায় উল্লেখ করা হয়, এই আইনের অন্যান্য বিধানে যাই থাকুক না কেন, সরকার বিধি দ্বারা উপযুক্ত বিবেচিত কোনো কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত ক্ষতিপূরণ তহবিল প্রতিষ্ঠা করবে।
এছাড়াও সংশোধিত আইনে ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। এখন মাত্র ২০ জন শ্রমিকের সম্মতিতে ইউনিয়ন গঠন করা যাবে। ফলে শ্রমিকদের সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং ঐক্যবদ্ধভাবে নিজেদের অধিকার আদায়ের সুযোগ বাড়াবে। তবে প্রতিষ্ঠানের আকার অনুযায়ী সদস্যসংখ্যার সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। সুশৃঙ্খল পরিস্থিতি বজায় রাখার জন্য একটি প্রতিষ্ঠানে সর্বোচ্চ তিনটি ইউনিয়নের অনুমতির কথা আইনে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, শ্রমিকদের সুবিধা ও সুরক্ষা বাড়ানো হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২ দিন থেকে বাড়িয়ে ১২০ দিন করা হয়েছে। বার্ষিক উৎসব ছুটি ১১ দিন থেকে ১৩ দিন করা হয়েছে। এছাড়া ১০০ বা তার বেশি শ্রমিক রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানে প্রভিডেন্ট ফান্ড বা জাতীয় পেনশন স্কিম চালুর বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, কর্মস্থলে বৈষম্য ও হয়রানি প্রতিরোধে নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমবারের মতো 'যৌন হয়রানি' স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য কমিটি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থত, অন্যায্য শ্রমচর্চা রোধে কঠোর ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে আইনে। মালিকদের জন্য শ্রমিকদের ব্ল্যাকলিস্ট করা, ইউনিয়ন কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা বা অভিযোগ করার কারণে প্রতিশোধ নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নতুন বিধান অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে এসব কার্যক্রম বন্ধ করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দিতে পারবে। এই সংশোধনী আইনের মাধ্যমে গৃহকর্মী, কৃষি শ্রমিক এবং নাবিকদের মতো আগে উপেক্ষিত খাতগুলোকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। শ্রম বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য বিকল্প পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং একটি জাতীয় সামাজিক সংলাপ ফোরাম গঠনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
এই আইনটি আন্তর্জাতিক লেবার অরগানাইজেশন (আইএলও) -এর মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে।
শুরু হয়েছে বীমার পাইলট প্রকল্প
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় উঠে এসেছে, শ্রম ও আইন বিশেষজ্ঞ, অধিকারকর্মীরা কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রস্তাব। তারা বলছেন, বর্তমান নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের পরিমাণকে সর্বোচ্চ সীমা হিসেবে নয়, বরং সর্বনিম্ন সীমা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। পাশাপাশি, শ্রম আদালতকে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে টর্ট আইনের মৌলিক নীতিগুলো অনুসরণ করতে হবে—যেমন শ্রমিকের বয়স, সম্ভাব্য আয়, নির্ভরশীল সদস্যের সংখ্যা ইত্যাদি বিবেচনায় নেওয়া।
বিআইজিডি’র সেই গবেষণায় উঠে আসে ২০২২ সালে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে একটি পাইলট এমপ্লয়মেন্ট ইন্স্যুরেন্স স্কিম (ইআইএস) চালুর প্রসঙ্গ।
যার লক্ষ্য ছিল কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ও আঘাতের প্রকৃতি ও পরিমাণ নির্ধারণ করা এবং এসব ঘটনার চিকিৎসা ব্যয় মোকাবিলায় একটি কার্যকর আর্থিক কাঠামো তৈরি করা। এটি মূলত একটি ঝুঁকি-ভাগাভাগির ব্যবস্থা, যেখানে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও অর্থায়নে যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
এই উদ্যোগটি একটি পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্ব মডেলের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে ইন্টারন্যাশনাল লেবার অরগানাইজেশন (আইএলও)। তারা প্রকল্পটিতে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি এটি অর্থায়ন করছে নেদারল্যান্ডস সরকারের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সহযোগিতা মন্ত্রণালয় এবং বাস্তবায়ন করছে জার্মান উন্নয়ন সংস্থা, জিআইজেড।
এই প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে বিদ্যমান কেন্দ্রীয় তহবিল শক্তিশালী করা। ইআইএস-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডগুলোকে উৎসাহিত করা হচ্ছে যেন তারা এই তহবিলে অতিরিক্ত অর্থ দেয়। যা পরবর্তীতে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করবে।
ন্যায্য মজুরি আদায়ের চেষ্টা
ইথিক্যাল ট্রেড ইনিশিয়েটিভ-এ প্রকাশিত একটি লেখায় বলা হয়, শ্রমিকদের স্বাভাবিক এবং সচ্ছল জীবনযাপনের জন্য ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা হলো মৌলিক মানবাধিকার। রানা প্লাজার দুর্ঘটনা এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। যদি ওই সময় শ্রমিকরা জীবনযাপনযোগ্য মজুরি পেতেন, তাহলে হয়তো তারা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে কাজ করতে চাইতেন না। হয়তো দুর্ঘটনাটি আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো। একইভাবে, দুর্ঘটনার পর ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের আর্থিক ধাক্কাও তুলনামূলক কম হতো। পর্যাপ্ত মজুরি না থাকলে শ্রমিকরা বাধ্য হয়েছিলেন দীর্ঘ সময় ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে। ফলে তারা ঋণের ঝুঁকিতে পড়ে যান।
বাংলাদেশে রানা প্লাজার আগে ন্যূনতম মজুরি ছিল মাত্র তিন হাজার টাকা। যা কয়েক দফায় বাড়িয়ে ২০১৮ সালে আট হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। যদিও ইন্ডাস্ট্রিঅল বাংলাদেশ কাউন্সিল (আইবিসি) মজুরি ২৩ হাজার টাকা করার দাবি জানিয়ে আসছে।
সিপিডি ফেলো ড. মুস্তাফিজুর বলছেন, অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স যে তিনটি বিষয় দেখেছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলেও আরও কিছু রয়েছে।
"ইউএস যখন জিএসপি উঠিয়ে নেয়, তখন কিন্তু ১৬টা পয়েন্ট ছিল। এছাড়া শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন রাইটস, শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, মজুরির মতো বিষয়গুলো কিন্তু এখনো রয়ে গেছে।
“আন্তর্জাতিক ভাবে এটা একটা বড় ধরনের ডিজাস্টার হতে পারতো। কারণ এখানে তো কেবল বায়ারই ছিল না, কনজিউমাররাও কিন্তু বলছিল যে, তারা এমন দেশের কাপড় পরবে না যেসব দেশে এমন হয়। এই সমস্যা বাংলাদেশ কাটিয়ে উঠেছে। প্রাথমিক একটা ক্ষতি তো অবশ্যই হয়েছে তবে এটা কাটানোর জন্য বাংলাদেশ যে পদক্ষেপ নিয়েছে, এখানে সরকারও সাপোর্ট দিয়েছে, মালিকরাও এগিয়ে এসেছিল। এতে বাংলাদেশের ইমেজটা রিস্টোর হয়েছে," আলাপ-কে বলেন তিনি।