নান রুটিতে গল্প, ফেইসবুক থেকে সুলিভান ব্রাদার্সের ফুটবলকাহন

ধোঁয়া ওঠা নানের টুকরো ছিঁড়ে গরুর ঝোলের ভেতরে ডুবিয়ে মুখে তুলছেন এক তরুণ। পাশে খাসির মাংস, টেবিলে ছড়ানো মশলার ঘ্রাণ, আর কথার ফাঁকে ফাঁকে উঠে আসছে নাড়ির টানের গল্প, এক দূরের দেশের। ফিলাডেলফিয়ার এক ছোট্ট রেস্টুরেন্ট লবঙ্গ কাবাব অ্যান্ড ক্যাফে সেখানে বসে খাবারের স্বাদ নিতে নিতে নিজের শিকড়ের গল্প বলছিলেন কুইন সুলিভান। ভিডিওটি ছিল একেবারেই সাধারণ, একজন ফুটবলারের ফুড টেস্টিং। কিন্তু সেই ভিডিওর ভেতরেই লুকিয়ে ছিল বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এক নতুন দরজা খোলার গল্প।

কুইন বলছিলেন তার নানীর কথা। ঢাকার মেয়ে সুলতানা আলম, যিনি উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় পিএইচডি করেছেন। পরে জাতিসংঘেও কাজ করেছেন। কথাগুলো তখন হয়তো ছিল নিছক পারিবারিক স্মৃতিচারণ।

কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক কোণে বসে থাকা কিছু ক্রীড়া অনুরাগী সেই কথাগুলোকে গুরুত্ব দিলেন। তারা খুঁজতে শুরু করলেন। আর সেই খোঁজ একসময় পৌঁছে গেল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের দরজায়।

খাবারের টেবিল থেকে শুরু হওয়া এই গল্পের দুই বছর পরের দৃশ্য একেবারেই ভিন্ন। মালদ্বীপের মালে শহরের জাতীয় স্টেডিয়াম। গ্যালারির বড় অংশ জুড়ে লাল সবুজের ঢেউ। প্রবাসী বাংলাদেশিরা যেন ছোট্ট এক বাংলাদেশ বানিয়ে ফেলেছেন সেখানে। মাঠে অনুর্ধ্ব ২০ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনাল। প্রতিপক্ষ ভারত। ৯০ মিনিটে গোলশূন্য সমতা। খেলা গড়াল টাইব্রেকারে।

সেই মুহূর্তে ১২ নম্বর জার্সি পরে এগিয়ে এলেন আরেক সুলিভান, রোনান। মাত্র দুই মাস আগেও যিনি নিশ্চিত ছিলেন না, আদৌ বাংলাদেশের হয়ে খেলতে পারবেন কি না। অথচ সেই তিনিই দাঁড়িয়ে আছেন ইতিহাসের এক শট নেওয়ার সামনে।

যুক্তরাষ্ট্রের যুব দলের হয়ে খেলছেন কুইন সুলিভান

দৌড়, থামা, আর তারপর এক আলতো ছোঁয়া।

বলটি জালে জড়িয়ে যেতেই বিস্ফোরিত হলো গ্যালারি। ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ। আর রোনানের সেই শট, এটা নিছক পেনাল্টি ছিল না। ফুটবলের ভাষায় এটি পানেনকা

এই দৃশ্যের সঙ্গে যুক্ত ছিল আরেকটি ফ্রেম। হাজার মাইল দূরে, যুক্তরাষ্ট্রে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের ড্রেসিং রুমে বসে খেলা দেখছিলেন কুইন সুলিভান। ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি চিৎকার করে বলছেন, “চিপ ইট।” যেন ভাইয়ের সঙ্গে এক অদৃশ্য সংযোগ। আর রোনান ঠিক সেটাই করলেন।

একটি বাংলাদেশি দলের জয়ের উল্লাস তখন শুধু মালে নয়, পৌঁছে গিয়েছিল আমেরিকার একটি শীর্ষ ফুটবল ক্লাবের ভেতরেও।

রোনানের অবদান শুধু ওই এক শটেই সীমাবদ্ধ ছিল না। টুর্নামেন্টজুড়ে দুটি গোল এবং একটি অ্যাসিস্ট করে তিনি দলকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একইভাবে গোলকিপার ইসমাইল হোসেইন মাহিনও ছিলেন নীরব নায়ক। টাইব্রেকারে ভারতের প্রথম শট ঠেকিয়ে তিনি বাংলাদেশের জন্য দরজা খুলে দেন।

কিন্তু এই পুরো গল্পের ভেতরে সবচেয়ে বড় বিষয়টি হয়তো অন্য জায়গায়। এটি শুধু একটি শিরোপা জয়ের গল্প নয়। এটি প্রবাস, পরিচয় এবং সম্ভাবনার গল্প।

সুলিভান পরিবারে ফুটবল যেন রক্তের ভেতরেই বইছে। বাবা ব্রেন্ডান সুলিভান অস্ট্রেলিয়ার এ লিগে পেশাদার ফুটবলার ছিলেন। মা হেইকে খেলেছেন ডিভিশন ওয়ান পর্যায়ে। তাদের চার ছেলে, কুইন, ক্যাভান, ডেকলান ও রোনান, সবার জীবনেই ফুটবল কেন্দ্রে।

কুইন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যুব দলে খেলেছেন, মেজর লিগ সকারে ফিলাডেলফিয়া ইউনিয়নের হয়ে নিয়মিত মাঠে নামছেন।

মেজর সকার লিগে লিওনেল মেসির বিপক্ষে কুইন সুলিভান

একই লিগে খেলছেন লিওনেল মেসি। ছোট ভাই ক্যাভানও যুক্তরাষ্ট্রের যুব দলে জায়গা করে নিয়েছেন। অনেকেই বলেন, চার ভাইয়ের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে প্রতিভাবান।

অন্যদিকে যমজ ভাই ডেকলান ও রোনান বেছে নিয়েছেন বাংলাদেশের পথ। তারা এখন যুক্তরাষ্ট্রে ওয়াইএসসি একাডেমিতে পড়াশোনা করছেন এবং এমএলএস নেক্সটের সহযোগী ক্লাব এফসি ডেলকোর হয়ে খেলছেন।

এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংযোগের শক্তি। একটি সাধারণ ফুড ভিডিও, একটি পারিবারিক গল্প, কিছু অনুসন্ধান, এই ছোট ছোট ঘটনাই শেষ পর্যন্ত তৈরি করেছে একটি বড় সুযোগ।

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন এই প্রতিভাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পেরেছে, তাদের জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছে, এসব সম্ভব হয়েছে সেইভ বাংলাদেশ ফুটবল নামে ফুটবল পেইজের প্রচেষ্টায়।

এই প্ল্যাটফর্ম থেকেই সুলিভান ভাইদের নানী সুলতানা আলমের সাথে যোগাযোগ করা হয়। তারপর শুরু হয় এই গল্প।

বাংলাদেশের ফুটবলের জন্য এর গুরুত্ব অনেক বড়। দীর্ঘদিন ধরে প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়নি। সেখানে প্রবাসী শিকড়ের এমন ফুটবলাররা নতুন সম্ভাবনার জানালা খুলে দিচ্ছেন। তারা শুধু দক্ষতা নয়, নিয়ে আসছেন ভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ, পেশাদার সংস্কৃতি এবং আত্মবিশ্বাস।

রোনানের পানেনকা শট তাই কেবল একটি গোল নয়। এটি একটি বার্তা। বাংলাদেশের জার্সি শুধু দেশের ভেতরে জন্ম নেওয়া খেলোয়াড়দের নয়, পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা শিকড়ের সঙ্গেও যুক্ত।

আর সেই গল্পের শুরুটা?

এক প্লেট নান আর গরুর ঝোলের পাশে বসে বলা কয়েকটি কথায়, যেখানে জড়িয়ে গেছে একটা ফেইসবুক পেইজের প্রচেষ্টা।