“কেউ আমাদের সাথে একটু যোগাযোগ করতে পারেন প্লিজ।“ – সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ এমন আর্তি ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার জনি বেয়ারস্টোর। তিনি এখন কোচ ইংল্যান্ড লায়ন্সের। বয়সভিত্তিক যে দলটা দুবাইয়ে টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে সিরিজ খেলছে পাকিস্তান শাহিনসের সাথে।
রবিবার আবুধাবিতে ছিল সিরিজের ২য় ওয়ানডে। কিন্তু তার আগেই শুক্রবার দিবাগত রাত থেকে ইরানে অতর্কিত হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর ইরান ইসরায়েল এবং প্রতিবেশি দেশগুলোতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করলে এর প্রভাব পড়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। একের পর এক দেশের আকাশসীমা বন্ধ করার ঘোষণা আসে। বাতিল হতে থাকে ফ্লাইট।
অবধারিতভাবে এর প্রভাব পড়ে সারা বিশ্বের ক্রীড়াঙ্গনেই। ক্রিকেট, ফুটবলসহ অনেক খেলাই স্থগিত হয়ে গিয়েছে। ফ্লাইট জটিলতায় বিভিন্ন দেশে আটকে পড়ে ক্রীড়াবিদরা। যার মধ্যে ছিলেন বাংলাদেশের মুশফিকুর রহিমও। সৌদি আরবে উমরাহ শেষে তার ফ্লাইট দুদিন পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পৌঁছেছেন তিনি।
ইরানের সাথে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টাপাল্টি মিসাইল হামলার মধ্যে অনিশ্চয়তায় পুরো মধ্যপ্রাচ্য। এ মাসেই কাতারে অনুষ্ঠিতব্য বহু কাঙ্ক্ষিত আর্জেন্টিনা-স্পেনের ফিনালিসিমা শেষ পর্যন্ত হবে তো? আবার যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে কি শেষ পর্যন্ত যাবে ইরান? এমন নানা প্রশ্ন উঠছে এখন।
দুবাইয়ে ইংল্যান্ড ও ইসিবির স্টেটমেন্ট
সংযুক্ত আর আমিরাতে ইংল্যান্ড লায়ন্স ও পাকিস্তান শাহিনসের মধ্যে চলমান সিরিজ স্থগিত হয়ে গিয়েছে এরইমধ্যে। খেলা নেই, অনুশীলনও নেই এবং দলটির প্রতি নির্দেশনা ইনডোর অবস্থানের। ফলে একরকম হোটেলেই এখন আটকে পড়েছেন বেয়ারস্টো-ফ্লিনটফসহ মোট ২৫ সদস্যের ইংলিশ দল। তারা কখন ফিরতে পারবেন জানেন না সেটাও।
আর সেকারণেই সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ এমিরেটস এয়ারলাইন্সকে ট্যাগ করে বেয়ারস্টো লিখেন, “ফ্লাইট বাতিল হওয়ার ব্যাপারে এমিরেটসের সাথে কোন যোগাযোগই করতে পারছি না।” অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দেশে ফিরতে সবার কাছে সাহায্য চান তিনি।
ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ড – ইসিবি এক বিবৃতিতে জানায়, “আমাদের দল ও স্টাফদের নিরাপত্তা আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আমরা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ঘটনাপ্রবাহে নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখছি ও তাদের পরামর্শ অনুসরণ করছি।”
এরইমধ্যে দুবাইতে হতে যাওয়া ইংল্যান্ড নারী ক্রিকেট দলের অনুশীলন ক্যাম্পও স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে ইসিবি। অন্যদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি পাকিস্তান শাহিনসের সাথেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড-পিসিবি।
ধাক্কা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপেও?
না, ভারত ও শ্রীলঙ্কায় চলমান টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে মাঠের খেলায় সরাসরি যুদ্ধের কোন ধাক্কা এখনো আসেনি। তবে বিপাকে পড়েছে জিম্বাবুয়ে ক্রিকেট দল। তাদের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ ছিল রবিবার। সোমবার তাদের এমিরেটসের বিমানে দিল্লি থেকে দুবাই হয়ে হারারে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা এখন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত। তাই ভারতেই আরও কতদিন থাকতে হবে জানেন না সিকান্দার রাজারা।
এই বিশ্বকাপের লঙ্কাপর্ব শেষ। শনিবার ওখান থেকে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলে শ্রীলঙ্কান এয়ারলাইন্সে করে সরাসরি দেশে ফেরত গিয়েছে পাকিস্তান দল। দুই সেমিফাইনাল ও ফাইনাল ম্যাচ দিয়ে ভারতে বিশ্বকাপ শেষ হবে ৮ই মার্চ। তবে যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয় তবে জিম্বাবুয়ের মতো সমস্যায় পড়তে পারে ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড বা দক্ষিণ আফ্রিকাও।
এরইমধ্যে এ বিষয়ে এক বিবৃতি দিয়েছে আইসিসি। ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা বলছে, তারা “পরিবর্তিত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বিশ্বকাপের সব স্টেকহোল্ডারদের নিরাপদ যাত্রা নিয়ে কাজ করছে।”
বিশ্বকাপের অসংখ্য খেলোয়াড়, কর্মকর্তা, ব্রডকাস্টার অনেকেরই চলাচল করতে হবে মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দর বিশেষ করে দুবাই ও কাতার হয়ে। তাই আয়োজকদের এখন ভিন্ন রুটে ফ্লাইটের বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে।
কাতারে ফিনালিসিমায় অনিশ্চয়তা
ইউরোপ চ্যাম্পিয়নের সাথে কোপা আমেরিকার চ্যাম্পিয়নের লড়াই। চার বছর পরপর দুই মহাদেশের চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে প্রীতি ম্যাচের নাম - ফিনালিসিমা। এবারের ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন বনাম কনমেবল চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ম্যাচটির তারিখ ২৭শে মার্চ, ভেন্যু কাতারের দোহায় অবস্থিত লুসাইল স্টেডিয়াম।
কিন্তু এরইমধ্যে ইরান-ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনায় সমস্ত রকম খেলা ও টুর্নামেন্ট স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে কাতার ফুটবল ফেডারেশন। কারণ এই যুদ্ধে ইরানের দিক থেকে একটা টার্গেট কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি। জরুরি অবস্থায় নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ রেখেছে কাতার। আর টুর্নামেন্টের বিষয়ে কাতার ফুটবল ফেডারেশন বিবৃতিতে জানায়, “প্রতিযোগিতা শুরুর নতুন তারিখ সময়মতো জানানো হবে।”
এদিকে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন – এএফসির সব খেলাও স্থগিত করা হয়েছে। অনিশ্চিত এখন এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর দল আল নাসরের কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচও।
ফিনালিসিমার ব্যাপারে এখনো আনুষ্ঠনিকভাবে কিছু জানা যাচ্ছে না। তবে স্প্যানিশ গণমাধ্যমগুলো বলছে কাতারে সময়মতো এই ম্যাচ হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী রয়্যাল স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন।
ইরানের কী অবস্থা?
ইরান নারী ফুটবল দল এই মুহূর্তে অস্ট্রেলিয়ায় অংশ নিচ্ছে এএফসি এশিয়া কাপে। এরইমধ্যে দেশের উপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার খবর তারা শুনেছেন। এশিয়ান ফুটবলের অভিভাবক এএফসি এক বিবৃতিতে বলেছে, “আমরা গোল্ডকোস্টে ইরান নারী দলের ফুটবলার ও কর্মকর্তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছি এবং আমরা তাদের সবরকম সাহায্য ও সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।“
আসরে নিজেদের উদ্বোধনী ম্যাচে মাঠে নামার আগে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরান কোচ মারজিয়ে জাফারি বলেন, এই টুর্নামেন্ট ইরানি মেয়েদের জন্য একটা সুযোগ নিজেদের প্রমাণ করার।
এরইমধ্যে ইরানিয়ান ফুটবল ফেডারেশন তাদের ঘরোয়া সমস্ত ফুটবল স্থগিত করেছে। এবং সেখানে খেলা সব বিদেশি ফুটবলাররাও এখন আটকা পড়ে আছেন।
ইরান কি যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে?
বিশ্বকাপের বাকি ১০০ দিনের মতো। আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের পর্দা উঠছে ১১ই জুন। এশিয়া থেকে টানা চতুর্থবার কোয়ালিফাই করা ইরানের বিশ্বকাপ শুরু ১৫ই জুন। গ্রুপপর্বে নিউজিল্যান্ড ও বেলজিয়ামের সঙ্গে তারা খেলবে লস অ্যাঞ্জেলসে, আর ২৬এ জুন গ্রুপের শেষ ম্যাচ মিশরের সাথে সিয়াটলে। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে খোদ ইরানি ফুটবলের শীর্ষ কর্তাই এখন বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে শঙ্কা দেখছেন।
“যুক্তরাষ্ট্র চালিত এই আক্রমণের পর আমরা আসলে খুব আশা নিয়ে বিশ্বকাপের দিকে তাকাতে পারছি না”- ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে এই মন্তব্য করেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট মেহেদি তাজ।
এমনিতেও ইরানিদের আমেরিকা প্রবেশে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ফুটবল দল এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে। তারপরও গত ডিসেম্বরে ওয়াশিংটনে ড্র অনুষ্ঠানে আসার জন্য ইরানের বেশ কয়েকজন ফুটবল কর্মকর্তাকে ভিসা দেয়নি যুক্তরাষ্ট্র।
এরআগে গতবছর যখন ইরানে হামলা করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র, তখনও ইরানের বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা উঠেছিল।
বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও। শনিবার ফিফার বোর্ড মিটিংয়ে জেনারেল সেক্রেটারি মাতিয়াস গ্রাফস্টোর্ম বলেন, “আমাদের লক্ষ্য সবাইকে নিয়ে একটা নিরাপদ বিশ্বকাপের।”
গত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তখন ইরানে ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছিল। এরপর ওয়েলসের সঙ্গে ম্যাচে সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। আর এবার ইরানের প্রথম দুই ম্যাচের ভেন্যু যে লস অ্যাঞ্জেলস সেখানে দেশের বাইরে সর্ববৃহৎ ইরানি কম্যুনিটির বাস। যদি কোন কারণে ইরান এই বিশ্বকাপ বয়কট করে তাহলে বোধহয় হাঁফ ছেড়েই বাচবে ফিফা। তাহলে যে অন্তত বড় কোন সমাবেশ বা বিক্ষোভের মুখে পড়তে হবে না।
এরইমধ্যে ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসের বিশ্বকাপ টাস্কফোর্সের প্রধান অ্যান্ড্রু জিউলিয়ানি ইরানের যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলা সমর্থন করে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন। এখন ইরান যদি সত্যিই বিশ্বকাপ বয়কট করে তাহলে এফসি থেকেই বিকল্প দল নিয়ে বিশ্বকাপ চালিয়ে যাবার চেষ্টা করবে ফিফা। তবে ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি বলছেন তারা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ বয়কট করবে কি-না সেই সিদ্ধান্ত নেবেন শুধুমাত্র দেশটির ক্রীড়াপ্রধান। তবে খুব শিগগিরই এই সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে হয় না। আগামী কয়েকদিন যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি হয়তো ঠিক করে দেবে যুক্তরাষ্ট বিশ্বকাপে ইরানের অংশগ্রহণ।