ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে ৭৩ গোল করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬১টি, ইংল্যান্ডের হয়ে ১২টি। বায়ার্ন জিতেছে বুন্দেসলিগা ও ডিএফবি-পোকাল। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড শেষ করেছে তৃতীয় হয়ে। ব্যক্তিগত সংখ্যায় কেইনের সামনে যে কাউকে দাঁড় করানো তাই কঠিন।
তবে মাথায় রাখা দরকার, ব্যালন ডি’অর শুধু গোলের পুরস্কার নয়।
সাম্প্রতিক ১৯ জন ব্যালন ডি’অর বিজয়ীর মধ্যে মাত্র চারজন এমন ছিলেন, যারা জয়ের বছরে চ্যাম্পিয়নস লিগ, বিশ্বকাপ, ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ কিংবা কোপা আমেরিকার কোনো একটি শিরোপাও জেতেননি। অর্থাৎ বড় টুর্নামেন্টের সাফল্য ভোটারদের সিদ্ধান্তে কতটা প্রভাব ফেলে, তার একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়।
কেইনের ক্ষেত্রে চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্নের পথ থেমেছে সেমিফাইনালে। বিশ্বকাপেও ইংল্যান্ড চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। তবে তার পক্ষের যুক্তিটাও অসাধারণ।
৭৩ গোলের এই মৌসুম ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কোনো ক্লাবের খেলোয়াড়ের এক মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মেসির পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০১১-১২ মৌসুমে মেসি করেছিলেন ৮২ গোল। গার্ড মুলার, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, রোনালদো নাজারিও, এরলিং হালান্ড ও লুইস সুয়ারেজের মতো তারকাদের এক মৌসুমের গোলসংখ্যা পেছনে ফেলেছেন কেইন। বিশ্বকাপেও নিজের নাম লিখিয়েছেন ইতিহাসে। ১১ গোল নিয়ে গ্যারি লিনেকারকে ছাড়িয়ে ইংল্যান্ডের হয়ে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন তিনি।
তাই প্রশ্নটা এখন দাঁড়াচ্ছে, বড় ট্রফির ঘাটতি ৭৩ গোল দিয়ে পুষিয়ে দিতে পারবেন কেইন?
কেইনের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বীদের একজন রদ্রি। স্পেনকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে টুর্নামেন্টের গোল্ডেন বলও জিতেছেন তিনি। অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্বীকৃতির সঙ্গে তার হাতে আছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় ট্রফিও।
আছেন কিলিয়ান এমবাপ্পেও। বিশ্বকাপে ১০ গোল করে সর্বোচ্চ গোলদাতা, পাশাপাশি চ্যাম্পিয়নস লিগের গোল্ডেন বুট ও লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারও জিতেছেন। তবে ফ্রান্স ফাইনালে উঠতে পারেনি, আর রেয়াল মাদ্রিদও মৌসুম শেষ করেছে বড় কোনো ট্রফি ছাড়া।
লিওনেল মেসিকে কখনোই পুরোপুরি হিসাবের বাইরে রাখা যায় না। ৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলেছেন এবং টুর্নামেন্টে করেছেন আট গোল।
আর আছেন লামিনে ইয়ামাল, বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জেতার পর বিশ্বকাপও জিতেছেন টিনেজ এই তারকা।
ওসমান দেম্বেলে, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, মাইকেল অলিস, এরলিং হালান্ড, ডেকলান রাইস ও লুইস দিয়াজের নামও রয়েছে আলোচনায়।
অর্থাৎ লড়াইটা শুধু কে বেশি গোল করেছেন এতটা সরল নয়। কেউ ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে এগিয়ে, কেউ বিশ্বকাপ জয়ে, কেউ ক্লাব সাফল্যে, কেউ আবার এমন কিছু করেছেন যা পরিসংখ্যানের বাইরেও প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্বকাপের বছরগুলোতে ব্যালন ডি’অরের সঙ্গে বিশ্বকাপের সম্পর্কটা আরও স্পষ্ট। ১৯৫৮ সালে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তোলা রেমন্ড কোপা হন বিশ্বকাপের বছরে ব্যালন ডি’অর জেতা প্রথম খেলোয়াড়। এরপর ববি চার্লটন ১৯৬৬, পাওলো রসি ১৯৮২, লোথার ম্যাথাউস ১৯৯০, জিনেদিন জিদান ১৯৯৮, রোনালদো নাজারিও ২০০২ এবং ফাবিও ক্যানাভারো ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর ব্যালন ডি’অর জেতেন।
আবার বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও ফাইনালে উঠে পুরস্কার জিতেছেন জোহান ক্রুইফ ১৯৭৪ সালে নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তোলার পর। ২০১৮ সালে একই পথ অনুসরণ করেন লুকা মদ্রিচ, ক্রোয়েশিয়াকে বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে।
আরও মজার বিষয়, ফ্রান্স ফুটবল পরে পুরোনো আসরগুলো নতুন করে মূল্যায়ন করেছিলো। সেই হিসাব অনুযায়ী ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে ব্রাজিলের বিশ্বকাপজয়ী দলের পেলে, ১৯৬২ সালে গ্যারিঞ্চা, ১৯৮৬ সালে দিয়েগো ম্যারাডোনা এবং ১৯৯৪ সালে রোমারিও ব্যালন ডি’অরের যোগ্য বিজয়ী হতেন যদি তখন পুরস্কারটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকত।
অর্থাৎ ইতিহাসের পাতায় একটা প্রবণতা বেশ পরিষ্কার, বিশ্বকাপ জিতলে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে বিশাল সুবিধা পাওয়া যায়। তবে বড় ট্রফি জেতাই যে সবসময় যথেষ্ট, সেটাও নয়।
ওয়েসলি স্নেইডার ২০১০ সালে ইন্টার মিলানকে ট্রেবল জিতিয়েছিলেন এবং বিশ্বকাপের ফাইনালেও উঠেছিলেন। ফ্রাঙ্ক রিবেরি ২০১৩ সালে বায়ার্নের ট্রেবল জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন। মোহামেদ সালাহ ২০১৭-১৮ মৌসুমে অবিশ্বাস্য ব্যক্তিগত মৌসুম কাটিয়েছিলেন। তবু কেউ ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি।
অন্যদিকে মেসি ২০১০ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার পরও পুরস্কার জিতেছেন। সেবার বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচ খেলেও একটিও গোল করতে পারেননি, করেছিলেন মাত্র একটি অ্যাসিস্ট । ২০১২ ও ২০১৯ সালেও বড় আন্তর্জাতিক বা মহাদেশীয় শিরোপা ছাড়া পুরস্কারটি জিতেছেন তিনি।
ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ২০১৩ সালে পর্তুগাল বিশ্বকাপের মূল পর্বে যেতে ব্যর্থ হওয়ার পরও ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন রেয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার দুর্দান্ত ব্যক্তিগত মৌসুমের কারণে।
তাই ইতিহাসের নিয়ম একেবারে অটল নয়।
তবে এবারের ব্যালন ডি’অর শুধু আরেকটি পুরস্কার বিতরণী নয়। এটি ৭০তম আসর। ১৯৫৬ সালে প্রথম বিজয়ী ছিলোেন ইংল্যান্ডের স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউজ। ৭০ বছর পর সেই পুরস্কারের ৭০তম আসর হচ্ছে লন্ডনে।
এই প্রতীকী যোগসূত্রই এবারের আয়োজনকে আলাদা করে তুলেছে।
আর যদি হ্যারি কেইন শেষ পর্যন্ত ট্রফি হাতে তোলেন, তাহলে গল্পটা আরও সুন্দর হয়ে যাবে। কারণ এখন পর্যন্ত মাত্র চারজন ইংলিশম্যান ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। স্ট্যানলি ম্যাথিউজের পর ববি চার্লটন, কেভিন কিগান ও মাইকেল ওউয়েন। কেইন জিতলে হবেন পঞ্চম ইংলিশ বিজয়ী।
শুধু তাই নয়, ১৯৯৬ সালে ম্যাথিয়াস সামারের পর তিনিই হবেন বুন্দেসলিগার কোনো ক্লাবের হয়ে খেলে ব্যালন ডি’অর জেতা প্রথম খেলোয়াড়।
চূড়ান্ত প্রশ্ন একটাই, কেইন কি পারবেন?