দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তবু ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে নেই

কারও দুর্দান্ত ক্লাব মৌসুম, কারও আবার বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স। কেউ কেউ জিতেছেন বেশ কয়েকটা ট্রফি, কেউ আবার দলের সাফল্যের প্রধান কারিগর। তবে এই আলোচনায় প্রাপ্তি নয়, বরং অপ্রাপ্তির এক প্রশ্ন নিয়েই স্থান তাদের। পুরস্কার জেতা না জেতা পরের প্রশ্ন, ব্যালন ডি’অরের  দৌড়ে জায়গাই হয়নি তাদের। কাগজে-কলমে মাঠের লড়াইয় দারুণ সময় কাটিয়েও যারা রয়ে গেলেন পুরস্কারের দৌড়ের বাইরে, তাদের বাদ পড়া নিয়ে তো এখন প্রশ্ন উঠতেই পারে।  

ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর একটি ব্যালন ডি’অর। আর সাত দশকের ইতিহাসে এবারই প্রথম প্যারিসের বাইরে বসছে এই পুরস্কারের আসর। ২৬ অক্টোবর লন্ডনে বসবে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আয়োজন। ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন ইংল্যান্ডের স্যার স্ট্যানলি ম্যাথিউজ। সেই ঐতিহাসিক প্রথম বিজয়ীর দেশেই, সাত দশক পর বসছে এবারের আয়োজন।

তবে ফুটবল ভক্তদের তর্ক-বিতর্কের খোরাকে এখন কে কে পুরস্কার জিততে পারেন, তার সাথে জুড়ে বসছে মনোনয়ন না-পাওয়াদের নিয়ে আলাপ। যারা এই তালিকায় নেই, তাদের মধ্যে কারা ছিলেন মনোনয়নের সবচেয়ে বড় দাবিদার? মেসি-রোনালদো যুগ পেরিয়ে নতুন তারকাদের দাপটের মধ্যেও রাফিনিয়া, পেদ্রি, মিকেল ওইয়ারসাবাল, দানি ওলমো, উনাই সিমন ও জুলিয়ান আলভারেজের মতো বেশ কিছু পরিচিত নাম জায়গা পাননি তালিকায়। আর তাই ৮এ সেপ্টেম্বর মনোনয়ন প্রকাশের পর থেকেই শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের মনোনয়ন এই তারকারা কেন পেতেই পারতেন, সেটা তাদের পারফরম্যান্স আর পরিসংখ্যানের হিসেবে একটু নজর দিলেই বুঝতে পারবেন। 

রাফিনিয়া

এক বছর আগেও ব্যালন ডি’অরের সেরা তিনের আলোচনায় ছিলেন রাফিনিয়া।  কিন্তু এবার ৩০ জনের তালিকাতেই জায়গা হয়নি তার।

মৌসুমের শুরুতে চোটে কিছুটা পিছিয়ে পড়লেও দ্রুতই নিজের সেরা ছন্দে ফিরেছিলেন ব্রাজিলিয়ান উইঙ্গার। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ৩৩ ম্যাচে করেছেন ২১ গোল, সঙ্গে ৮ অ্যাসিস্ট। সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, কেন তার বাদ পড়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত মৌসুমের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর এবার হঠাৎ করেই মনোনয়ন তালিকার বাইরে রাফিনিয়া যা এই তালিকার অন্যতম বড় বিস্ময়।

আগের বছর ব্যালন ডি’অরের সেরা তিনের আলোচনায় ছিলেন রাফিনিয়া।

মিকেল ওইয়ারসাবাল

স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম মিকেল ওইয়ারসাবাল। বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করেছেন এই ফরোয়ার্ড, যা তাকে ব্যালন ডি’অরের আলোচনায় রাখার জন্যই যথেষ্ট হওয়ার কথা।এর সঙ্গে ছিল রিয়াল সোসিয়েদাদের হয়ে লা লিগায় ১৫ গোলের অবদান। অর্থাৎ ক্লাব ও জাতীয় দল, দুই জায়গাতেই ধারাবাহিক ছিলেন ওইয়ারসাবাল। স্পেনকে বিশ্বকাপ জেতানো এমন একজন খেলোয়াড়ের ৩০ জনের তালিকায় না থাকাটা ব্যালন ডি’অরের সিদ্ধান্তকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বিশ্বকাপে পাঁচ গোল করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল

পেদ্রি

তালিকার সবচেয়ে বড় প্রশ্নবোধক নামগুলোর একটি পেদ্রি। বার্সেলোনার মাঝমাঠের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করা থেকে ম্যাচের গতি বদলে দেওয়া, গত মৌসুমেও স্প্যানিশ মিডফিল্ডার ছিলেন দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।

বার্সেলোনার হয়ে তিনটি ট্রফি জয়ের মৌসুম কাটিয়েছেন তিনি। ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানের পাশাপাশি ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ, পাসিং ও খেলার গতি নির্ধারণে তার প্রভাব ছিল স্পষ্ট। বিশ্বকাপে চোটের কারণে তার প্রভাব কিছুটা কমে গেলেও পুরো মৌসুমের পারফরম্যান্স বিবেচনায় পেদ্রির বাদ পড়া তাই বড় প্রশ্নই তৈরি করেছে। 

বার্সেলোনার হয়ে তিনটি ট্রফি জয়ের মৌসুম কাটিয়েছেন পেদ্রি

দানি ওলমো

বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে ৫৬ ম্যাচের মধ্যে ৪৮টিতেই খেলেছেন দানি ওলমো। ৮ গোল ও ৯ অ্যাসিস্টের পাশাপাশি দলটির ঘরোয়া ট্রেবল জয়ের পথেও গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।

জাতীয় দলের হয়েও তার প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো। বিশ্বকাপে স্পেনের শিরোপা জয়ের পথে নিয়মিত একাদশে জায়গা করে নিয়েছেন, এমনকি বার্সেলোনার আরেক বড় তারকাকেও কিছু ম্যাচে বেঞ্চে রাখতে হয়েছে তার পারফরম্যান্সের কারণে। তবু মনোনয়ন তালিকায় জায়গা হয়নি ওলমোর। 

বিশ্বকাপে স্পেনের শিরোপা জয়ে দানি ওলমোর প্রভাব ছিল চোখে পড়ার মতো

জুলিয়ান আলভারেজ

বর্তমান সময়ের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকারদের একজন জুলিয়ান আলভারেজের নাম না থাকাটা তাই বেশ বিস্ময়কর। অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় ২৯ ম্যাচে ১২ গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন তিনি। চ্যাম্পিয়নস লিগেও দলটির সেমিফাইনাল যাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল আর্জেন্টাইন ফরোয়ার্ডের। 

এরপর জাতীয় দলের হয়েও নিয়মিত ছিলেন আলোচনায়। আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতেও অবদান রেখেছেন আলভারেজ। যদিও মৌসুম শেষে কোনো ট্রফি জেতেননি, সম্ভবত সেটিই মনোনয়ন না পাওয়ার বড় কারণ। তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বিবেচনায় বাদ পড়াটা বেশ কঠিনই।

অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের হয়ে লা লিগায় ২৯ ম্যাচে ১২ গোলে সরাসরি অবদান জুলিয়ান আলভারেজের 

ব্র্যাডলি বারকোলা

পিএসজির হয়ে লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ব্র্যাডলি বারকোলার নামও ছিল প্রত্যাশিত তালিকায়। দলের আক্রমণভাগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর ফ্রান্সের বিশ্বকাপযাত্রাতেও অবদান রেখেছেন তিনি।

বিশ্বকাপে চার ম্যাচে সরাসরি চার গোলে অবদান রেখে ফ্রান্সকে সেমিফাইনালে তুলতে সাহায্য করেছেন বারকোলা। এরপরই লিভারপুলের হয়ে ১২৩ মিলিয়ন পাউন্ডের বিশাল ট্রান্সফারে যোগ দিয়েছেন। এত কিছুর পরও ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনে জায়গা হয়নি তার।

পিএসজির হয়ে লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ব্র্যাডলি বারকোলার নামও ছিল প্রত্যাশিত তালিকায়

মার্টিন ওডেগার্ড

আর্সেনালের অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ডও থাকতে পারতেন তালিকায়। দীর্ঘ ২২ বছর পর আর্সেনালকে প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা এনে দেওয়ার পথে গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন নরওয়েজিয়ান মিডফিল্ডার।

শুধু ক্লাব নয়, জাতীয় দলের হয়েও নজর কেড়েছেন তিনি। বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে পাঁচ ম্যাচে চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন ওডেগার্ড। তবু ব্যালন ডি’অরের তালিকায় জায়গা হয়নি তার যেখানে দলের সাফল্যের আড়ালে অনেক সময় মিডফিল্ডারদের অবদানই সবচেয়ে বেশি ঢাকা পড়ে যায়। 

বিশ্বকাপে নরওয়ের প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার পথে পাঁচ ম্যাচে চারটি অ্যাসিস্ট করেছেন মার্টিন ওডেগার্ড

ডেভিড রায়া

২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অরের তালিকায় কোনো গোলরক্ষকের জায়গা হয়নি। অথচ ডেভিড রায়ার ক্ষেত্রে মনোনয়নের দাবি বেশ শক্ত।

আর্সেনালের প্রিমিয়ার লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি গত মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিট রাখা গোলরক্ষক ছিলেন রায়া। টানা তৃতীয়বার জিতেছেন গোল্ডেন গ্লাভও। দলের সাফল্যের পেছনে এমন পারফরম্যান্সের পরও ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনে তার নাম না থাকা নিঃসন্দেহে হতাশার। 

আর্সেনালের প্রিমিয়ার লিগ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি গত মৌসুমে সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিট রাখা গোলরক্ষক ছিলেন  ডেভিড রায়া

উনাই সিমন

স্পেনের বিশ্বকাপজয়ের অন্যতম নায়ক বলা যায় উনাই সিমনকে। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র এক গোল হজম করেছেন এই গোলরক্ষক। স্পেনের রক্ষণভাগকে আগলে রাখার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে তার সেভগুলো দলকে শিরোপার পথে এগিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে এমন পারফরম্যান্সের পরও ব্যালন ডি’অরের তালিকায় কোনো গোলরক্ষকের জায়গা না হওয়াটা তাই আরও বিস্ময়কর। অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের হয়ে থাকা সিমনের অসাধারণ মৌসুমও যেন পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়েছে। 

বিশ্বকাপের পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র এক গোল হজম করেছেন উনাই সিমন

দেজিরে দুএ

পিএসজির সাফল্যের তালিকায় অনেক তারকার নাম থাকলেও দেজিরে দুএর নামটি নেই। অথচ ফরাসি ক্লাবটির হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা এই তরুণকে নিয়ে এরই মধ্যে বিশ্ব ফুটবলে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।

মাত্র ২১ বছর বয়সেই শীর্ষ পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন দুএ। পিএসজির আরও বেশ কয়েকজন সতীর্থ মনোনয়ন পেলেও তার নাম না থাকাটা তাই কিছুটা বিস্ময়কর। বয়স অবশ্য তার পক্ষে, সামনে আরও অনেকবার ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

মাত্র ২১ বছর বয়সেই শীর্ষ পর্যায়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন দেজিরে দুএ

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

সবশেষে আসে সবচেয়ে আলোচিত নাম, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী পর্তুগিজ তারকা এবারও ৩০ জনের তালিকায় নেই।

পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী  ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

সৌদি আরবে খেলা এবং ইউরোপের শীর্ষ প্রতিযোগিতায় না থাকার কারণে তার মনোনয়ন পাওয়া কঠিন ছিল এটা ঠিক কিন্তু গোলের ধারাবাহিকতা এবং পর্তুগালের অধিনায়ক হিসেবে তার প্রভাব বিবেচনায় তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করাও কম বিতর্কিত নয়।

মেসি-রোনালদোর যুগে যেখানে ব্যালন ডি’অর প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে তাদের দ্বৈরথের কেন্দ্র ছিল, সেখানে রোনালদোর অনুপস্থিতি প্রতীকীভাবেও পুরস্কারটির নতুন যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে।