লিওনেল, আমাদের ভালোবাসা হয়ে গেছে পদ্ম পাতার জল

‘‘আমি সবসময়ই সবটুকু দিয়েছি। শুধু গত কয়েক বছর নয়, যখন আমরা সব জিতেছি, তার আগেও।’’

আর্জেন্টিনার জার্সিতে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে গিয়ে লিওনেল মেসির কথাগুলোর সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ হয়তো কোনো ট্রফির নাম নয়, কোনো রেকর্ডও নয়। বরং এই স্বীকারোক্তি, তিনি সবসময়ই সবটুকু দিয়েছেন। ভালো সময়ে যেমন, তেমনি সেই দীর্ঘ, কঠিন সময়েও, যখন আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তার জন্য জয় যেন অধরাই ছিলো।

মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারকে যদি শুধু ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ আর ২০২৪ কোপা আমেরিকার চোখ দিয়ে দেখা হয়, তাহলে গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটাই বাদ পড়ে যায়।

কারণ মেসি শুধু জেতেননি। তিনি হেরেছেন, ভেঙেছেন। অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। আবার ফিরেছেন। আবার হেরেছেন। আবার চেষ্টা করেছেন।

শেষ পর্যন্ত জিতেছেন।

আর এখন, ৩৯ বছর বয়সে, আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখার সিদ্ধান্ত জানিয়ে তিনি বলেছেন, ‘‘আমি নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। আর দেওয়ার মতো কিছু নেই।’’

হয়তো এই গল্পের শুরুটা তাই কোনো বিশ্বকাপ দিয়ে হওয়া উচিত নয়। শুরুটা হওয়া উচিত রোজারিওর এক ছোট্ট ছেলে দিয়ে।

রোজারিও থেকে পৃথিবীর পাঠশালায়

রোজারিওর কোনো এক সাধারণ দিনে এক ছোট্ট ছেলে ফুটবল খেলতে যাচ্ছিলো। বাবা কাজ থেকে ফিরেছেন, তবু ক্লান্তি সরিয়ে ছেলেকে নিয়ে ছুটেছেন অনুশীলনে। বাবা না পারলে মা গেছেন। মাঠে ছেলেটা খেলেছে, আর পরিবারের মানুষগুলো মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে দেখেছে।

সেখানে কোনো ক্যামেরার ঝলকানি ছিলো না। হাজার হাজার মানুষের গর্জন ছিলো না। ছিলো না ১০ নম্বর জার্সির ভার, জাতীয় দলের অধিনায়কত্ব, বিশ্বকাপ কিংবা পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত ক্রীড়া তারকাদের একজন হয়ে ওঠার চাপ।

ছিলো শুধু এক বাবা, এক মা, এক ছেলে আর একটা ফুটবল। 

মেসির গল্পের একেবারে শুরুতে অবশ্য ছিলেন আরও একজন, তার নানি সেলিয়া অলিভেরা কুচিত্তিনি। চার বছরের ছোট্ট লিও তখন রোজারিওর গ্রান্দোলি ক্লাবের দলে ছিলো না। এক ম্যাচের আগে খেলোয়াড় কম পড়ে গেলে সেলিয়াই কোচকে নাতিকে খেলানোর জন্য জোর দেন। ছোট্ট শরীর দেখে কোচের দ্বিধা ছিলো, কিন্তু নানির জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হার মানতে হয়।

মাঠে নেমেই চার বছরের মেসি গোল করেন দুটি। সেই ম্যাচে হয়তো কেউ জানত না, এই ছোট্ট ছেলেটিই একদিন ফুটবল দুনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি হবে। কিন্তু মেসির গল্পের প্রথম অধ্যায়ের নেপথ্যে ছিলেন সেই নানি, যিনি প্রথম দেখেছিলেন,এই ছোট্ট ছেলেটার মধ্যে অন্যরকম কিছু আছে।

সেলিয়া অবশ্য সেই গল্পের শেষটা দেখে যেতে পারেননি। মেসির বয়স যখন ১১, তখন তিনি মারা যান। এরপর থেকেই গোলের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে মেসির আঙুল তোলা হয়ে ওঠে নানির প্রতি তার নীরব শ্রদ্ধা।

পৃথিবী পরে তাকে চিনবে লিওনেল মেসি নামে। কিন্তু পৃথিবী মেসিকে চেনার অনেক আগেই, রোজারিও তাকে চিনত একটি ছোট্ট ছেলে হিসেবে। আর বাবা হোর্হে মেসি জানতেন যে তার ছেলে ফুটবল খেলতে ভালোবাসে।

মা সেলিয়া মারিয়া কুচিত্তিনিও ছিলেন সেই পথের অবিচ্ছেদ্য অংশ। হোর্হে যখন কাজের কারণে ছেলের সঙ্গে থাকতে পারতেন না, সেলিয়া মেসির ভাইবোনদের নিয়ে আর্জেন্টিনাতেই থেকে সংসার সামলেছেন। মেসির স্বপ্নের পেছনে শুধু একজন বাবার ছুটে চলা ছিলো না; ছিলো পুরো পরিবারের নীরব ত্যাগ।

হোর্হে মেসি শুধু তার ছেলের বাবা ছিলেন না। তিনি ছিলেন তার প্রথম সঙ্গী, প্রথম সমর্থক, পরবর্তী সময়ে প্রতিনিধি, মেসির নিজের ভাষায়, বাবা, বন্ধু এবং পথচলায় একজন গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।

মেসি একবার লিখেছিলেন, বাবা কাজ থেকে ফিরেই তাকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন। ছেলের কোনো ম্যাচই তিনি মিস করতে চাইতেন না। এমনকি বাবা-ছেলের মধ্যে মতবিরোধ হলেও, মেসি স্বীকার করেছেন, অনেক সময় শেষ পর্যন্ত তার বাবাই ঠিক ছিলেন।

বিশ্ব যখন মেসির ড্রিবলিং দেখেছে, হোর্হে দেখেছেন তার ছেলেটাকে। বিশ্ব যখন গোলের পর উল্লাস করেছে, হোর্হে জানতেন সেই গোলের পেছনে লুকিয়ে থাকা বছরের পর বছর পরিশ্রমের গল্প।

সবাই যখন মেসির ব্যর্থতার হিসাব করেছে, হোর্হে জানতেন সেই শিশুটির গল্প, যে একদিন শুধু ফুটবল খেলতে চেয়েছিলো।

তারপর এলো সেই বয়স, যখন স্বপ্নের মূল্যটা একটু বেশি হয়ে গেল।

মেসির গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়েছিলো। চিকিৎসার খরচ জোগানো পরিবারের জন্য সহজ ছিলো না। তেরো বছর বয়সে তাই রোজারিও ছেড়ে স্পেনে পাড়ি জমালো ছোট্ট লিওনেল। বার্সেলোনা তাকে একাডেমিতে নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসার দায়িত্বও নেয়।

একটি শিশুর জন্য নিজের শহর, পরিবার, পরিচিত পৃথিবী ছেড়ে অন্য মহাদেশে চলে যাওয়া ছোট কোনো ব্যাপার নয়। কিন্তু মেসির জীবন যেন শুরু থেকেই তাকে শিখিয়েছিলো, স্বপ্নের দিকে যেতে হলে কখনো কখনো শৈশবটাকেও একটু পেছনে রেখে যেতে হয়।

সে বেছে নিয়েছিলো ফুটবলকে। তারপর ফুটবলও তাকে বেছে নিলো।

তেরো বছরের সেই ছেলেটি ধীরে ধীরে হয়ে উঠল বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ংকর ফরোয়ার্ডদের একজন। তারপর সেরা আর তারপর কিংবদন্তি।

একসময় এমন এক নাম, যার পরিচয়ের জন্য আর কোনো বিশেষণ প্রয়োজন হতো না।

শুধু, মেসি।

বিশ্ব যখন মেসির ড্রিবলিং দেখেছে, হোর্হে দেখেছেন তার ছেলেটাকে।

তারকা হওয়ার আগেই যারা তাকে চিনতেন

মেসি যত বড় হয়েছেন, তার জীবনে কিছু মানুষ একই জায়গায় থেকে গেছেন।

তার বাবা-মা আর রোজারিওর সেই মেয়েটি, যাকে তিনি পৃথিবীর বাকি সবাই মেসিকে চেনার অনেক আগেই চিনতেন, আন্তোনেলা রোকুজ্জো।

মেসির বয়স তখন ৯ বছর আর আন্তোনেলার ৮। মেসির বন্ধু ও আন্তোনেলার কাজিন লুকাস স্কাগলিয়ার মাধ্যমে তাদের পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই একে অন্যকে পছন্দ করতেন তারা। মেসি এমনকি সেই বয়সে আন্তোনেলাকে চিঠিও লিখেছিলেন।

মেসি তখন নয়। আন্তোনেলা আট।

তারপর জীবন তাদের আলাদা করে দিলো।

মেসি চলে গেলেন বার্সেলোনায়। ফুটবল তাকে রোজারিও থেকে ইউরোপে নিয়ে গেল। আন্তোনেলা নিজের জীবন নিয়ে রয়ে গেলেন আর্জেন্টিনায়।

কিন্তু কিছু মানুষকে জীবন পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারে না। বছর পেরিয়ে তারা আবার কাছাকাছি এলেন। সম্পর্ক তৈরি হলো। ২০১৭ সালে সেই রোজারিওতেই বিয়ে করলেন তারা।

ততদিনে মেসি আর সেই ৯ বছরের ছেলে নন। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল তারকাদের একজন। কিন্তু আন্তোনেলার কাছে তিনি হয়তো আজও সেই ‘লিও’, পৃথিবী মেসিকে চেনার অনেক আগের মানুষটি।

হয়তো এটাই মেসির জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ব্যাপারগুলোর একটি। পৃথিবী তাকে যতই বদলে দিক, তার কাছে ফেরার মতো কিছু মানুষ সবসময় ছিলো।

একটি শহর। পরিবার। পুরোনো প্রেম।

আর একজন বাবা, যিনি আজ আর নেই।

আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সির ওজন

আজ যখন মেসি বলেন, ‘‘শুধু গত কয়েক বছর নয়, তার আগেও আমি সবসময়ই সবটুকু দিয়েছি,’’ কথাটা শুধু একটি বিদায়ী পোস্টের বাক্য নয়।

এটি যেন তার পুরো আর্জেন্টিনা অধ্যায়ের সারাংশ। কারণ আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির গল্পটা কখনোই সহজ ছিলো না।

যে মানুষটি ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জিতেছিলেন, নিজের দেশের হয়ে তাকেই বারবার এমন একটা জায়গায় দাঁড়াতে হয়েছিলো যেখানে তাকে প্রমাণ করতে হতো, তিনি সত্যিই আর্জেন্টিনার জন্য যথেষ্ট কি না।

ক্লাব ফুটবলে তখন তিনি একের পর এক গোল করছেন, ট্রফি জিতছেন, ব্যালন ডি’অর হাতে তুলছেন। ২০০৯ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে তার সেই অসম্ভব সুন্দর হেডার। ঊনিশ বছর বয়সে গেটাফের বিপক্ষে পাঁচজনকে কাটিয়ে করা গোল, যেটিকে আজও তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে জাদুকরী গোলগুলোর একটি হিসেবে মনে করা হয়।

এল ক্লাসিকোয় ক্যাসেমিরো আর সার্জিও রামোস যখন তাকে থামাতে বডি ট্যাকেল-ফাউলসহ সব উপায়ে চেষ্টা করছিলেন, তখনও মেসি থামেননি। আর ম্যাচের শেষ দিকে তার বাঁ পায়ের সেই নিচের কোণ ঘেঁষে যাওয়া শট, গোলরক্ষকের কিছুই করার ছিলো না।

রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে বার্সেলোনার সেই জয়, আর মেসির জার্সি খুলে মাথার ওপর তুলে ধরা উদযাপন, একটি ছবি, যা শুধু একটি গোলের উদযাপন হয়ে থাকেনি।

কিন্তু এসব গল্প আর্জেন্টিনার জার্সিতে তাকে সহজ কোনো জীবন দেয়নি। জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সিটি শুধু একটি নম্বর ছিলো না। আর্জেন্টিনার ফুটবল সংস্কৃতিতে এটি ছিলো মারাদোনার রেখে যাওয়া এক বিশাল প্রতীকী উত্তরাধিকার। একটি দেশের ফুটবল পরিচয়ের সঙ্গে মিশে থাকা একটি দায়িত্ব।

মেসির সামনে তাই প্রশ্নটা এমন ছিলো না যে তিনি  কত ভালো খেলবেন, বরং তিনি কি জিততে পারবেন?

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনাল। একের পর এক হার।

২০১৬ সালে এতটাই ভেঙে পড়েছিলেন মেসি যে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। 

যে মানুষটি ক্লাব ফুটবলে প্রায় সবকিছু জিতেছিলেন, নিজের দেশের হয়ে তাকেই বারবার এমন একটা জায়গায় দাঁড়াতে হয়েছিলো যেখানে তাকে প্রমাণ করতে হতো, তিনি সত্যিই আর্জেন্টিনার জন্য যথেষ্ট কি না।

তবু তিনি ফিরে এসেছিলেন। কারণ তিনি বলেছিলেন, সবটুকু দিয়েছিলেন। আর সত্যিই তিনি দিয়েছিলেন।

২০১৪ সালের যে রাতটা থেকে গিয়েছিলো

২০১৪ সালের মারাকানা। আর্জেন্টিনা বনাম জার্মানি। ১২০ মিনিটের লড়াইয়ের পর মারিও গোটজের গোল। বিশ্বকাপ চলে গেল জার্মানির হাতে।

মেসি গোল্ডেন বল হাতে দাঁড়িয়ে। কিন্তু যে ট্রফিটির জন্য এতটা পথ এসেছিলেন, সেটি পাওয়া হলো না।

সেই রাতের পর আরও দুটি ফাইনাল এসেছিলো। দুটিই হার।

আর ২০১৬ সালের পর মনে হয়েছিলো, হয়তো এই গল্পের শেষটা এমনই হবে। মেসি হয়তো বিশ্বের সেরা ফুটবলার হয়ে থাকবেন, কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে সেই শেষ দরজাটা আর খুলবে না।

তারপর ২০২১ সাল, আবারও মারাকানা। এবার প্রতিপক্ষ ব্রাজিল। এবার আর মেসি রানার্সআপ নন। আর্জেন্টিনা কোপা আমেরিকা জিতল। মেসির প্রথম বড় সিনিয়র আন্তর্জাতিক ট্রফি।

যে মানুষটিকে এতদিন জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, ‘তুমি কবে জিতবে?’, হঠাৎ সেই মানুষটিই হয়ে গেলেন উত্তর।

তারপর ২০২২ ফিনালিসিমা। ইতালিকে হারিয়ে আরেকটি শিরোপা। আর তারপর কাতার।

অবশেষে উত্তর এলো কাতারে 

পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী মেসি তার পঞ্চম বিশ্বকাপে পা রাখলেন।

শুরুতেই সৌদি আরবের কাছে হার। কিন্তু সেই ধাক্কা যেন আর্জেন্টিনাকে আরও জেদি করে তুলল।

মেক্সিকোর বিপক্ষে মেসির গোল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নকআউট পর্বে তার প্রথম বিশ্বকাপ গোল।
ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই দৌড়, ডিফেন্ডারকে ঘুরিয়ে দেওয়া, তারপর আলভারেজকে বল বাড়ানো।

আর নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে গোলের পর দুই হাত কানের পাশে তুলে ডাচ বেঞ্চের দিকে তাকানো সেই উদযাপন প্রমাণ করে যে একজন শান্ত, সংযত মেসির ভেতরে কতটা আগুন ছিলো।

মেসির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনেকগুলোই আসলে স্কোরবোর্ডে লেখা নেই। 

তারপর ফাইনাল। ফ্রান্স।

মেসি গোল করলেন। ফ্রান্স ফিরে এল। আবার মেসি গোল করলেন। আবার এমবাপ্পে সমতা ফেরালেন। ১২০ মিনিট পর পেনাল্টি।

শেষ পেনাল্টি নিতে গেলেন গনসালো মন্তিয়েল। মেসি শুধু তাকিয়ে ছিলেন।

হয়তো সেই মুহূর্তে তার মনে হচ্ছিলো, এবার কি সত্যিই হবে?

মন্তিয়েলের বল জালে ঢুকল। মেসি হাসলেন। তারপর নিজেকে মাটিতে ছুড়ে দিলেন।

মনে হলো, এত বছরের ভারটা যেন হঠাৎ শরীর থেকে বেরিয়ে গেল।

২০১৪ সালের মারাকানা থেকে ২০২২ সালের লুসাইল, আট বছর পর উত্তরটা এসে গেছে। হ্যাঁ, মেসি পেরেছেন।এবং সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারগুলোর একটি হলো হোর্হে মেসি সেই মুহূর্তটি দেখেছিলেন।

রোজারিওর যে ছোট্ট ছেলেটিকে তিনি অনুশীলনে নিয়ে যেতেন, সেই ছেলে এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফুটবল ট্রফি হাতে দাঁড়িয়ে।

বাবা তখনও ছিলেন।

একজন ছোটখাটো আর্জেন্টাইন ১০ নম্বর, যে বল পায়ে নিয়ে চারজন ডিফেন্ডারের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে দৌড়াত, যেন তারা আসলে কোনো সমস্যা নয়, শুধু রাস্তার সামান্য যানজট।

মেসির গল্প কখনো শুধু ট্রফির ছিলো না

মেসির সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর অনেকগুলোই আসলে স্কোরবোর্ডে লেখা নেই।

একবার আর্জেন্টাইন সাংবাদিক রামা পান্তোরোত্তো মেসিকে তার মায়ের দেওয়া একটি লাল ফিতা দিয়েছিলেন সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে। পরে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ শেষে মেসি সেই সাংবাদিককে নিজের গোড়ালি দেখিয়ে দেখিয়েছিলোেন, তিনি সত্যিই সেই ফিতা বেঁধে খেলেছেন।

একজন মানুষ, যাকে পৃথিবী প্রায় অতিমানব হিসেবে দেখে, তিনিও কখনো কখনো অন্য কারও মায়ের দেওয়া ছোট্ট একটি লাল ফিতায় বিশ্বাস রাখেন।

আবার আফগানিস্তানের ছোট্ট মুর্তজা আহমাদি।

আসল মেসি জার্সি কেনার সামর্থ্য ছিলো না পরিবারের। তাই প্লাস্টিকের ব্যাগ কেটে বানানো হয়েছিলো আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি। ছবিটি পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিলো। মেসি সেটি দেখেছিলেন। পরে মুর্তজার সঙ্গে তার দেখা হয় কাতারে, মাঠে হাত ধরে হাঁটেন মেসি।

এমন গল্পগুলোতেই হয়তো মেসির আরেকটি পরিচয় পাওয়া যায়।

তিনি শুধু গোল করেননি। তিনি মানুষের স্বপ্নের অংশ হয়ে গিয়েছিলেন।

কারও প্রথম প্রেমও ছিলো মেসি

আর সত্যি বলতে কী, একটা প্রজন্মের প্রথম প্রেমও হয়তো ছিলো মেসি।

একজন ছোটখাটো আর্জেন্টাইন ১০ নম্বর, যে বল পায়ে নিয়ে চারজন ডিফেন্ডারের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে দৌড়াত, যেন তারা আসলে কোনো সমস্যা নয়, শুধু রাস্তার সামান্য যানজট।

আমরা কেউ তখন স্কুলে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কেউ প্রথম প্রথম প্রেমে পড়ছি। কেউ প্রথমবার নিজের পছন্দের জার্সি কিনছি। কেউ বন্ধুদের সঙ্গে রাত জেগে খেলা দেখছি।

আর কোথাও না কোথাও মেসি ছিলেন।

একটি গোলের মধ্যে, একটি বিশ্বকাপের রাতে।,বন্ধুর সঙ্গে তর্কে হারের পরে মন খারাপে, জয়ের পরে উল্লাসে।

কেউ হয়তো ২০০৯ সালের সেই হেডার দেখে প্রথমবার বুঝেছিলো, এই ছেলেটা অন্যরকম। কেউ ২০১২ সালের গোলের পর তার ভক্ত হয়েছিলো।

কেউ ২০১৪ সালে কেঁদেছিলো। কেউ ২০১৬ সালে তার অবসরের ঘোষণায় ভেবেছিলো, আর বুঝি দেখা যাবে না।

তারপর ২০২২ সালে আবার রাত জেগে চিৎকার করেছিলো।

আর বাংলাদেশের অনেকের কাছে মেসির সেই প্রথম প্রেমের স্মৃতিটা আরও একটু বাস্তব। ২০১১ সালে আর্জেন্টিনা দলের হয়ে ঢাকায় এসেছিলেন মেসি। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা সেই মানুষটিকে সেদিন দেশের মাটিতে দেখতে ভিড় করেছিলেন হাজারো মানুষ। এতদিন যে মানুষটিকে দেখা গেছে দূরের কোনো পর্দায়, সে হঠাৎ ঢাকার মাটিতে, এক প্রজন্মের কাছে সেটি ছিলো অন্যরকম এক বিস্ময়।

মেসি তখনও কিংবদন্তির শেষ অধ্যায়ে পৌঁছাননি। কিন্তু বাংলাদেশের অনেকের কাছে, সেই দিনই তিনি হয়তো একটু বেশি করে নিজেদের মানুষ হয়ে গিয়েছিলেন।

মেসি শুধু আমাদের দেখার মানুষ ছিলেন না। তিনি আমাদের বেড়ে ওঠার একটি অংশ ছিলেন।

যে বিশ্বকাপে বাবা ছিলেন, আর যে বিশ্বকাপে বাবা ছিলেন না

২০২২ সালে হোর্হে তার ছেলেকে বিশ্বকাপ জিততে দেখেছিলেন।

কিন্তু চার বছর পর গল্পটা একেবারে অন্যরকম।

২০২৬ বিশ্বকাপ শুরুর কয়েক দিন আগে হোর্হের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। মেসির বাবা জীবনের প্রথমবার তার কোনো বড় টুর্নামেন্টে পাশে থাকতে পারলেন না। মেসির মা তাকে আশ্বস্ত করতেন, হোর্হে সুস্থ হয়ে উঠবেন, হয়তো পরে ছেলের খেলা দেখতে পারবেন। মেসিও বাবাকে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনা ফাইনালে উঠবে, তখন তিনি আসতে পারবেন।

প্রতিটি ম্যাচ শেষে মেসি অপেক্ষা করতেন বাবার বার্তার জন্য। সেই বার্তা যখন আর আগের মতো আসছিলো না, তখন বুঝতে পারছিলেন পরিস্থিতি কতটা গুরুতর।

তবু তিনি খেলেছেন। আর্জেন্টিনা এগিয়েছে। ফাইনালে উঠেছে। কিন্তু হোর্হে যেতে পারেননি।

আর মেসির জন্য সেই ফাইনাল শুধু আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিলো না। তিনি পরে লিখেছিলেন, তিনি চেয়েছিলেন আবার বিশ্বকাপ জিতে সেটি বাবার কাছে নিয়ে যেতে, নতুন একটি ট্রফি দেখাতে। এবারে আর তা হয়নি। 

তার ভাষায়, তার পা আর তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারছিলো না। তিনি নিজের শরীরের সীমা অতিক্রম করে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু টুর্নামেন্টজুড়েই নিজেকে ঠিকঠাক মনে হয়নি।

আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। আর এবার সেই ট্রফি বাবার হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগও হলো না।

কয়েক সপ্তাহ পর হোর্হে মারা গেলেন।

বাবাকে হারিয়ে, নিজের ভেতরটাও একটু হারিয়ে

বাবার মৃত্যুর পর মেসি লিখেছিলেন, তিনি জানেন না তাকে ছাড়া কীভাবে চলবেন। ফুটবল ছাড়া তিনি আর কী করবেন, সেটিও জানেন না। কারণ ফুটবলই তো তার জীবন, আর সেই জীবনের শুরুতে ছিলেন হোর্হে।

ছোট্ট লিওকে অনুশীলনে নিয়ে যাওয়া সেই বাবা, মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা সেই বাবা, ব্যর্থতা দেখা সেই বাবা, সাফল্য দেখা সেই বাবা, বিশ্বকাপ দেখা সেই বাবা।

এবং শেষ পর্যন্ত, ছেলের জীবনের শেষ বিশ্বকাপগুলোর একটিতে হাসপাতালের বিছানায় থাকা সেই বাবা।

হোর্হে ছিলেন মেসির বাবা, বন্ধু এবং দীর্ঘদিনের প্রতিনিধি। মেসির নিজের ভাষায়, তিনি ছিলেন জীবনের শুরু থেকে পাশে থাকা মানুষ। তাই বাবাকে হারানোর পর মেসির সামনে শুধু একটি প্রশ্ন ছিলো না, আর কতদিন তিনি ফুটবল খেলবেন?

আরেকটি প্রশ্নও ছিলো। যে মানুষটির জন্য এতদিন ফিরে আসা, লড়াই করা, জেতা, সেই মানুষটি যখন আর নেই, তখন ফিরে আসবেন কার কাছে?

মেসি অবসরের সিদ্ধান্তের কথা লিখেছিলেন বিশ্বকাপ ফাইনালের মাত্র দুই দিন পর, ২১এ জুলাই। কিন্তু তখনও সেটি প্রকাশ করেননি। ৩১এ অগাস্ট সেই লেখা প্রকাশ করে তিনি জানালেন, বাবার সঙ্গে যা ঘটেছে, তা তাকে সিদ্ধান্তটি নিয়ে আরও নিশ্চিত করেছে।

এই কারণেই তার অবসরকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিণতি হিসাবে দেখলে গল্পের সবচেয়ে মানবিক অংশটা হারিয়ে যায়।

কখনো কখনো একজন মানুষ চলে গেলে শুধু একজন মানুষই চলে যান না। তার সঙ্গে আমাদের জীবনের একটি সময়ও চলে যায়।

মেসির কাছে হিসাবটা শুধু জয়ের ছিলো না 

আজ মেসির আর্জেন্টিনা-জীবনের পাশে সংখ্যাগুলো বসানো যায়।

একুশ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। ২০৭ ম্যাচ। ১২৫ গোল। ৬৮ অ্যাসিস্ট। ১২৫ গোল নিয়ে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে বিদায় নিচ্ছেন তিনি। আর্জেন্টিনার হয়ে ১১টি হ্যাটট্রিকও আছে তার নামের পাশে, যার সর্বশেষটি এসেছে এই ২০২৬ বিশ্বকাপেই। তিনটি বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা, ২০২১ কোপা আমেরিকা, ২০২২ বিশ্বকাপ ও ২০২৪ কোপা আমেরিকা। সঙ্গে ২০২২ ফিনালিসিমা।

বিশ্বকাপের ছয়টি আসরে ৩৪ ম্যাচ খেলেছেন। করেছেন ২১ গোল, সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ১২টি। তিনটি ভিন্ন বিশ্বকাপ ফাইনালে শুরু করা একমাত্র খেলোয়াড়ও তিনি। আর ১২৫ আন্তর্জাতিক গোলের ১১১টিই এসেছে তার বিশ্বস্ত বাঁ পা থেকে।

সংখ্যাগুলো একসঙ্গে রাখলে মেসির আর্জেন্টিনা অধ্যায়টা অবিশ্বাস্য মনে হয়। একুশ বছর আগে হাঙ্গেরির বিপক্ষে যে কিশোরের আন্তর্জাতিক অভিষেক হয়েছিলো, শেষ পর্যন্ত সেই ছেলেটিই হয়ে উঠেছে আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা খেলোয়াড় এবং ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক।

সংখ্যাগুলো একটা জিনিস প্রমাণ করে, তিনি কতটা তুখোড় ছিলেন। কিন্তু সংখ্যা আসলে তিনি কতটা পথ হেঁটেছিলেন, তার গল্প বলতে পারে না।

একসময় তাকে বলা হয়েছিলো, তিনি আর্জেন্টিনার হয়ে জিততে পারেন না। আজ সেই একই মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসের সবচেয়ে সফল প্রজন্মের অধিনায়ক। তিনি হারার পর ফিরে এসেছেন। অবসরের পর  ফিরে এসেছেন। সমালোচনার পর ফিরে এসেছেন। ২০১৪ সালের পর ২০২২ এসেছে। ২০১৬ সালের পর ২০২১ এসেছে। আর এখন, ২০২৬ সালের পর এসেছে বিদায়।

তাই তার আজকের কথাটা, ‘‘আমি সবসময়ই সবটুকু দিয়েছি’’, শুধু আত্মপক্ষ সমর্থন নয়।

এটি তার জীবনের হিসাব। ভালো সময়ের মেসি যেমন তার, তেমনি ব্যর্থতার মেসিও তার। যে মেসি ২০১৪-তে কেঁদেছিলেন, তিনিও। যে মেসি ২০১৬-তে চলে যেতে চেয়েছিলেন, তিনিও। যে মেসি ২০২২-এ বিশ্বকাপ হাতে তুলেছিলেন, তিনিও।

এই সব মেসি মিলেই একজন লিওনেল আন্দ্রেস মেসি।

আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সি এবার কার

মেসি এখনও ফুটবল খেলছেন। ইন্টার মায়ামির হয়ে তার গল্প এখনই শেষ হয়ে যাচ্ছে না। তাই এটি মেসিকে ফুটবল থেকে বিদায় নয়। এটি আর্জেন্টিনার মেসিকে বিদায়। জাতীয় দলের ১০ নম্বর জার্সির মেসিকে।

যে মেসি দুই দশক ধরে মাঠে নেমেছেন, কখনো নিজের দেশের সবচেয়ে বড় আশা হয়ে, কখনো সবচেয়ে বড় হতাশার কারণ হয়ে, আর শেষ পর্যন্ত সেই দেশটির সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্যের অন্যতম মুখ হয়ে।

এখন থেকে তিনি গ্যালারির মানুষ। তিনি নিজেই বলেছেন, বাইরে থেকে আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করবেন, ভালো সময়ে, খারাপ সময়ে, বরং খারাপ সময়ে আরও বেশি। মাঠে আর তার হাতে থাকবে না অধিনায়কের আর্মব্যান্ড। থাকবে না সেই ১০ নম্বর জার্সি।

আর ম্যাচের আগে হয়তো আর কেউ তাকে বলবে না, ‘‘লিও, আজ তোমাকেই আমাদের বাঁচাতে হবে।’’

শেষটায় রয়ে যায় ছোট্ট ছেলেটিই

পৃথিবী মেসির হিসাব করেছে গোল দিয়ে। ট্রফি দিয়ে। ব্যালন ডি’অর দিয়ে। রেকর্ড দিয়ে। কিন্তু একজন মানুষকে শুধু সংখ্যায় মাপা যায় না।

মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো এই যে তিনি আমাদের দেখিয়েছেন, পৃথিবীর সবচেয়ে প্রতিভাবান মানুষটিও হারতে পারে।

বারবার।

এতটাই যে একসময় চলে যেতে চায়। আবার ফিরে আসতে পারে। আবার চেষ্টা করতে পারে। আর শেষ পর্যন্ত এমন একটি স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, যা একসময় অসম্ভব বলে মনে হয়েছিলো।

কিন্তু মেসির গল্পের সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হয়তো অন্য জায়গায়। তিনি শুধু একজন ফুটবলার হয়ে ওঠেননি। তিনি মানুষের স্মৃতির অংশ হয়ে গেছেন। কারও শৈশবের অংশ। কারও কৈশোরের। কারও প্রথম বিশ্বকাপের। কারও প্রথম জার্সির। কারও প্রথম রাত জেগে খেলা দেখার। কারও প্রথম প্রেমেরও।

এই কারণেই মেসির অবসর আমাদের কাছে একটু অদ্ভুত লাগে। কারণ কোনো খেলোয়াড়কে বয়স বাড়তে দেখা মানে শুধু তার বয়স বাড়তে দেখা নয়।

যে খেলোয়াড়কে আমরা প্রথম দেখেছিলোাম শিশু হয়ে, তাকে আজ বিদায় নিতে দেখার অর্থ হলো, আমরাও আর সেই শিশু নই। আমরাও বড় হয়ে গেছি।

যে ছেলেটা একসময় মেসির গোল দেখে লাফিয়ে উঠত, সে হয়তো এখন চাকরি করে।

যে কিশোর ২০১৪ বিশ্বকাপ দেখে কেঁদেছিলো, সে হয়তো এখন নিজের পরিবার নিয়ে খেলা দেখে।

যে মানুষ ২০২২-এর ফাইনালে মেসিকে বিশ্বকাপ তুলতে দেখেছিলো, সে হয়তো তখনকার মতো আর কোনোভাবেই চিৎকার করে উঠতে পারে না।

কারণ মাঝখানে জীবন চলে গেছে। কেউ দূরে চলে গেছে। কেউ আর নেই। কিছু বন্ধুত্ব বদলে গেছে। কিছু ভালোবাসা শেষ হয়েছে। আর আমরাও বদলে গেছি।

তাই মেসির জাতীয় দল থেকে অবসরটা যেন শুধু একজন ফুটবলারের অবসর নয়। এটা নিজের পুরোনো স্মৃতির বাক্সটাও একটু গুছিয়ে রাখার মতো।

সেই পুরোনো জার্সি। সেই পুরোনো বিশ্বকাপ। সেই রাতগুলো। সেই মানুষগুলো, যারা তখন পাশে বসে খেলা দেখত। আর সেই ছোট্ট আমরা, যে বিশ্বাস করত, মেসি বল পায়ে নিলে কিছু একটা হবেই।

হয়তো এ কারণেই তার বিদায়ে এতটা মন খারাপ হয়।

কারণ আমরা শুধু মেসিকে দেখিনি। আমরা মেসির সঙ্গে বড় হয়েছি।

৪৩ দিনে হয়তো একটি যুগের শেষ

১৯এ জুলাই, নিউ জার্সির ফাইনালে স্পেনের কাছে হারলো আর্জেন্টিনা। দুই দিন পর, ২১ জুলাই, মেসি নিজের বিদায়ের কথাগুলো লিখে ফেললেন। 

৮ই অগাস্ট মারা গেলেন হোর্হে মেসি।

৩১এ অগাস্ট, সেই লেখাটিই প্রকাশ করে মেসি জানালেন, আর্জেন্টিনার হয়ে তার পথচলা শেষ।

মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একটি বিশ্বকাপ ফাইনাল হারানো, বাবাকে হারানো এবং জাতীয় দলের জার্সি তুলে রাখার সিদ্ধান্ত, একজন মানুষের জীবনে একসঙ্গে অনেক বেশি বিদায়।

আর কারণ মেসি নিজেই জানিয়েছেন, ২১এ জুলাই নেওয়া সেই সিদ্ধান্তে হোর্হের মৃত্যুর পর তিনি আরও নিশ্চিত হয়েছেন। 

কারণ ২০২৬-এর বিশ্বকাপের পর মেসির ভেতরে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিলো, বাবার মৃত্যু সেটিকে আরও গভীর করেছে। আর সেই শূন্যতার মধ্যেই তিনি বুঝেছেন, একটি অধ্যায় সত্যিই শেষ হয়ে গেছে।

হয়তো তাই তার বিদায়ী কথার শেষটাও এত সহজ।

এত বড় ক্যারিয়ারের পরেও তিনি শেষ পর্যন্ত ফিরে গেলেন সেই পরিচয়েই, যেটি তার কাছে সবচেয়ে আপন।

“ঈশ্বরকে ধন্যবাদ আমাকে আর্জেন্টাইন বানানোর জন্য।”

রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটি একদিন বাড়ি ছেড়ে বেরিয়েছিলো ফুটবল খেলতে।

তারপর সে পৃথিবী জিতেছে। কিন্তু এত বড় হয়ে যাওয়ার পরও, এত ট্রফি, এত রেকর্ড, এত আলো পেরিয়েও, তার গল্পের শুরুটা বদলায়নি।

একটি ছেলে। একটি বল। একজন মা, যিনি পরিবারের অন্য সন্তানদের সঙ্গে থেকে সেই স্বপ্নটাকে সম্ভব করেছিলেন। একজন বাবা, যিনি কাজ শেষে ছেলেকে অনুশীলনে নিয়ে যেতেন।

আর একটি শহর, রোজারিও।

হয়তো মেসির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার কোনো ট্রফি নয়। হয়তো সেটি এই যে, পৃথিবীর কোটি মানুষ আজও সেই ছোট্ট ছেলেটিকে নিজেদের কোনো এক পুরোনো স্মৃতির মধ্যে খুঁজে পায়।

আমরাও পাই। তাই মেসি আজ আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখলেও, আমাদের শৈশব থেকে তাকে খুলে রাখার কোনো উপায় নেই। কারণ কোনো কোনো মানুষ শুধু আমাদের সময়ের অংশ হন না। তারা  আমাদের বড় হয়ে ওঠার অংশ হয়ে যান।

আর রোজারিওর সেই ছোট্ট ছেলেটার সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা আমারা হয়তো আজ একটু চুপচাপ নিজেদের স্মৃতির ব্যাগটা গুছিয়ে রাখছি।