সময় যেন সত্যিই ফুরিয়ে এসেছে। একের পর এক অধ্যায় শেষ হয়। তবু কিছু বিদায় মেনে নেওয়া কঠিন। লিওনেল মেসির জন্যও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেই বিদায়ের মুহূর্ত এসে গেল।
৩৯ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জার্সি তুলে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মেসি। দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে জার্সি গায়ে তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের আবেগের অংশ হয়ে উঠেছিলেন, সেই অধ্যায়েরও এবার সমাপ্তি।
মেসি এখন খেলছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ইন্টার মায়ামিতে। ক্লাবটির সঙ্গে তার চুক্তি ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে আর্জেন্টিনার হয়ে আর মাঠে নামবেন না তিনি।
সোমবার ইনস্টাগ্রামে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মেসি লিখেছেন, “সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, অধ্যায়গুলো একে একে শেষ হচ্ছে। আর এই অধ্যায়ের সমাপ্তি আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দিচ্ছে।”
কিছুদিন আগেই অবশ্য নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানিয়েছিলেন মেসি। চলতি মাসের শুরুতে তার বাবা হোর্হে মেসির মৃত্যুর পর ফুটবল নিয়েও নতুন করে ভাবতে শুরু করেন তিনি।
বাবাকে স্মরণ করে আবেগঘন এক বার্তায় মেসি বলেছিলেন, “কীভাবে এগিয়ে যাবো, জানি না। আগে শুধু ফুটবল খেলতাম। এখন সত্যিই বুঝতে পারছি না, আর কত দিন এটা চালিয়ে যেতে পারব।”
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেললেন তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির পথচলা শুরু হয়েছিল দুই দশকেরও বেশি আগে। সেই পথের শুরুতে ছিলো হতাশা, সমালোচনা আর অপূর্ণতার দীর্ঘ গল্প। কিন্তু শেষটা হলো এমনভাবে, যা হয়তো একসময় কল্পনাও করতে পারেননি তিনি।
আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭ ম্যাচে ১২৫ গোল করেছেন মেসি। জাতীয় দলের হয়ে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা এবং সবচেয়ে বেশি গোল করা খেলোয়াড় এখন তিনিই। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে বার্সেলোনা, পিএসজি, ইন্টার মায়ামি ও আর্জেন্টিনার হয়ে তার গোলসংখ্যা ৯২১।
তবে সংখ্যার চেয়েও বড় হয়ে আছে তার অর্জনের গল্প।
২০২১ সালের ১১ই জুলাই। মারাকানায় কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে প্রথমবারের মতো সিনিয়র পর্যায়ে আর্জেন্টিনার হয়ে কোনো বড় আন্তর্জাতিক ট্রফি জেতেন মেসি।
৩৪ বছর বয়সী মেসি তখন যেন আবেগ ধরে রাখতে পারছিলেন না। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে মাঠে লুটিয়ে পড়েছিলেন। সতীর্থরা তকে তুলে নিয়ে আকাশে ছুড়ে উদ্যাপন করেছিলেন। চার গোল করে সেই আসরের সেরা খেলোয়াড়ও হয়েছিলেন তিনি।
তিন বছর পর আবারও কোপা আমেরিকা জিতলো আর্জেন্টিনা। অথচ এমন দিন হয়তো একসময় মেসির নিজের কাছেও অসম্ভব মনে হয়েছিল।
কারণ এর আগে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরও নিয়েছিলেন তিনি। বড় টুর্নামেন্টে বারবার ব্যর্থতার পর প্রশ্ন উঠেছিল, এত বড় তারকা হয়েও কেন দেশের হয়ে কিছু জিততে পারছেন না মেসি?
সর্বকালের সেরা ফুটবলার কে, এই বিতর্কেও তার বিপক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল আর্জেন্টিনার হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতার বিষয়টি।
তারপর এলো ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ।
ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালটি যেন মেসির ক্যারিয়ারের পুরো গল্পের প্রতিচ্ছবি। ৩-৩ গোলে সমতায় শেষ হওয়া ম্যাচটি গড়াল টাইব্রেকারে। মেসি করলেন দুটি গোল, টাইব্রেকারেও নিজের শট থেকে গোল করলেন। শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বকাপ জিতলো আর্জেন্টিনা।
মেসি পেলেন টুর্নামেন্টসেরার পুরস্কার। সাত গোল করেছিলেন তিনি, আর নকআউট পর্বের প্রতিটি ধাপেই গোল করেছিলেন।
যে বিশ্বকাপ ট্রফিটা তার ক্যারিয়ারে এতদিন অধরা ছিল, সেটিও শেষ পর্যন্ত নিজের করে নিলেন মেসি।
বার্সেলোনা ছাড়ার পরও থামেনি তার সাফল্যের গল্প। পিএসজি ও ইন্টার মায়ামিতে খেলেও দুটি ব্যালন ডি’অর জিতেছেন তিনি। সব মিলিয়ে তার ব্যালন ডি’অরের সংখ্যা এখন আট।
২০২৩ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ ব্যালন ডি’অর জেতার সময় মেসি বলেছিলেন, “আমি যে ক্যারিয়ার পেয়েছি, যে অর্জন করেছি, ইতিহাসের সেরা দলের অংশ হতে পেরেছি, এসব কখনো কল্পনাও করতে পারিনি।”
২০২৬ বিশ্বকাপও ছিল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। বয়স ৩৯ হলেও মাঠে তার উপস্থিতি ছিলো আগের মতোই আলোচনার কেন্দ্রে।
টুর্নামেন্টে আট গোল করে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২১। পরে ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে ২২ গোল করে তাকে ছাড়িয়ে যান।
শেষ বিশ্বকাপটা অবশ্য মেসির জন্য সুখের হয়নি। ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে শিরোপা হাতছাড়া করে আর্জেন্টিনা। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে মেসির পারফরম্যান্স আবারও মনে রাখার মতো একটি অধ্যায় হয়ে থাকলো।
শেষ পর্যন্ত মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের গল্পটা তাই শুধু গোল, রেকর্ড কিংবা ট্রফির গল্প নয়। এটি অপেক্ষার গল্প, ব্যর্থতার গল্প, ফিরে আসার গল্প এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন পূরণের গল্প।
একসময় যে মেসিকে আর্জেন্টিনার জার্সিতে শিরোপা এনে দিতে না পারার জন্য সমালোচিত হতে হয়েছিল, সেই মেসিই শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ হাতে দাঁড়িয়ে দেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় নায়ক হয়ে উঠলেন।
এবার সেই গল্পের শেষ পাতা।
বিদায়, মেসি।