ডারউইনে মিরাজের অলরাউন্ড মাস্টারক্লাস ও অজি শিবিরে টানা নাটকীয়তা

চারজন বিশ্বমানের বোলার—যাদের প্রত্যেকের আন্তর্জাতিক টেস্ট ঝুলিতে ৩০০-এর বেশি উইকেট রয়েছে—সেই ভয়ংকর বোলিং চতুষ্টয়ের বিপক্ষে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৪২৬ রানের এক বিশাল পাহাড়ে চড়েছে। 

আর এই মহাকাব্যিক অর্জনের মূল কাণ্ডারি অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। ব্যাট হাতে দায়িত্বশীল ৬৫ রানের প্রতিরোধ গড়ে তোলার পর, বল হাতে অজি ব্যাটিংয়ের মূল স্তম্ভ স্টিভ স্মিথকে নিজের ফাঁদে ফেলে পুরো ম্যাচটি বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণে এনে দিয়েছেন তিনি।

ব্যাট হাতে সংকট সামলে মিরাজের স্নায়ুচাপ জয়ের গল্প

দল যখন ৩০৬ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে, ঠিক তখন কঠিন মানসিক পরিস্থিতি নিয়ে ক্রিজে এসেছিলেন মিরাজ। তার মাঠে নামার কিছুক্ষণ পরেই অভিজ্ঞ মুশফিকুর রহিম সাজঘরে ফিরে গেলে বাংলাদেশ হঠাৎ করেই ৩০৮ রানে ৬ উইকেটে হারিয়ে চাপে পড়ে যায়। 

একের পর এক উইকেট হারিয়ে যখন অজিরা বাংলাদেশকে দ্রুত অলআউট করার স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই দেখা মিলল মিরাজের স্নায়ুচাপ, জয় ও দায়িত্বশীলতার এক অনন্য নমুনা।

অস্ট্রেলিয়ান ফাস্ট বোলারদের একের পর এক বাউন্সার আর তীক্ষ্ণ শটগুলো তিনি সামলেছেন চরম ধৈর্যের সাথে। একপ্রান্তে বুদ্ধিদীপ্তভাবে স্ট্রাইক নিজের কাছে রেখে টেলএন্ডারদের সাথে ছোট ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে তোলেন। 

অজি বোলারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত করার সুপরিকল্পিত কৌশল মিরাজ বাস্তবায়ন করেন দুর্দান্তভাবে। তার এই বীরত্বপূর্ণ ৬৫ রানের লড়াইয়ের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক লিড নিশ্চিত করতে করে।

নতুন মাইলফলকে মিরাজ 

টেস্ট ক্রিকেটে ৭ নম্বর বা তার নিচের পজিশনে ব্যাটিংয়ে নেমে বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোচ্চ রানের একক রেকর্ড এখন মেহেদী হাসান মিরাজের দখলেই।

অভিজাত ক্লাবেও প্রবেশ করেছেন তিনি। টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে ২ হাজার রান ও ২০০ উইকেটের বিরল অলরাউন্ড ডাবল অর্জন করা ক্রিকেটারদের তালিকায় রবিচন্দ্রন অশ্বিন ও রবীন্দ্র জাদেজার মতো মহাতারকাদের পাশে মিরাজও নিজের নাম স্বগৌরবে উজ্জ্বল করেছেন।

পরিকল্পিত বোলিং, স্মিথের পতন ও ডারউইনের রূপকথা

প্রথম ইনিংসে ২২৮ রানে পিছিয়ে থেকে নিজেদের দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামা অস্ট্রেলিয়াকে শুরু থেকেই বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে তীব্র চাপে রাখে বাংলাদেশ। 

মিরাজ বোলিং আক্রমণে আসার পর অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এবং উইকেটরক্ষক লিটন দাস ফিল্ড থেকেই টানা চিৎকার করে তাকে উৎসাহ ও নির্দেশনা দিতে থাকেন—"রানের চিন্তা করবি না, ডট বল দিয়ে ডট বল দিয়ে রান ছাড়া আটকে রাখ!"

বাংলাদেশ দলের কৌশলটি ছিল একবারে নিখুঁত—বিপজ্জনক ব্যাটার স্টিভ স্মিথকে কোনো রান না দিয়ে চরম অস্থির ও অধৈর্য করে তোলা। শান্ত-মিরাজদের এই মনস্তাত্ত্বিক কৌশলে চমৎকার কাজ হয়। 

রানের জন্য হাঁসফাঁস করতে থাকা স্মিথ সেই অতিরিক্ত চাপের মুখেই শেষ পর্যন্ত বড় ভুলটি করে বসেন। 

মিরাজের নিখুঁত ঘূর্ণি ও ফ্লাইট বুঝতে ভুল করে তার হাতেই একটি সহজ রিটার্ন ক্যাচ তুলে দিয়ে ৪ ৪ রানে সাজঘরে ফেরেন স্মিথ। এটি কেবল এই ম্যাচেরই সেরা ব্রেকথ্রু ছিল না, বরং মিরাজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা উইকেটগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

ডারউইনের তৃতীয় দিনে নাটকের ঘনঘটা

ম্যাচের ফলাফল ও কৌশলের পাশাপাশি ডারউইনের তৃতীয় দিনটি ছিল নানা অভাবনীয় ও ক্রিকেটীয় নাটকে ভরপুর। অজি ওপেনার ট্রাভিস হেড আউট হয়ে মাঠ ছাড়ার মুহূর্তে চরম হতাশা ধরে রাখতে পারেননি। 

রাগে ও হতাশায় মাঠ ছাড়ার সময় ঝরে পড়া বেইলগুলো নিজ হাতে কুড়িয়ে নিয়ে আবার স্টাম্পের ওপর বসিয়ে দেন—যা লাল বলের ক্রিকেটের ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল এক দৃশ্য বলে বিবেচিত হচ্ছে।

স্মিথের আগাম রিভিউ নেওয়ার বিরল ঘটনাও ঘটেছে তৃতীয় দিনে। পেসার এবাদত হোসেনের বলে আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউট দেওয়ার সংকেত পুরোপুরি শেষ করার আগেই স্মিথ তড়িঘড়ি করে রিভিউ চেয়ে বসেন। 

বিষয়টি মাঠে উপস্থিত সবাইকে চমকে দেয়। ধারাভাষ্য কক্ষে থাকা অজি সাবেক ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নারও বিষয়টি মেনে নিতে না পেরে সরাসরি বলে ওঠেন, “স্মিথ এটা কোনোভাবেই করতে পারেন না!”

ব্যাট ও বল হাতে মিরাজের এই অলরাউন্ড মাস্টারক্লাসের সামনে টেস্টের তৃতীয় দিন শেষে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ এলোমেলো ও হতাশায় ডুবিয়েছে বাংলাদেশ। মারারা ওভালের এই মাঠেই বাংলাদেশ এখন অজিদের বিপক্ষে ওদের মাঠে ঐতিহাসিক এক টেস্ট জয়ের শক্ত ভিত তৈরি করে নিয়েছে।