ফুটবল মাঠে হাজার গোলের মাইলফলকের দিকে ছুটছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। আর মাঠের বাইরে জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিও এবার পূর্ণ হলো। দীর্ঘ ১০ বছরের সম্পর্কের পর অবশেষে বিয়ে করেছেন পর্তুগিজ ফুটবল তারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও মডেল-ইনফ্লুয়েন্সার জর্জিনা রদ্রিগেজ।
১১ই অগাস্ট পর্তুগালের উপকূলীয় শহর ক্যাসকাইসে এক ঘরোয়া অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিয়ে করেন তারা। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তাদের পাঁচ সন্তানও।
বিয়ের খবরটি অবশ্য কোনো বড় আয়োজন বা দীর্ঘ ঘোষণার মাধ্যমে আসেনি। রোনালদো ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করেছেন দুটি হাতের ছবি- একটি সম্ভবত তার, আরেকটি জর্জিনার। দুজনের হাতেই দেখা যাচ্ছে বিয়ের আংটি। ক্যাপশনে শুধু লেখা, “C❤️G.”
ব্যস, এতটুকুতেই যেন ঝড় উঠেছে সামাজিক মাধ্যমে। পোস্টটি প্রকাশের মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে ৩০ লাখের বেশি লাইক পড়ে।
পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম এরই মধ্যে বিয়েটিকে বলছে ‘বছরের বিয়ে’। তবে রোনালদো ও জর্জিনার গল্পটা আসলে কোনো রাজকীয় অনুষ্ঠানের চেয়েও মজার। কারণ তাদের প্রথম দেখা হয়েছিল কোনো ফুটবল স্টেডিয়ামে নয়, বরং মাদ্রিদের একটি গুচি ব্র্যান্ড শপে।
২০১৬ সালে তখন রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে খেলছেন রোনালদো। আর জর্জিনা সেই দোকানে বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করতেন। জর্জিনার ভাষায়, প্রথম দেখাতেই তাদের মধ্যে এমন এক অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, যেন তারা একে অপরকে অনেক আগে থেকেই চেনেন।
সেই পরিচয় ধীরে ধীরে প্রেমে গড়ায়। এরপর কেটে গেছে প্রায় এক দশক। রোনালদোর ফুটবল ক্যারিয়ারে এসেছে অসংখ্য সাফল্য, ক্লাব বদলেছে, দেশ-বিদেশে নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। আর এই পুরো যাত্রায় জর্জিনা ছিলেন তার পাশে।
তাদের সংসারে এখন পাঁচ সন্তান। ২০২২ সালে অবশ্য ভয়াবহ এক দুঃখের মধ্য দিয়েও যেতে হয়েছে এই পরিবারকে। নবজাতক ছেলে সন্তানকে হারিয়েছিলেন তারা। সেই শোকও দুজন একসঙ্গে সামলেছেন।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা অবশ্য গত বছরই সামনে চলে এসেছিল। ২০২৫ সালের ১১ই অগাস্ট জর্জিনা একটি বিশাল হীরার আংটির ছবি দিয়ে বাগদানের ঘোষণা দেন। ক্যাপশনে লিখেছিলেন, “Yes I do. In this and in all my lives.”
আংটিটি নিয়েও তখন কম আলোচনা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, হীরাটি ৩০ থেকে ৪০ ক্যারেটের হতে পারে এবং এর দাম ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
রোনালদোও অবশ্য বিয়ের পরিকল্পনার কথা আগে জানিয়েছিলেন। পিয়ার্স মরগানের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, বিশ্বকাপের পর বিয়ের পরিকল্পনা আছে—হাসতে হাসতে যোগ করেছিলেন, “একটা ট্রফি নিয়ে।”
তবে বিয়েটা শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের সাফল্য নিয়ে হয়নি। বরং বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের পরই এসেছে জীবনের আরেক বড় আনন্দ।
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিলো রোনালদোর ক্যারিয়ারের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। পুরুষদের বিশ্বকাপে ছয়টি আসরে খেলা প্রথম ফুটবলারও হয়েছেন তিনি। তবে স্পেনের কাছে পর্তুগালের শেষ ষোলোতে হারের পর আবেগঘন বিদায় নিতে হয় তাকে।
রোনালদো জানিয়েছেন, এটিই তার শেষ বিশ্বকাপ। তবে জাতীয় দলের হয়ে আর খেলবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত এখনই নিচ্ছেন না। ২৩ বছর পর্তুগালকে প্রতিনিধিত্ব করে তিনি জিতেছেন তিনটি বড় শিরোপা, যার মধ্যে ২০১৬ সালের ইউরো তার কাছে বিশ্বকাপ জয়ের সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এখন তার বয়স ৪১। পরবর্তী বড় আন্তর্জাতিক আসর ২০২৮ সালের ইউরোতে খেললে বয়স হবে ৪৩।
তবে ফুটবল নিয়ে ভবিষ্যত যা-ই হোক, ব্যক্তিগত জীবনে রোনালদোর সামনে এখন নতুন অধ্যায়। আল নাসরের হয়ে নতুন মৌসুমের প্রস্তুতির পাশাপাশি তিনি এবার স্বামী হিসেবেও নতুন পরিচয় পেলেন।
আর জর্জিনার সঙ্গে তার সম্পর্কের সবচেয়ে সুন্দর ব্যাপারটি সম্ভবত এখানেই। বিয়ের আগে এক সাক্ষাৎকারে রোনালদো বলেছিলেন, বিয়ের পর তাদের সম্পর্কে মৌলিক কোনো পরিবর্তন আসবে না। এটি শুধু জীবনের একটি সুন্দর নতুন অধ্যায়।
গুচির দোকানে শুরু হওয়া সেই পরিচয় তাই এক দশক পর এসে পৌঁছালো বিয়ের মঞ্চে।
ফুটবল মাঠে রোনালদো যত রেকর্ডই গড়ুন না কেন, এই গল্পটির শুরু কিন্তু কোনো গোল, ট্রফি কিংবা স্টেডিয়াম থেকে নয়- একটি গুচি দোকানে, একজন বিক্রয়কর্মী আর একজন ফুটবল তারকার প্রথম দেখায়।
আর ১০ বছর পর সেই গল্পের নতুন নাম- স্বামী ও স্ত্রী, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও জর্জিনা রদ্রিগেজ।