বিশ্বকাপে মেসিকে হত্যার ষড়যন্ত্র: নিরাপত্তা নথি ফাঁস

চিন্তা করুন তো, মেসি যখন আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবছিলেন কীভাবে দলকে জেতাবেন অথবা কীভাবে গোল করবেন।

কিন্তু মাঠের বাইরে তখন তাকে ঘিরেই তৈরি হয়েছিল ভয়ংকর এক পরিস্থিতি। একজন ফোন করে স্টেডিয়ামে হামলার হুমকি দিচ্ছিলেন, হাতে গ্রেনেড ও রাইফেল থাকার কথা বলছিলেন এবং সরাসরি মেসিকে মেরে ফেলারও হুমকি দিচ্ছিলেন।

শুধু মেসিই নন, একই বিশ্বকাপে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর হোটেলে ঢুকে তার সঙ্গে লিফটে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন এক ব্যক্তি। ম্যাচের সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে রেফারিদের পাঠানো হয়েছিল হাজারো হুমকির বার্তা। কোথাও আবার স্টেডিয়ামে বোমা রাখার খবর পেয়ে শুরু হয়েছিল তল্লাশি।

যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশের ফাঁস হওয়া একটি নিরাপত্তা নথিতে বিশ্বকাপ চলাকালে পাওয়া এসব হুমকির বিস্তারিত তথ্য উঠে এসেছে। স্পেনের সংবাদমাধ্যম ইনফরমেশন ডট ইএসের বরাত দিয়ে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য সান।

নথি অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা-জর্ডান ম্যাচের আগে, ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে এক ব্যক্তি স্টেডিয়ামে হামলার হুমকি দেন। 

তিনি দাবি করেন, আরও দুজনকে সঙ্গে নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢুকবেন এবং তাদের কাছে থাকবে হ্যান্ড গ্রেনেড এবং এআর-১৫ রাইফেল। পুলিশ ও খেলোয়াড়দের ওপর হামলার পাশাপাশি মেসিকে হত্যার হুমকিও দেন তিনি।

এরপর আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের আগেও মেসিকে লক্ষ্য করে হুমকি আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক ব্যক্তি দাবি করেন, শরীরে চারটি বোমা বেঁধে আটলান্টার স্টেডিয়ামে ঢুকবেন তিনি। তার কথিত লক্ষ্য ছিল মেসি।

ম্যাচ চলার সময় পুলিশকে ফোন করে বলা হয়, দর্শকদের বসার জায়গার ময়লার ঝুড়িতে তিনটি বোমা রাখা হয়েছে। খবর পেয়ে স্টেডিয়ামে তল্লাশি চালানো হয়। বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও প্রশিক্ষিত কুকুরও ব্যবহার করা হয়।

মেসির মতো রোনালদোকেও ঘিরে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ফিফার এক কর্মী পুলিশকে জানান, এক ব্যক্তি রোনালদো কোথায় থাকছেন, সেই তথ্য জানার চেষ্টা করেছিলেন। পরে আরেক ব্যক্তি রোনালদোর হোটেলে ঢুকে তার সঙ্গে লিফটে ওঠার চেষ্টা করেন। পুলিশ তাকে থামালে তিনি দাবি করেন, শুধু রোনালদোর সঙ্গে সেলফি তুলতে চেয়েছিলেন।

শুধু খেলোয়াড় নয়, হুমকির মুখে ছিলেন রেফারিরাও। আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের পর ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেতেক্সিয়ের হোয়াটসঅ্যাপে ছয় হাজারের বেশি হুমকিমূলক বার্তা আসে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিও রেফারি উইলি দেলাজোদও মৃত্যুর হুমকি পেয়েছেন।

মাঠের পারফরম্যান্সের কারণেও কয়েকজন খেলোয়াড় হুমকির শিকার হন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে এরলিং হালান্ডকে পাস না দেওয়ায় নরওয়ের আলেকজান্ডার সোরলথ ও তার স্ত্রীকে মৃত্যুর হুমকি দেওয়া হয়। কলম্বিয়ার জন হামিন্তন কামপাজ পেনাল্টি মিস করার পরও একই ধরনের হুমকি পান।

এ ধরনের ঘটনা ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের ভয়াবহ স্মৃতিও সামনে আনে। ওই বিশ্বকাপে আত্মঘাতী গোল করার পর দেশে ফিরে হত্যার শিকার হয়েছিলেন কলম্বিয়ার ফুটবলার আন্দ্রেস এসকোবার।

বিশ্বকাপের সময় কিলিয়ান এমবাপ্পেকেও ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হয়। ফ্রান্সের কাছে হারের পর প্যারাগুয়ের কিছু সমর্থক এমবাপ্পের নাম লেখা কুশপুত্তলিকা পোড়ান। তাকে লক্ষ্য করে বর্ণবাদী স্লোগানও দেওয়া হয়। প্যারাগুয়ের এক সিনেটরও এমবাপ্পেকে নিয়ে আক্রমণাত্মক মন্তব্য করেন।

ইংল্যান্ডের মিডিয়া সেন্টারেও নিরাপত্তা ভাঙার ঘটনা ঘটে। এক ব্যক্তি হাতে রেঞ্চ নিয়ে সেখানে ঢুকে চিৎকার শুরু করেন। এরপর নিরাপত্তা আরও বাড়ানো হয়। তৈরি করা হয় তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বসানো হয় কংক্রিটের ব্যারিয়ার ও অ্যান্টি-স্নাইপার স্ক্রিন। ড্রোন হামলা ঠেকাতে নো-ফ্লাই জোনও রাখা হয়। মোতায়েন করা হয় বিপুলসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ।

ফাঁস হওয়া এই নিরাপত্তা নথি থেকে বোঝা যায়, বিশ্বকাপের সময় মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি মাঠের বাইরেও বড় ধরনের লড়াই চলছিল। বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের নিরাপদ রাখতে আয়োজকদের মোকাবিলা করতে হয়েছে একের পর এক হুমকি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি।