যে ৫ ফুটবলার ২০২৬ বিশ্বকাপে হয়ে গেছেন সোশ্যাল মিডিয়া সুপারস্টার

একসময় বিশ্বকাপের নায়ক হওয়ার মানে ছিল পরদিন সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় জায়গা পাওয়া। টেলিভিশনে বিশ্লেষণ চলত, পোস্টার ছাপা হতো, আর স্টেডিয়ামে গ্যালারি মুখর থাকত তাঁর নামে।

এখন সেই গল্প বদলে গেছে।

এখন একটি গোল, একটি অবিশ্বাস্য সেভ, একটি আবেগঘন উদযাপন কিংবা ড্রেসিংরুম থেকে পোস্ট করা একটি সাধারণ ছবিও মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় কোটি মানুষের মোবাইলে। মাঠের পারফরম্যান্স আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন হাত ধরাধরি করে এগোচ্ছে।

২০২৬ বিশ্বকাপেও এমন অনেক ফুটবলার ছিলেন, যারা শুধু নিজেদের খেলার জন্য নয়, ব্যক্তিত্ব, সরলতা আর মানুষের সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার ক্ষমতার জন্যও রাতারাতি হয়ে উঠেছেন সোশ্যাল মিডিয়ার নতুন সুপারস্টার।

অবশ্য লিওনেল মেসি, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো কিংবা নেইমারের মতো তারকাদের কথা আলাদা। তাদের কোটি কোটি অনুসারী ছিল বিশ্বকাপের অনেক আগেই। কিন্তু এবারের আসরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন এমন কয়েকজন, যাদের জনপ্রিয়তা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বিস্ফোরণের মতো বেড়ে গেছে।

আর্লিং হালান্ড: মাঠে ভয়ংকর, পর্দার ওপারে একেবারে সাধারণ মানুষ

ছয় ফুট পাঁচ ইঞ্চি লম্বা এই নরওয়েজিয়ান স্ট্রাইকারকে মাঠে দেখে অনেক সময় ভাইকিং যোদ্ধার মতো মনে হয়। কিন্তু মাঠের বাইরে তিনি যেন পাশের বাড়ির সহজ সরল এক তরুণ।

ম্যাচ জিতেই ড্রেসিংরুম থেকে ইনস্টাগ্রামে ছবি পোস্ট করা, স্ন্যাপচ্যাটে নিজের দৈনন্দিন মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়া কিংবা বিমানে সংরক্ষণ করা একটি র‍্যাকুন নিয়ে ভ্রমণের মতো অদ্ভুত সব ঘটনা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

অনেক তারকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে পেশাদার প্রতিষ্ঠান। কিন্তু হালান্ডের পোস্টগুলোতে সেই সাজানো ভাব নেই। তিনি যা অনুভব করেন, সেটাই প্রকাশ করেন। আর সেই স্বতঃস্ফূর্ততাই মানুষকে টেনে নিয়েছে।

মাত্র এক মাসে তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী বেড়েছে প্রায় দুই কোটি ৯০ লাখ। বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার আগেই তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ৭ কোটির সীমা পেরিয়ে গেছে।

ভোজিনহা: শুধু গোলই বাঁচাননি, বদলে দিয়েছেন একটি দেশের পরিচয়

বিশ্বকাপের সবচেয়ে সুন্দর গল্পগুলোর একটি এসেছে কেপ ভার্দে থেকে।

৪০ বছর বয়সি গোলরক্ষক ভোজিনহা প্রথম ম্যাচেই স্পেনের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে একের পর এক অবিশ্বাস্য সেভ করেন। তাঁর দৃঢ়তায় ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়। ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে বিশ্বকে চমকে দেয়।

কিন্তু মাঠের বাইরের গল্পটি আরও আবেগের।

অনেক চেষ্টা করার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পান তাঁর মা। ছেলের বিশ্বকাপের খেলা তিনি নিজের চোখে দেখতে পারেন। ভোজিনহার কাছে সেটাই ছিল সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

স্পেনের বিপক্ষে সেই ম্যাচ শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী পাঁচ লাখ থেকে বেড়ে প্রায় ৫০ লাখে পৌঁছে যায়। এখন সেই সংখ্যা প্রায় তিন কোটির কাছাকাছি।

হাসতে হাসতে ভোজিনহা বলেছিলেন, বিশ্বকাপের আগে অনেক মানুষ মানচিত্রে কেপ ভার্দে কোথায় আছে, সেটিই দেখাতে পারত না। এখন অন্তত সবাই দেশটির নাম জানে।

জুড বেলিংহ্যাম: মাঠের নায়ক, গ্যালারির প্রিয় মুখ

ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ যাত্রা সেমিফাইনালে থেমে গেছে। কিন্তু জুড বেলিংহ্যামের জনপ্রিয়তার যাত্রা থামেনি।

মাত্র ২৩ বছর বয়সেই তিনি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ফুটবলার। মাঠে তাঁর নেতৃত্ব, গোল করার ক্ষমতা আর অসাধারণ পরিশ্রম যেমন সমর্থকদের মুগ্ধ করেছে, তেমনি মাঠের বাইরেও তাঁর ব্যক্তিত্ব মানুষকে আকৃষ্ট করেছে।

ইংল্যান্ডের সমর্থকেরা তাঁর জন্য গেয়ে ওঠেন বিটলসের বিখ্যাত গান হে জুড। এই বিশ্বকাপে সেই দৃশ্য বারবার দেখা গেছে।

গত এক মাসেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারী বেড়েছে প্রায় ৯০ লাখ। তবে শুধু ফুটবল নয়, নিজের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা কথা বলার সাহসও তাঁকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে।

লামিন ইয়ামাল: এক কিশোর যার বড় হওয়া দেখছে পুরো পৃথিবী

মাত্র ১৯ বছর বয়সেই লামিন ইয়ামাল এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছেন, যেখানে যেতে অনেকের পুরো ক্যারিয়ার লেগে যায়।

স্পেনের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তিনি সমান জনপ্রিয়।

তাঁর ইনস্টাগ্রামে যেমন আছে ট্রফি জয়ের ছবি, তেমনি আছে পরিবারের সঙ্গে কাটানো সাধারণ মুহূর্ত। বিশেষ করে ছোট ভাই কেইনেকে নিয়ে তাঁর নানা ভিডিও লাখো মানুষের মন জয় করেছে।

বিশ্বকাপ চলাকালে অনেক সময় দেখা গেছে, ছোট ভাইয়ের হাত ধরে স্টেডিয়ামের ঘাসে হাঁটছেন ইয়ামাল। কখনও আবার ভাইয়ের গলফ খেলার ব্যর্থ চেষ্টা দেখে হেসে উঠছেন। এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাঁকে আরও আপন করে তুলেছে সমর্থকদের কাছে।

বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের সামনে যখন আর্জেন্টিনা, তখন আরেকটি ছবি নতুন করে আলোচনায় আসে। ২০০৭ সালে ইউনিসেফের একটি ফটোশুটে শিশু ইয়ামালকে কোলে নিয়েছিলেন লিওনেল মেসি। প্রায় দুই দশক পরে সেই শিশুই বিশ্বকাপের ফাইনালে মেসির প্রতিপক্ষ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ছবিকে বলা হচ্ছে সময়ের সবচেয়ে সুন্দর বৃত্তগুলোর একটি।

টিম পেইন: ভাইরাল হয়েছিলেন একটি ভালোবাসার অভিযানে

সব ভাইরাল গল্প গোল কিংবা জাদুকরী পারফরম্যান্স দিয়ে শুরু হয় না।

নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার টিম পেইনের গল্পটি একেবারেই অন্য রকম।

বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনার এক কনটেন্ট নির্মাতা ভ্যালেন স্কারসিনি খুঁজে বের করেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে কম পরিচিত ফুটবলারকে। তাঁর পছন্দ ছিল টিম পেইন।

এরপর তিনি নিজের অনুসারীদের অনুরোধ করেন, সবাই যেন পেইনের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গিয়ে তাঁকে অনুসরণ করেন, মন্তব্য করেন এবং ভালোবাসা জানান।

অবিশ্বাস্যভাবে, সেই আহ্বান কাজ করে।

মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে পাঁচ হাজারেরও কম অনুসারী থাকা পেইনের ইনস্টাগ্রামে যোগ হয় প্রায় ৫৮ লাখ নতুন অনুসারী। এক লহমায় তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বকাপের সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত ভাইরাল তারকাদের একজন।

 

পরে সেই আর্জেন্টাইন কনটেন্ট নির্মাতার সঙ্গে দেখা করে তাঁকে ধন্যবাদও জানান পেইন।

বিশ্বকাপ শুধু চ্যাম্পিয়ন তৈরি করে না। এটি তৈরি করে নতুন নায়ক, নতুন গল্প এবং নতুন পরিচয়।

কেউ গোল করে কোটি মানুষের হৃদয় জিতে নেন। কেউ অবিশ্বাস্য সেভে বদলে দেন নিজের দেশের ইতিহাস। কেউ আবার কেবল নিজের স্বাভাবিক আচরণ দিয়েই হয়ে ওঠেন মানুষের প্রিয় মুখ।

২০২৬ বিশ্বকাপ শেষ হলে হয়তো ট্রফিটি থাকবে একটি দলের কাছে। কিন্তু এই পাঁচ ফুটবলারের গল্প ছড়িয়ে থাকবে কোটি কোটি মানুষের মোবাইলের পর্দায়, টাইমলাইনে আর স্মৃতিতে। কারণ আধুনিক ফুটবলে এখন শুধু মাঠে জিতলেই হয় না, মানুষের মনও জিততে হয়।