জুলাই মাসেই তিনি পৃথিবীতে এসেছিলেন। জুলাই মাসেই বিদায় নিলেন। জীবনটা যেন একটি পূর্ণ বৃত্ত এঁকে শেষ হলো।
ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল অলরাউন্ডারদের একজন, স্যার গারফিল্ড গ্যারি সোবার্স, ৮৯ বছর বয়সে চলে গেলেন। তিনি এমন এক মানুষ, যাকে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না।
তাকে মনে রাখা হবে তার ব্যাটের সৌন্দর্যের জন্য, বল হাতে বিস্ময় তৈরি করার জন্য, অবিশ্বাস্য ক্যাচের জন্য, সাহসী নেতৃত্বের জন্য।
তাকে সবচেয়ে বেশি মনে রাখা হবে এই কারণে যে, তিনি ক্রিকেট মাঠে এমন সব কাজ করতে পারতেন, যা অন্যরা কল্পনাও করতে পারত না।
তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ব্যাটিং গড় ছিলো ৫৭ দশমিক ৭৮। উইকেট নিয়েছেন ২৩৫টি। বোলিং গড় ৩৪ এর একটু বেশি। সংখ্যাগুলোই বলে দেয়, তিনি শুধু একজন ব্যাটসম্যান বা বোলার ছিলেন না, নিজেই ছিলেন একটি পূর্ণাঙ্গ ক্রিকেট দলের সমান।
১৯৩৬ সালের ২৮এ জুলাই বার্বাডোজের ব্রিজটাউনে জন্ম নেওয়া সোবার্সের শৈশব মোটেও সহজ ছিলো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তার বাবা নিহত হন, তখন তার বয়স মাত্র পাঁচ বছর।
সংসারের সব দায়িত্ব এসে পড়ে মা থেলমার কাঁধে। জন্মের সময় তার দুই হাতেই একটি করে অতিরিক্ত আঙুল ছিল। ছোটবেলাতেই অস্ত্রোপচার করে সেগুলো কেটে ফেলা হয়।
স্কুলজীবনে ক্রিকেটের পাশাপাশি ফুটবল, বাস্কেটবল আর গলফেও অসাধারণ ছিলেন তিনি। মাত্র ষোলো বছর বয়সে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক। আর সতেরো বছর বয়সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে পা রাখেন।
শুরুতে সবাই তাকে দেখতেন একজন স্পিনার হিসেবে। কিন্তু খুব দ্রুতই বোঝা গেলো, এই ছেলেটিকে একটি পরিচয়ের মধ্যে আটকে রাখা যাবে না।
তিনি বাঁহাতি ব্যাটসম্যান ছিলেন। আবার প্রয়োজন হলে নতুন বল হাতে মিডিয়াম পেস করতেন। কিছুক্ষণ পর একই ইনিংসে ফিরে এসে বাঁহাতি অর্থোডক্স স্পিন করতেন। চাইলে কব্জির জাদুতে চিনাম্যানও করতে পারতেন।
এর সঙ্গে ছিলো দুর্দান্ত ফিল্ডিং আর স্লিপ কিংবা শর্ট লেগে অবিশ্বাস্য ক্যাচ নেওয়ার ক্ষমতা। একজন অধিনায়কের জন্য তিনি যেন পাঁচজন ক্রিকেটারের সমান ছিলেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে জ্যামাইকার সাবাইনা পার্কে আসে সেই ইনিংস, যা তাঁকে অমর করে দেয়। মাত্র ২১ বছর বয়সে অপরাজিত ৩৬৫ রান করেন তিনি।
সেটিই ছিল তার প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি। আর সেই সেঞ্চুরিই হয়ে যায় বিশ্বের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত টেস্ট ইনিংস।
ইংল্যান্ডের লেন হাটনের ৩৬৪ রানের রেকর্ড ভেঙে দেন তিনি। এই রেকর্ড টিকে ছিলো টানা ছত্রিশ বছর।
১৯৯৪ সালে ব্রায়ান লারা সেটি ভাঙেন। সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিলো, রেকর্ড ভাঙার পর মাঠে নেমে নতুন রেকর্ডধারীকে প্রথম অভিনন্দন জানিয়েছিলেন সোবার্স নিজেই।
তার ব্যাটিং ছিলো চোখের জন্য আনন্দ। নিখুঁত টাইমিং, দারুণ ফুটওয়ার্ক, কব্জির অসাধারণ ব্যবহার আর মাঠের ফাঁকা জায়গা খুঁজে বল পাঠানোর এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিলো তার।
ডন ব্র্যাডম্যান একবার বলেছিলেন, অস্ট্রেলিয়ায় সোবার্সের একটি ডাবল সেঞ্চুরি ছিল তার দেখা সেরা ব্যাটিং প্রদর্শনীগুলোর একটি।
১৯৬৬ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক হিসেবে ইংল্যান্ডকে তাদের মাটিতে ৩-১ ব্যবধানে হারান তিনি। সেই সিরিজে করেন ৭২২ রান, তিনটি সেঞ্চুরি, সঙ্গে নেন ২০ উইকেট। একজন ক্রিকেটারের পক্ষে একই সিরিজে এমন আধিপত্য বিরল।
তবে গ্যারি সোবার্সকে নিয়ে সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি আসে ১৯৬৮ সালের ৩১এ আগস্ট। নটিংহ্যামশায়ারের হয়ে গ্ল্যামরগানের বিপক্ষে খেলছিলেন। দ্রুত রান দরকার ছিলো।
প্রতিপক্ষের বোলার ম্যালকম ন্যাশ স্পিন করার চেষ্টা করছিলেন। সোবার্স ঠিক করলেন, ঝুঁকি নেবেন। পরের ছয়টি বলই সীমানার বাইরে পাঠালেন।
ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে এক ওভারে ছয় ছক্কার রেকর্ড গড়লেন তিনি। পরে রবি শাস্ত্রী এই কীর্তির পুনরাবৃত্তি করলেও প্রথম নামটি আজও গ্যারি সোবার্স।
মজার বিষয় হলো, পঞ্চম বলটি একবার ক্যাচ হয়েছিল। কিন্তু ফিল্ডার বল ধরার সময় সীমানার বাইরে পড়ে যাওয়ায় সেটিও ছয় হিসেবেই গণ্য হয়। আর শেষ বলটি এত দূরে গিয়ে পড়েছিল যে সেটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।
শুধু প্রতিভা নয়, আত্মবিশ্বাস ছিলো তার সবচেয়ে বড় শক্তি। একবার আউট হয়ে ড্রেসিংরুমে ফেরার সময় ক্যাচ ধরা ফিল্ডারকে নাকি হেসে বলেছিলেন, "তোমাকে যে ওখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখিনি।" কথাটির মধ্যে যেমন রসিকতা ছিল, তেমনি ছিলো নিজের সামর্থ্যের প্রতি অগাধ বিশ্বাস।
ক্রিকেটাররা তার সম্পর্কে কী ভাবতেন, সেটিও অনেক কিছু বলে দেয়। অস্ট্রেলিয়ার জন বেনো বলেছিলেন, সোবার্সের বিপক্ষে ফিল্ড সাজানো প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ তিনি চাইলে মাঠের যেকোনো জায়গায় রান করতে পারতেন।
ভারতের সাবেক উইকেটকিপার ফারুখ ইঞ্জিনিয়ার মনে করতেন, ক্লাইভ লয়েডের মতো ব্যাটসম্যানকেও সোবার্স এমন সুন্দর আউটসুইং করাতেন যে ব্যাটে বল লাগানো কঠিন হয়ে যেত।
নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক গ্লেন টার্নারের ভাষায়, দল যখন সমস্যায় পড়ত, সোবার্স শুধু বলতেন, "চিন্তা কোরো না। এটা আমি সামলে নেব।" আর বেশির ভাগ সময় সত্যিই তিনি তা করে দেখাতেন।
অবশ্য তার জীবন একেবারে বিতর্কহীন ছিলো না। ঘোড়দৌড়ের প্রতি তার দুর্বলতা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। অধিনায়ক হিসেবে কখনো কখনো অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।
আবার রোডেশিয়ায় একটি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে পরে ক্ষমাও চেয়েছিলেন। কিন্তু এসব কিছুই তার ক্রিকেট প্রতিভার ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করতে পারেনি।
১৯৭৫ সালে ক্রিকেটে অবদানের জন্য তিনি নাইট উপাধিতে ভূষিত হন। পরে বার্বাডোজ তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দেয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলও বছরের সেরা ক্রিকেটারের ট্রফির নামকরণ করে তার নামে। ২০০৭ সালে ক্যারিবিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের উদ্বোধনও করেছিলেন তিনি। আইসিসি হল অব ফেইমের প্রথম সদস্যদের একজনও ছিলেন তিনি।
উইজডেন যখন বিংশ শতাব্দীর সেরা পাঁচ ক্রিকেটার নির্বাচন করে, তখন স্যার ব্র্যাডম্যানের পর সবচেয়ে বেশি ভোট পান গ্যারি সোবার্স। সেই তালিকায় তার পেছনে ছিলেন স্যার জ্যাক হবস, শেন ওয়ার্ন এবং স্যার ভিভ রিচার্ডসের মতো কিংবদন্তিরা। এটি শুধু একটি সম্মান নয়, ক্রিকেট ইতিহাসে তার অবস্থানেরও স্বীকৃতি।
আজও বার্বাডোজের কেনসিংটন ওভালের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার ভাস্কর্য। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা ক্রিকেটপ্রেমীরা সেখানে ছবি তোলেন। কিন্তু গ্যারি সোবার্সকে স্মরণ করার জন্য কোনো ভাস্কর্যের প্রয়োজন হয় না।
তার ব্যাটের সৌন্দর্য, বলের বৈচিত্র্য, ক্যাচের বিস্ময় আর মাঠজুড়ে ছড়িয়ে থাকা উপস্থিতিই তাকে অমর করে রেখেছে।
ক্রিকেটে অনেক মহান ব্যাটসম্যান এসেছেন। অনেক অসাধারণ বোলারও এসেছেন। কিন্তু এমন একজন ক্রিকেটার, যিনি ব্যাট হাতে ম্যাচ জেতাতে পারেন, তিন ধরনের বোলিং করতে পারেন, যেকোনো জায়গায় দুর্দান্ত ফিল্ডিং করতে পারেন, আবার অধিনায়ক হিসেবেও দলকে নেতৃত্ব দিতে পারেন, এমন মানুষ ইতিহাসে খুব বেশি জন্মায় না।
স্যার গ্যারি সোবার্সকে মনে রাখার কারণ শুধু একটি নয়। ক্রিকেটবিশ্ব তাকে মনে রাখবে অগণিত কারণে।