যেভাবে মাঠে হেঁটে বেড়িয়েও ইতিহাসের সেরা লিওনেল মেসি

আর্জেন্টিনা যদি টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতে শিরোপা ধরে রাখতে পারে, তাহলে সেই সাফল্যের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবেন লিওনেল মেসি।

৩৯ বছর বয়সি এই ফরোয়ার্ড নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন। পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ও মেক্সিকোর গিয়ের্মো ওচোয়ার সঙ্গে যৌথভাবে এটিই সর্বোচ্চসংখ্যক বিশ্বকাপ খেলার রেকর্ড। এবারের আসরে ইতোমধ্যেই আটটি গোল করেছেন, করিয়েছেন আরও তিনটি। গোল্ডেন বুটের দৌড়েও ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে সমানতালে এগিয়ে আছেন তিনি।

তবে এবারের বিশ্বকাপে দেখা যাচ্ছে এক ভিন্ন মেসিকে। ২০০৩ সালে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেক হওয়া সেই ক্ষিপ্র ড্রিবলার এখন আর আগের মতো নন। কিন্তু সেটিই তার সবচেয়ে বড় শক্তি। আর্জেন্টিনা বুধবার সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ডের। ইতিহাসের অন্যতম বড় এই লড়াইয়েও আলো থাকবে মেসির দিকেই।

বয়স বাড়লেও বদলে গেছে শুধু খেলার ধরন

বেশিরভাগ ফুটবলারের ক্যারিয়ারে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পারফরম্যান্স কমে যায়। তবে অসাধারণরা নিজেদের নতুনভাবে গড়ে তোলেন। যেমন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো গতি কমে যাওয়ার পর নিজেকে বদলে নিয়েছেন বক্সের ভেতরের গোল শিকারিতে।

মেসির পরিবর্তনটা একটু আলাদা।

তিনি বয়সের কাছে হার মেনে নিজেকে বদলাননি। বরং খেলার চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে থাকতে নিজের ভূমিকাই পালটে ফেলেছেন। এবারের বিশ্বকাপে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি সুযোগ তৈরি করছেন, কিন্তু অনেক কম দৌড়াচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ৩৩টি শট নিয়েছেন এবং সতীর্থদের জন্য ২১টি সুযোগ তৈরি করেছেন। মোট ৫৪টি আক্রমণাত্মক অবদান, যা ১৯৮৬ সালের দিয়েগো ম্যারাডোনার পর এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ।

আরও অবাক করা তথ্য হলো, পুরো টুর্নামেন্টে তিনি যে দূরত্ব অতিক্রম করেছেন, তার ৪৭ শতাংশই হেঁটে। মাঠের সব আউটফিল্ড খেলোয়াড়ের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বেশি।প্রতি ৯০ মিনিটে তিনি গড়ে মাত্র ৮ দশমিক ২ কিলোমিটার দৌড়েছেন। আর্জেন্টিনার যেসব আউটফিল্ড খেলোয়াড় অন্তত ২০ মিনিট খেলেছেন, তাদের মধ্যে এটিই সবচেয়ে কম। স্প্রিন্টের সংখ্যাও কমে এসেছে অনেক। চার বছর আগে প্রতি ম্যাচে যেখানে গড়ে ৫ দশমিক ৩ বার স্প্রিন্ট দিতেন, এবার তা নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৭ এ। তবু তাকে থামানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।

গত ১৫টি বিশ্বকাপ ম্যাচে কেবল পোল্যান্ডই মেসিকে গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করতে দেয়নি। এই ১৫ ম্যাচে তার অবদান ১৬ গোল ও ৭ অ্যাসিস্ট।

 

ডান প্রান্তের উইঙ্গার থেকে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়

২০০৩ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার হয়ে প্রথম ম্যাচ খেলেছিলেন মেসি। তখন তিনি ডান প্রান্তে খেলতেন। ড্রিবল করতেন, ভেতরে কেটে এসে আক্রমণ করতেন। প্রথমবার তাকে অনুশীলনে দেখে রোনালদিনিয়ো বলেছিলেন, "এই ছেলেটাই একদিন বিশ্বের সেরা হবে।"

২০০৫ সালে জুভেন্টাসের বিপক্ষে জোয়ান গ্যাম্পার ট্রফিতে দুর্দান্ত খেলেই বিশ্বকে নিজের পরিচয় দেন মেসি। সেই ম্যাচ দেখে জুভেন্টাস কোচ ফাবিও ক্যাপেলো এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ২১ বছর বয়সে পৌঁছানোর পর বার্সেলোনা কোচ ফ্র্যাঙ্ক রাইকার্ড বুঝতে পারেন, মেসিকে যত বেশি বল দেওয়া যাবে, দল ততই লাভবান হবে।

গার্দিওলার সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত

২০০৮ সালে পেপ গার্দিওলা বার্সেলোনার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকে মেসি আগের মতোই ডান উইংয়ে খেলতেন। কিন্তু পরে গার্দিওলা বড় একটি সিদ্ধান্ত নেন। রক্ষণে খুব বেশি নেমে না আসায় ডান প্রান্তের ফুলব্যাক সমস্যায় পড়ছিলেন। একই সঙ্গে গার্দিওলা বুঝেছিলেন, মেসির আসল জায়গা মাঠের মাঝখানে। সেখান থেকেই তৈরি হয় নতুন এক ইতিহাস। ফলস নাইন, যে ভূমিকায় বদলে যায় ইউরোপের ফুটবল।

২০০৯ সালের ২ মে, রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যু। গার্দিওলা মেসিকে ডান উইং থেকে সরিয়ে মাঝখানে খেলালেন। তবে প্রচলিত স্ট্রাইকার হিসেবে নয়। স্যামুয়েল এতো চলে গেলেন ডান দিকে, থিয়েরি অঁরি বাম দিকে। আর মেসির দায়িত্ব হলো মাঝমাঠে নেমে এসে বল নেওয়া, খেলা তৈরি করা এবং সুযোগ তৈরি করা।

সেদিন বার্সেলোনা জিতেছিল ৬-২ গোলে। সেই ম্যাচ থেকেই নতুনভাবে জন্ম নেয় ফলস নাইন কৌশল।

মেসি মাঝমাঠে নেমে এলে প্রতিপক্ষের সেন্টার ব্যাকরা বুঝতে পারতেন না কী করবেন। সামনে এগোবেন, নাকি জায়গায় থাকবেন। দুই সিদ্ধান্তের কোনোটিই কাজে আসত না। পেছনে জাভি, আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা ও ইয়ায়া তোরে এবং দুই পাশে অঁরি ও এতোর উপস্থিতি প্রতিপক্ষের রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে দিত। কয়েক সপ্তাহ পর চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালেও একই কৌশল ব্যবহার করেন গার্দিওলা। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে সেই ম্যাচে হেডে গোলও করেন মেসি।

২০১১ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে লা লিগায় মাত্র ৬৯ ম্যাচে করেন ৯৬ গোল।

এই সময়ই ব্যালন ডি অর যেন তার ব্যক্তিগত সম্পদে পরিণত হয়। ২০০৯ সালের পর আরও ২০১০, ২০১১, ২০১২, ২০১৫ ও ২০১৯ সালে জেতেন এই পুরস্কার। পরে মোট আটবার বিশ্বের সেরা হন।

মেসি নিজেই পরে বলেন, "আগে কৌশল নিয়ে খুব একটা ভাবতাম না। কিন্তু গার্দিওলার কাছ থেকে আমি জায়গা তৈরি করা, বল ধরে রাখা এবং ফুটবলকে নতুনভাবে বুঝতে শিখেছি।"

গোলদাতা থেকে খেলার পরিচালক

জাভি ও ইনিয়েস্তা বার্সেলোনা ছাড়ার পর মেসির ওপর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। আগে তার পাশে এমন মিডফিল্ড ছিল যারা পুরো খেলার নিয়ন্ত্রণ নিত। তারা চলে যাওয়ার পর মেসিকেই একসঙ্গে গোল করতে হয়েছে, আক্রমণ গড়তে হয়েছে এবং পুরো দল পরিচালনা করতে হয়েছে। সেখানেও নিজেকে বদলে ফেলেন তিনি। ফলস নাইন থেকে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন খেলার পরিচালক।

 

২০১৯-২০ মৌসুমে লা লিগায় ২৫ গোলের পাশাপাশি করেন ২২টি অ্যাসিস্ট। পরের মৌসুমে আবারও ৩০ গোল ও ১১ অ্যাসিস্ট করেন।

এরপর পিএসজিতে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবারের মতো ক্লাব ক্যারিয়ারে গোলের চেয়ে অ্যাসিস্ট বেশি হয়। সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে করেন ১১ গোল ও ১৫ অ্যাসিস্ট। একজন আর্জেন্টাইন বিশ্লেষক বলেছিলেন, "মেসি গোলদাতা থেকে ইনিয়েস্তার মতো খেলার পরিচালক হয়ে উঠেছেন।"

আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হওয়ার কঠিন পথ

২০১১ সালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক হন মেসি। এরপর একের পর এক হতাশা। ২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির কাছে হার। ২০১৫ কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হার। ২০১৬ সালেও একই প্রতিপক্ষের কাছে একইভাবে হার। টানা তিনটি বড় ফাইনাল হেরে একসময় জাতীয় দল থেকেই অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন।

পরে অবশ্য ফিরে আসেন। তবে তখনকার মেসি আর আগের মতো ছিলেন না।

২০১৯ কোপা আমেরিকায় ব্রাজিলের বিপক্ষে বিতর্কিত হারের পর প্রকাশ্যে দক্ষিণ আমেরিকার ফুটবল কর্তৃপক্ষের সমালোচনা করেন তিনি। নীরব মেসি তখন হয়ে উঠেছেন একজন নেতৃত্ব দিতে জানেন এমন অধিনায়ক।

২০২১ সালে কোপা আমেরিকার শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে ২৮ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটে আর্জেন্টিনার। ফাইনালের আগে ড্রেসিংরুমে মেসির আবেগঘন বক্তব্যে অনেক খেলোয়াড়ই কেঁদে ফেলেছিলেন।

বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে পূর্ণতা

২০২২ সালের বিশ্বকাপে যেন মেসির সব রূপ একসঙ্গে দেখা যায়। ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেমিফাইনালে যস্কো গভারদিওলকে কাটিয়ে দৌড়ে যাওয়া সেই মেসি যেন আবার ২০০৯ সালের তরুণ উইঙ্গার।

ফ্রান্সের বিপক্ষে ফাইনালে নিখুঁত পাস, আক্রমণে সময়মতো উপস্থিতি এবং টাইব্রেকারে ঠান্ডা মাথায় গোল, সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ এক ফুটবলার।

পরে জিনেদিন জিদানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেসি বলেন, "ফুটবল অনেক বদলে গেছে। এখন খেলা অনেক বেশি কৌশলনির্ভর এবং শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল। আগে অনেক বেশি ফাঁকা জায়গা পাওয়া যেত।"

এই কথাগুলো এমন একজন ফুটবলারের, যিনি আধুনিক ফুটবলের তিনটি ভিন্ন যুগে খেলেছেন এবং প্রতিবারই নিজেকে সবার ওপরে রেখেছেন।

এখন তিনি কম দৌড়ান, কিন্তু সবচেয়ে বেশি দেখেন

ইন্টার মায়ামি, ২০২৪ কোপা আমেরিকা এবং এবারের বিশ্বকাপে মেসিকে আগের চেয়ে অনেক বেশি হাঁটতে দেখা যায়। একসময় সমালোচকেরা এটিকে অলসতা বলতেন। এখন এটিকেই বলা হচ্ছে তার সবচেয়ে বড় দক্ষতা।

তিনি জানেন কখন শক্তি বাঁচিয়ে রাখতে হবে এবং কখন ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে হবে।

তার শৈশবের আদর্শ পাবলো আইমার একবার বলেছিলেন, "মেসির সর্বশেষ সংস্করণটাই সব সময় সেরা মেসি।" সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মেসি শুধু ট্রফি বা গোল বাড়াননি। তিনি বারবার নিজেকে নতুনভাবে তৈরি করেছেন।

কখনও বিস্ময়কর এক কিশোর উইঙ্গার, কখনও ইউরোপীয় ফুটবলের কৌশল বদলে দেওয়া ফলস নাইন, কখনও খেলার পরিচালক, কখনও বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক। আর এখন এমন এক অভিজ্ঞ ফুটবলার, যিনি আগের চেয়ে অনেক কম দৌড়ান, কিন্তু মাঠের সবাইকে ছাড়িয়ে খেলা সবচেয়ে আগে বুঝতে পারেন।

এ কারণেই মেসির গল্প শুধু একজন মহান ফুটবলারের গল্প নয়। এটি বারবার নিজেকে বদলে ফেলে, প্রতিটি নতুন চ্যালেঞ্জের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে শীর্ষে থাকার এক অসাধারণ ইতিহাস।