২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের উত্তেজনা এখন তুঙ্গে। শেষ ষোলোর রুদ্ধশ্বাস লড়াইগুলো শেষে চূড়ান্ত হয়েছে কোয়ার্টার-ফাইনালের লাইনআপ। প্রতিটি ম্যাচেই ছিল তীব্র স্নায়ুচাপ, কৌশলগত লড়াই এবং ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের প্রদর্শনী, যা ফুটবলপ্রেমীদের দিয়েছে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
টুর্নামেন্টের গতিপথ ও শেষ ষোলোর চমক
প্রথমেই বলতে হয় মরক্কোর কথা। উত্তর আফ্রিকার এই দলটি এবারের বিশ্বকাপে রীতিমতো বিস্ময় উপহার দিচ্ছে। কানাডাকে ৩-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে তারা আবারও জানান দিলো যে, গতবার সেমি-ফাইনালে ওঠা কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। তাদের রক্ষণভাগ যেন দুর্ভেদ্য এক দেয়াল, আর কাউন্টার অ্যাটাকগুলো অত্যন্ত ধারালো।
অন্যদিকে, গতবারের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ১-০ গোলের কষ্টার্জিত জয় পেলেও তাদের জয়ের নেশা কমেনি। টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত পাঁচ ম্যাচে ১৪টি গোল করে তারা বুঝিয়েছে, আক্রমণে তারা কতটা ভয়ঙ্কর।
সবচেয়ে বড় চমক দেখিয়েছে নরওয়ে। ২৮ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা দলটি পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে ২-১ গোলে হারিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখনকার অন্যতম সেরা ফিনিশার আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোল নরওয়েকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার-ফাইনালে নিয়ে গেছে। নরওয়ের এই জয়টি কেবল মাঠের লড়াই নয়, বরং এক নতুন যুগের সূচনার বার্তাও বটে।
ইংল্যান্ডও তাদের অদম্য মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে। মেক্সিকোর বিপক্ষে দীর্ঘ সময় ১০ জন নিয়ে খেলেও ৩-২ গোলের শ্বাসরুদ্ধকর জয় ছিনিয়ে নেওয়া সহজ কথা নয়। হ্যারি কেইনের ফর্ম ইংলিশ সমর্থকদের জন্য বড় আশার আলো।
অন্যদিকে, স্পেন তাদের দীর্ঘ ৩৫ ম্যাচের অপরাজিত থাকার ধারা বজায় রেখে পর্তুগালকে বিদায় করেছে। বেলজিয়ামও যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে নিজেদের গোল করার সামর্থ্য প্রমাণ করেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা। মিশরের বিপক্ষে ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে যেভাবে শেষ ১৩ মিনিটে তিন গোল করে তারা জিতেছে, তা রূপকথাকেও হার মানায়। এর আগের রাউন্ডেও একইভাবে ঘুরে দাঁড়ানো আর্জেন্টিনা এখন যেন এক অপরাজেয় মানসিক শক্তি নিয়ে খেলছে।
কোয়ার্টার-ফাইনাল: শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ের আগাম আভাস
শুক্রবার (১০ জুলাই) থেকে শুরু হতে যাওয়া প্রতিটি ম্যাচই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য হতে যাচ্ছে এক একটি ফাইনালের মতো। প্রতিটি ম্যাচের রয়েছে নিজস্ব সমীকরণ।
ফ্রান্স বনাম মরক্কো (১০ই জুলাই, রাত ২টা)
এটি হতে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের অন্যতম আবেগঘন ম্যাচ। গতবারের সেমি-ফাইনালে মরক্কোর স্বপ্নের যাত্রা ফ্রান্সের কাছে এসেই থেমেছিল। এবার কি মরক্কো সেই হারের মধুর প্রতিশোধ নিতে পারবে? মরক্কোর জন্য ফ্রান্সের এই শক্তিশালী আক্রমণভাগকে সামলানোই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে তাদের জমাট ডিফেন্স যদি এমবাপ্পে বা গ্রিজম্যানদের আটকাতে পারে, তবে অঘটন ঘটিয়ে দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়।
স্পেন বনাম বেলজিয়াম (১১ই জুলাই, রাত ১টা)
স্পেনের পাসিং ফুটবল বনাম বেলজিয়ামের আক্রমণাত্মক গতির এক দারুণ সংঘর্ষ হতে যাচ্ছে এই ম্যাচে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের স্পেন যেভাবে মাঠের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে খেলে, তা যে কোনো দলের জন্যই দুশ্চিন্তার কারণ। কিন্তু বেলজিয়ামের স্কোয়াডে রয়েছে এমন সব খেলোয়াড় যারা একা ম্যাচ ঘুরিয়ে দিতে পারে। এই ম্যাচটি মূলত দুই কোচের কৌশলী বুদ্ধির লড়াই হতে চলেছে।
নরওয়ে বনাম ইংল্যান্ড (১১ই জুলাই, ভোর ৬টা)
সারা বিশ্বের নজর থাকবে নরওয়ের আর্লিং হালান্ডের ওপর। ইংল্যান্ডের কোচ টমাস টুখেল নিশ্চয়ই তাকে আটকানোর জন্য বিশেষ কোনো পরিকল্পনা সাজাবেন। নরওয়ে যদি তাদের প্রথম বিশ্বকাপের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে হালান্ডকে পর্যাপ্ত বল জোগান দিতে পারে, তবে ইংল্যান্ডের রক্ষণভাগকে কঠিন পরীক্ষায় পড়তে হবে। এটি হবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য বনাম সুশৃঙ্খল দলীয় খেলার লড়াই।
আর্জেন্টিনা বনাম সুইজারল্যান্ড (১২ই জুলাই, রাত ১টা)
আর্জেন্টিনা যেভাবে শেষ দুটি ম্যাচে হার থেকে ফিরে এসেছে, তা কেবল খেলোয়াড়দের জেদ নয়, বরং কোচ লিওনেল স্কালোনির ট্যাকটিকাল পরিবর্তনেরও ফসল। কিন্তু সুইজারল্যান্ড মোটেও সহজ প্রতিপক্ষ নয়। কলম্বিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আসা সুইসরা তাদের সুসংগঠিত রক্ষণের জন্য পরিচিত। মেসি কি পারবে সুইসদের এই জমাট রক্ষণ ভেঙে সেমি-ফাইনালে জায়গা করে নিতে? এটি হতে পারে পুরো কোয়ার্টার-ফাইনাল পর্বের সবচেয়ে শ্বাসরুদ্ধকর লড়াই।
মোদ্দা কথা, ফুটবলের এই মহাযজ্ঞে টিকে থাকতে হলে কেবল প্রতিভা থাকলেই চলবে না, প্রয়োজন নিখুঁত পরিকল্পনা এবং শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা। সেমি-ফাইনালে যাওয়ার জন্য নিজেদের সবটুকু উজাড় করে দিতে প্রস্তুত এখন এই আট দল। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কোচদের বুদ্ধির লড়াইও এই আসরের ভাগ্য নির্ধারণ করে দেবে।
এখন দেখার বিষয় ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লেখাতে শেষ আটের এই দলগুলোর মধ্যে থেকে শেষ পর্যন্ত সেমি-ফাইনালে জায়গা করে নেয় কোন চারটি দল। প্রতিটি ম্যাচই হতে যাচ্ছে টানটান উত্তেজনার, আর ফুটবলপ্রেমীরা মুখিয়ে আছে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তগুলোর জন্য। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত ট্রফি কার হাতে ওঠে!