ইতিহাস সেরা প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে শেষ আটে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা

বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন রাত খুব বেশি আসে না। যে রাত শেষ বাঁশি বাজার অনেক আগেই একটি দলের বিদায়ের গল্প লিখে ফেলে, আবার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই গল্প বদলে যায় অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের মহাকাব্যে।

দুই গোলে পিছিয়ে থাকা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে তখন প্রায় সবাই বিদায় বলে ধরে নিয়েছিল। শেষ আটে ওঠার স্বপ্ন যেন হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই ছাড়ে না। আর সামনে যদি থাকেন লিওনেল মেসির মতো একজন নেতা, তাহলে অসম্ভবও কখনো কখনো সম্ভব হয়ে ওঠে।

মিশর তখন স্বপ্ন দেখছিল ইতিহাস গড়ার। তারা দুই গোলের লিড নিয়ে আর্জেন্টিনাকে চাপে ফেলে দিয়েছিল। এমনকি তাদের একটি গোল বাতিল হওয়া নিয়েও ছিল তীব্র বিতর্ক। সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে হতাশা আর ক্ষোভে ভেঙে পড়েছিলেন মিশরের খেলোয়াড়েরা।

অন্যদিকে আর্জেন্টিনার জন্য সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। একসময় মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপে মেসির পথচলা বুঝি এখানেই শেষ হতে চলেছে। এর আগে একটি সুযোগও কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। সেই ব্যর্থতার ভার যেন পুরো দলকেই ডুবিয়ে দিচ্ছিল।

কিন্তু সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেই নিজের আসল রূপ দেখালেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক।

প্রথমে অসাধারণ এক পাস থেকে সতীর্থকে দিয়ে গোল করালেন। তারপর অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেই জালের দেখা পেলেন। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে বদলে গেল পুরো ম্যাচের চিত্র। গ্যালারির হতাশা রূপ নিল উল্লাসে। মিশরের আত্মবিশ্বাস মুহূর্তেই ভেঙে পড়ল।

এরপর যোগ করা সময়ে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত তৃতীয় গোল। নিশ্চিত হলো আর্জেন্টিনার অবিশ্বাস্য জয় এবং শেষ আটের টিকিট।

শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগ ধরে রাখতে পারেননি মেসি। সাধারণত শান্ত স্বভাবের এই মহাতারকাকে দেখা গেল চোখের জল ফেলতে। কয়েক মিনিট আগেও যার বিশ্বকাপ শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল, সেই তিনিই হয়ে উঠলেন দলের ত্রাতা।

মাঠজুড়ে তখন দুই রকমের কান্না। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের চোখে আনন্দের অশ্রু, আর মিশরের ফুটবলারদের চোখে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা।

এই ম্যাচে আবারও নিজের অসাধারণ ধারাবাহিকতার প্রমাণ দিলেন মেসি। টানা নয়টি বিশ্বকাপ ম্যাচে তিনি সরাসরি গোল করতে বা করাতে অবদান রাখলেন। এই সময়ে তাঁর নামের পাশে জমা হয়েছে তেরোটি গোল এবং তিনটি গোলে সহায়তা। এমন পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি হিসেবে ম্যাচসেরার পুরস্কারও উঠেছে তাঁর হাতেই।

মিশরের জন্য এই হার নিঃসন্দেহে হৃদয়ভাঙার। তারা সাহসিকতার সঙ্গে লড়েছে, দীর্ঘ সময় এগিয়েও ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাদের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন এমন এক ফুটবলার, যিনি সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তেও ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক স্মরণীয় প্রত্যাবর্তন আছে। তবে দুই গোলে পিছিয়ে থেকে শেষ মুহূর্তে তিন গোল করে জয় তুলে নেওয়া আর্জেন্টিনার এই রাত নিঃসন্দেহে সেগুলোর অন্যতম। আর সেই গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন একজনই, লিওনেল মেসি।