ফুটবল: পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অজুহাত

ট্রেন ছুটে চলেছে ইয়র্ক স্ট্রিটের দিকে। প্রায় ঘণ্টাখানেকের যাত্রা। বগির বেশিরভাগ যাত্রী বই পড়ছেন বা ফোন নিয়ে ব্যস্ত। আমি বসে বসে যাত্রীদের দেখছি। নিউ ইয়র্কের ফ্যাশন সেন্স বোঝার চেষ্টা করছি। জানালার বাইরে একের পর এক স্টেশন পার হচ্ছে, আর বগির ভেতর হলুদ জার্সি পরা মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। ওহ! বলতে ভুলে গেছি, আমি ইয়র্ক স্ট্রিটে অ্যাডিডাসের এক ফ্যান জোনে যাচ্ছি। ওরা এটার নাম দিয়েছে ‘হোম অব সকার’। ব্রুকলিন ব্রিজ আর ইস্ট রিভার ঘেঁষা এই ফ্যান জোনের আবেদন নাকি ফিফার ফ্যান জোনগুলোর আবেদনকেও হার মানিয়েছে। ব্রাজিলিয়ানদের সাথে বসে কোনো বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখার উত্তেজনা শিরায় শিরায় অনুভব করছি।

ইয়র্ক স্ট্রিটে নেমে হাঁটতে হাঁটতেই ভিড়ের শব্দ কানে আসতে শুরু করলো। দূর থেকেই বোঝা যাচ্ছিলো, আজ এখানে ফুটবল শুধু দেখা-ই হবে না, ফুটবলকে বাঁচিয়েও রাখা হবে। ভেন্যুর সামনে পৌঁছেই চোখে পড়লো ব্রাজিলের পতাকা, হলুদ জার্সি, সবুজ টুপি, মুখে আঁকা নীল-হলুদের ছাপ। জাপানের সমর্থকেরাও কম যায় না। লাল-সাদা রঙ, শান্ত অথচ দৃঢ় উপস্থিতিতে ওরা নিজেদের মতো করে জায়গা করে নিয়েছে। তবে ব্রাজিল ফ্যানদের আধিক্যে তাদের উপস্থিতি চাপা পড়ে যাচ্ছে।

ভেতরে ঢুকতেই মনে হলো, শহরের কংক্রিটের ভেতরে যেন হঠাৎ এক টুকরো ‘রিও ডি জেনেইরো’ এসে বসেছে। বিশাল স্ক্রিন, চারপাশে উঁচু হয়ে থাকা আলো, খাবারের স্টল থেকে ভেসে আসা গরম গন্ধ, আর মানুষের কণ্ঠে ফুটবলের উত্তাপ— সব মিলিয়ে পরিবেশটা কোনো উৎসবের চেয়ে কম নয়। নদীর দিক থেকে আসা হালকা হাওয়া, আর ওপরে নিউ ইয়র্কের আকাশ—এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিলো, ফুটবল সত্যিই পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অজুহাত।

ম্যাচ শুরুর আগে কয়েকজন ব্রাজিল সমর্থকের সঙ্গে কথা হলো। সান্তোস বললেন, ‘ব্রাজিলের খেলা দেখার জন্য আলাদা কোনো কারণ লাগে না। ব্রাজিল মানেই আনন্দ।’ পাশে থাকা স্ত্রী রেবেকা হাসতে হাসতে যোগ করলেন, ‘নেইমার থাকুক বা না থাকুক, ব্রাজিলের জার্সি পরলেই বুকটা একটু বেশি ফুলে ওঠে।’

কথাগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু তাতে মিশে আছে এক ধরনের গভীর ভালোবাসা, সেটা বোঝার জন্য হয়তো ফুটবলকে হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। ব্রাজিলের সমর্থকদের কাছে ফুটবল কেবল ফলাফলের খেলা নয়; এটা স্মৃতি, গান, নাচ আর উত্তরাধিকার।

এর মধ্যেই ব্রাজিল থেকে আসা এক পরিবারের দেখা পেলাম। বাবা-মা আর দুই সন্তান—সবার গায়ে হলুদ জার্সি। ছোট ছেলেটি পতাকা নাড়ছে, আর মেয়েটি বড় স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ভদ্রলোক সাংবাদিক শুনে বিয়ার অফার করে বসলেন। আমি কফিতেই খুশি বলে হাতের গ্লাসটা দেখিয়ে দিলাম। আলেহান্দ্রো রিও ডি জেনেইরোতে থাকেন। পরিবার নিয়ে সামারে ছুটি কাটাতে নিউ ইয়র্ক এসেছেন। বললেন, ‘আমার স্ত্রী বাচ্চাদের দেখে রাখবে। চলো নদীর পাড়টা ঘুরে আসি।’ শান্ত বহমান ইস্ট নদী দেখে এক শলাকা বেনসন ধরিয়ে দিলাম। আলেহান্দ্রো-ও আমার সাথে টানতে লাগলেন। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, পৃথিবীর আরেক প্রান্ত থেকে আসা আলেহান্দ্র আর আমি যেন হঠাৎ বন্ধু হয়ে গেলাম। ফুটবল ব্যাপারটাই এমন। পরকে আপন বানিয়ে দেয় নিমিষেই!  

‘সপ্তম জন্মদিনে বাবা আমাকে ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন। সেই থেকে আমার ফুটবল প্রেম শুরু। ৯৪ এ যখন ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতলো, আমার ক্ষমতা থাকলে তোমাকে ওই মুহূর্তের অনুভূতি বোঝানোর চেষ্টা করতাম। আমি অত ভালো গুছিয়ে বলতে পারি না। ইংরেজি তো পারি টুকটাক,’ এক নিঃশ্বাসে বলে থামলেন আলেহান্দ্রো। আমি উত্তর দেওয়ার আগেই ওর ডাক পড়লো। ম্যাচ শুরু হওয়ার ঘণ্টা বেজে গেছে। ‘জিতবো আজকে’, - আলেহান্দ্রোর মুখে হাসি, ভেতরে এক নির্ভেজাল আত্মবিশ্বাস।

প্রথমার্ধের পর আমার তো বটেই, আলেহান্দ্রোর নিজেই নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন কি-না, জানা গেলে ভালো হতো। অসম্ভব খারাপ খেলেছে ব্রাজিল। ‘জোগো বোনিতো’র ছিটে-ফোঁটার দেখা মেলেনি, উল্টো ব্লু-সামরাই গোল দিয়েছে একটা। রাউন্ড অব থার্টি-টুতে কি বাদ পড়তে যাচ্ছে নেইমার ও গং?

এত মানুষের ভিড়ে কে কাকে কোথায় খুঁজে পাবে? আলেহান্দ্রো ঠিকই আমাকে খুঁজে বের করলেন। বিরতির ফাঁকে এক জার্সি দোকানে দাঁড়িয়ে বোঝার চেষ্টা করছিলাম, ১২০ ডলারের জার্সিতে কী আছে! সে সময় এই ব্রাজিলিয়ান এসে হাজির। বললেন, ‘ প্রথমার্ধের খেলা দেখে নিশ্চয়ই বিরক্ত তুমি! হওয়ার কথা। তবে আনচেলত্তি খুব চতুর ম্যানেজার। তাকে জাপান বোকা ভাবলে ভুল করবে।’

বিরতি থেকে ফিরেই ব্রাজিলের গোল। আর ম্যাচ শেষে মার্টিনেল্লির জাদুকরি গোলে জয়। বিরতিতে বিস্বাদময় মুখগুলোর ম্যাচ শেষে আনন্দ যেন ধরেনি। সেলেসাও ভক্তরা সব গোল হয়ে বসে পড়লো। তারপর কেউ একজন গান ধরলো। হঠাৎ দেখি সেই মৃদু সুর গর্জনে পরিণত হয়েছে। নেচে গেয়ে রাউন্ড অব সিক্সটিনে যাওয়ার আনন্দ পুরোপুরি উপভোগ যাকে বলে। আমিও সেই তালে কিছুটা নাচার চেষ্টা করলাম। বলাই বাহুল্য, সেই নাচ দেখার অযোগ্য। ব্রাজিলিয়ানরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, এক বাংলাদেশি অদ্ভুত নাচ দিচ্ছে এ নিয়ে তাদের খুব একটা মাথা ব্যথা নেই।

ধীরে ধীরে গান আরও জোরালো হলো। কেউ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাইছেন, কেউ পতাকা উড়াচ্ছেন, কেউ আবার অচেনা মানুষের সঙ্গে হাত মেলাচ্ছেন। এক বাবা ছেলেকে কাঁধে তুলে গাইছিলেন, আর পাশে দাঁড়ানো এক তরুণী চোখ বন্ধ করে তাল দিচ্ছিলেন। জয়-পরাজয়ের বাইরেও ফুটবলের নিজস্ব এক ভাষা আছে—সেই ভাষা গান, সেই ভাষা উচ্ছ্বাস, সেই ভাষা একসঙ্গে থাকা।

নিউ ইয়র্কের ‘অ্যাডিডাস হোম অব সকার’-এ কয়েক ঘণ্টা কাটিয়ে একটা কথাই স্পষ্ট হয়ে উঠলো—ফুটবল শুধু মাঠের খেলা নয়, মানুষের সঙ্গে মানুষের অদৃশ্য সেতু। সেই সেতুর খুঁটি ‘হোম অব সকারে’র পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ব্রুকলিন ব্রিজের খুঁটির চেয়েও বেশি শক্ত।