আটলান্টার অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামের এক কোণে গোল করার পর ছুটে গেলেন হ্যারি কেইন। সেই মুহূর্তে উচ্ছ্বাস সামলাতে না পেরে মাঠে ঢুকে পড়লেন ইংল্যান্ডের প্রধান কোচ টমাস টুখেলও।
অধিনায়ক, দলের অনুপ্রেরণা এবং বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন এমন এক বিশ্বকাপ অভিযান বাঁচিয়ে দিলেন, যা এক সময় ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক বিদায়গুলোর একটিতে পরিণত হতে চলেছিল।
আটলান্টার তীব্র গরম ও দমবন্ধ করা আর্দ্রতা থেকে স্টেডিয়ামের ছাদের নিচে আশ্রয় মিললেও ইংল্যান্ডের খেলা তখন যেন ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছিল। কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রের কাছে পিছিয়ে থাকা ইংল্যান্ডকে উদ্ধার করলেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।
এ কথা বলতেই হবে, কেইন যদি দায়িত্ব না নিতেন, তাহলে ইংল্যান্ড হয়তো ২০১৬ সালের ইউরো প্রতিযোগিতায় আইসল্যান্ডের কাছে হারের মতো কিংবা উনিশশো পঞ্চাশ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হারের মতো আরেকটি অপমানের মুখে পড়তো।
হ্যারি কেইনের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত আছে। কিন্তু এই ম্যাচে তিনি যা করলেন, সেটি হয়তো ইংল্যান্ডের জার্সিতে তার সবচেয়ে মূল্যবান অবদান।
ম্যাচের শেষ পনেরো মিনিট বাকি থাকতে তিনি শক্তিশালী এক হেডে গোলরক্ষক লিওনেল এমপাসিকে পরাস্ত করেন। এমপাসি পুরো ম্যাচে অসাধারণ সব সেভ করে ইংল্যান্ডের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কিন্তু কেইনের সেই হেড তাকেও হার মানায়।
এরপর ম্যাচ শেষ হতে মাত্র চার মিনিট বাকি। ঠিক তখনই বড় ফুটবলাররা যা করেন, সেটিই করলেন কেইন।
অ্যান্থনি গর্ডনের কাছ থেকে বল পেয়ে তিনি একজন ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে ডান পায়ের দুর্দান্ত এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। এমপাসির নড়ারও সময় ছিলো না। সেই গোলই ইংল্যান্ডকে শেষ ষোলোতে নিয়ে যায়, যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ স্বাগতিক মেক্সিকো।
টমাস টুখেল এবং ফুটবল সংস্থার জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়দের উদযাপন ছিল আনন্দের পাশাপাশি স্বস্তিরও।
কারণ খুবই হতাশাজনক একটি পারফরম্যান্স শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হ্যারি কেইনের দুই অসাধারণ গোলে নাটকীয় জয়ে পরিণত হয়েছিল।
এই জয় শুধু শেষ ষোলো নিশ্চিত করেনি, টমাস টুখেলকেও বড় বিপদ থেকে রক্ষা করেছে।
এমন হারের পর হয়তো তার চাকরি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যেতো, চুক্তির মেয়াদ যাই থাকুক না কেন।
ইংল্যান্ডের ফুটবল সংস্থাও টুখেলের ওপর বিশ্বকাপ জয়ের দায়িত্ব দিয়েছিল। সেই স্বপ্নও আপাতত বাঁচিয়ে রেখেছেন একজনই, হ্যারি কেইন।
পরিসংখ্যানও বলছে কতটা অসাধারণ কেইন
হ্যারি কেইনের নামের পাশে প্রশংসা নতুন কিছু নয়। তার সর্বশেষ কীর্তির পর সেই প্রশংসা আরও জোরালো হয়েছে।
এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত তার গোল সংখ্যা পাঁচ। সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কারের লড়াইয়ে তিনি রয়েছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে, নরওয়ের এরলিং হলান্ড এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসির সঙ্গে।
টমাস টুখেল মজা করে বলেন, এরা সবাই হাঙরের মতো। একজন গোল করলে অন্যজনও গোল করতে চায়। যেন সবাই একে-অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
কোচের ভাষায়, হ্যারি কেইন শুধু অধিনায়ক নন, তিনি নেতা। অবিশ্বাস্য দক্ষতায় ম্যাচের ভাগ্য বদলে দেন। এই ম্যাচেও তিনি সেটি দুইবার করে দেখিয়েছেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় গোলটি ছিলো অনবদ্য।
এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে কেইনের মোট গোল দাঁড়িয়েছে তেরো। এতে তিনি ব্রাজিল কিংবদন্তি পেলের সমান হয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের যৌথ ষষ্ঠ সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে উঠেছেন।
ইংল্যান্ডের হয়ে তার গোল এখন ৮৪। আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের গোলদাতাদের তালিকায় তিনি হাঙ্গেরির কিংবদন্তি ফেরেঙ্ক পুসকাশের সমান জায়গায় পৌঁছেছেন।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে এক ম্যাচে দুই গোল করা সর্বশেষ ইংল্যান্ড ফুটবলার ছিলেন গ্যারি লিনেকার। ১৯৯০ সালে ক্যামেরুনের বিপক্ষে তিনি এই কীর্তি গড়েছিলেন। এরপর প্রথম ফুটবলার হিসেবে সেই কীর্তি করলেন কেইন।
বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কেইনের গোল এখন পাঁচটি। ইংল্যান্ডের হয়ে তার চেয়ে বেশি রয়েছে শুধু গ্যারি লিনেকারের, যার গোল সংখ্যা ছয়।
আরও অবাক করার মতো তথ্য হলো, ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে চলতি মৌসুমে কেইনের গোল সংখ্যা এখন ৭২। এর মধ্যে ইংল্যান্ডের হয়ে ১১টি এবং বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬১টি গোল করেছেন তিনি।
বয়স বাড়ছে, কিন্তু আরও পরিণত হচ্ছেন কেইন
৩২ বছর বয়সী কেইন যেন সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত হচ্ছেন।
তিনি শুধু গোল করেন না, অসাধারণ পাস দেন, আক্রমণ গড়ে তোলেন এবং নেতৃত্ব দিয়ে পুরো দলকে এগিয়ে নেন।
সতীর্থ জুড বেলিংহ্যাম বলেছেন, ভবিষ্যতে তিনি গর্ব করেই বলবেন যে এমন একজন ফুটবলারের সঙ্গে তিনি খেলেছেন।
অ্যান্থনি গর্ডনও প্রশংসা করে বলেন, ভালো গোল অনেকেই করতে পারে। কিন্তু বছরের পর বছর একই মান ধরে রাখা খুব কম ফুটবলারের পক্ষেই সম্ভব। কেইন প্রতিদিন অনুশীলনে এবং প্রতিটি ম্যাচে সেটিই করে দেখান।
তিনি আরও বলেন, মেসির পর এমন মৌসুম খুব কম ফুটবলারেরই এসেছে। কেইনের এই ধারাবাহিকতা কাকতালীয় নয়। কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং ফুটবলের প্রতি তার ভালোবাসাই তাকে এই জায়গায় নিয়ে এসেছে। আমরা সবাই তার কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করি।
স্বপ্ন পূরণের পথে একজন অধিনায়ক
ম্যাচ শেষে কেইন বলেন, ছোটবেলায় বিশ্বকাপ দেখে বড় হয়েছি। তখন থেকেই স্বপ্ন ছিলো একদিন ইংল্যান্ডের হয়ে এই মঞ্চে খেলবো।
আমি মাঠে নামার সময় সেই স্বপ্ন কখনো ভুলে যাই না। আমি চেষ্টা করি নিজের সেরাটা দিতে। কারণ জানি, বিশ্বের কোটি কোটি ছেলে মেয়ে আমাদের খেলা দেখছে।
আমি সব সময় উদাহরণ তৈরি করে নেতৃত্ব দিতে চাই। দেশের জার্সি গায়ে যতক্ষণ মাঠে থাকি, ততক্ষণ নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করি।
সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ
এখন ইংল্যান্ডের গন্তব্য মেক্সিকো সিটি।
বিশ্বখ্যাত আস্তেকা স্টেডিয়ামে তাদের সামনে অপেক্ষা করছে স্বাগতিক মেক্সিকো।
নিজেদের মাঠে মেক্সিকোকে হারানো সহজ নয়। গত দীর্ঘ সময়ে প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে তারা সেখানে খুব কম ম্যাচ হেরেছে। বিশ্বকাপেও এই মাঠে টানা দশ ম্যাচ অপরাজিত তারা।
ইংল্যান্ডকে খেলতে হবে সাত হাজার ফুটেরও বেশি উচ্চতায়, উন্মাতাল দর্শকদের সামনে এবং প্রচণ্ড চাপের মধ্যে।
এমন কঠিন পরীক্ষায় ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় ভরসা আবারও হ্যারি কেইন।
কারণ আটলান্টার সেই রাত আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছে, হ্যারি কেইন মাঠে থাকলে ইংল্যান্ডের আশা কখনো শেষ হয়ে যায় না।