হাইড্রেশন ব্রেক থেকে কতো টাকা আয় করবে ফিফা

ম্যাচপ্রতি চার মিনিট ২০ সেকেন্ড। আর পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে মোট ৭ ঘণ্টা ৩০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। ফুটবল বিশ্বকাপে বাধ্যতামূলক হাইড্রেশন ব্রেকের সময় বিশ্বজুড়ে দর্শকরা ঠিক এতটাই অতিরিক্ত টিভি বিজ্ঞাপন দেখছেন।

যুক্তরাজ্যে যারা বিবিসি এবং আইটিভিতে ম্যাচ দেখছেন, তারা এই বিরতিতে খেলোয়াড়দের পানি পান করতে দেখছেন এবং বিশ্লেষকদের কাছ থেকে কৌশলগত আলোচনা শুনছেন। কিন্তু বিশ্বের অন্য অনেক দেশে দর্শকদের এই সময়টা সরাসরি বিজ্ঞাপনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, যেখানে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের পণ্য প্রচার করছে।

নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি হাফের মাঝখানে তিন মিনিটের বিরতির শুরুর ২০ সেকেন্ড পর বিজ্ঞাপন শুরু করা যায় এবং খেলা ফের শুরু হওয়ার ৩০ সেকেন্ড আগে তা শেষ করতে হয়।

এর ফলে প্রতি ম্যাচে প্রতিটি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য সর্বোচ্চ আটটি ৩০ সেকেন্ডের অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন স্লট তৈরি হয়। পুরো টুর্নামেন্টে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৩২টি।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে ফক্স স্পোর্টসের মতো চ্যানেলে বিশ্বকাপের একটি ৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপন স্লটের দাম গড়ে ২ লাখ থেকে ৩ লাখ ডলার পর্যন্ত। আর যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাচ বা নকআউট পর্বে এই দাম বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত।

এর মানে দাঁড়ায়, শুধু হাইড্রেশন ব্রেকের বিজ্ঞাপন থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ২৫ কোটি ডলার হাতবদল হতে পারে।

এই বিরতিগুলো ম্যাচের গতি নষ্ট করছে বলে অনেক কোচ ও খেলোয়াড় সমালোচনা করেছেন। অনেক স্টেডিয়ামে দর্শকরাও জোরে জোরে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন।

তবে প্রশ্ন উঠছে, কোন কোন দেশে এই বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে, এটি কীভাবে কাজ করছে এবং ভবিষ্যতে ফুটবলে এর প্রভাব কী হতে পারে?

ফিফা বলছে, গরম আবহাওয়ায় খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যই হাইড্রেশন ব্রেক চালু করা হয়েছে। এছাড়া খেলায় ন্যায্যতা বজায় রাখতে প্রতিটি ম্যাচে এটি বাধ্যতামূলকভাবে রাখা হয়েছে, এমনকি ছাদযুক্ত বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্টেডিয়ামেও।

যুক্তরাজ্যের দর্শকরা এই সময় বিজ্ঞাপন থেকে মুক্ত থাকছেন, কারণ বিবিসিতে বিজ্ঞাপন নেই এবং আইটিভি দেশটির সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা, অফকম-এর নিয়মের কারণে ম্যাচ চলাকালীন বিজ্ঞাপন দেখাতে সীমাবদ্ধ।

কিন্তু অন্য দেশে সম্প্রচারকারীরা এই বিরতিকে অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে। অনেকেই পুরো সময় বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে বা স্ক্রিন ভাগ করে বিজ্ঞাপন চালাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ফক্স স্পোর্টস সর্বোচ্চ সময় বিজ্ঞাপন ব্যবহার করছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পুরো স্ক্রিন জুড়ে বিজ্ঞাপন চলছে।

এছাড়া তারা “এই বিরতি স্পনসর করেছে অমুক ব্র্যান্ড”এমনভাবে বিরতিটিকেও বিজ্ঞাপনের অংশ বানিয়ে দিচ্ছে। খেলোয়াড়দের জন্য থাকা কোকা কোলার পানীয় স্পনসরশিপ মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে দর্শকরা কার্যত তিন স্তরের বিজ্ঞাপন দেখছেন।

পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হোয়ার্টন স্কুলের স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞ রবার্ট ডি গিসি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে খেলায় বিজ্ঞাপন বিরতি নতুন কিছু নয়।

“আমেরিকান দর্শকরা ৪০–৫০ বছর ধরেই ইন-প্লে বিজ্ঞাপনে অভ্যস্ত। তাই এখানে এটা খুব স্বাভাবিকভাবেই গ্রহণ করা হয়। খেলাকে আরও আমেরিকান ধাঁচে নেওয়ার যেকোনো পরিবর্তন সাধারণত সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়,” বিবিসি-কে বলেছেন তিনি।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের স্প্যানিশ ভাষার চ্যানেল টেলিমুন্ডো এই বিরতিতে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে না। তাদের একজন ধারাভাষ্যকার বিবিসি-কে বলেছেন, তারা “পুরোনো ধাঁচের ফুটবল” বজায় রাখতে চান, যেখানে দর্শকরা খেলাটার স্বাভাবিক প্রবাহই দেখবে, বিজ্ঞাপনের হস্তক্ষেপ নয়।

মেক্সিকো, কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, চীন, জাপান, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং সাব-সাহারান আফ্রিকাসহ বিশ্বের আরও অনেক বড় বাজারে এই ধরনের বিজ্ঞাপন ব্যবহার করা হচ্ছে। সব জায়গায় যুক্তরাষ্ট্রের মতো উচ্চ মূল্যে বিক্রি না হলেও, মোট আয়ের পরিমাণ বিশাল।

ডি গিসির হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী মিলিয়ে এই হাইড্রেশন ব্রেক বিজ্ঞাপন থেকে আয় দাঁড়াতে পারে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি।

তবে এই বিজ্ঞাপন সত্যিই কতটা কার্যকর, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অরেগন বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের প্রধান টি বেটিনা কর্নওয়েলের মতে, যদি দর্শকরা মনে করেন বিজ্ঞাপনটি খেলায় বাধা দিচ্ছে, তাহলে তারা বিরক্ত হতে পারে এবং সেই বিরক্তি বিজ্ঞাপনের কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে।

“যখন কোনো ব্র্যান্ড দর্শকের প্রত্যাশিত অভিজ্ঞতায় বাধা সৃষ্টি করে, যেমন খেলার প্রবাহ ভেঙে দেয়, তখন নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে,” বিবিসি-কে বলেছেন তিনি।

ব্রাজিল ও মেক্সিকোর ম্যাচে দেখা গেছে, কখনও কখনও বিজ্ঞাপন দীর্ঘ হয়ে যাওয়ায় সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান খেলার শুরুও মিস করে ফেলেছে।

ফিফা সরাসরি এই বিজ্ঞাপন থেকে অর্থ আয় করছে না। কারণ প্রতিটি দেশে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান আলাদাভাবে বিজ্ঞাপন বিক্রি করছে।

তবে এই অতিরিক্ত আয়ের কারণে বিশ্বকাপ সম্প্রচার স্বত্ব আরও মূল্যবান হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে ফিফা এই স্বত্ব আরও বেশি দামে বিক্রি করতে পারবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।