ফুটবল কেবলই একটা খেলা নয়, এটি কোটি মানুষের আবেগও বটে। আর এই আবেগের পারদ তুঙ্গে ওঠে যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের ক্ষণ আসে। প্রতি চার বছর পর পর যখন এই মহাযজ্ঞের আসর বসে, তখন বিশ্বজুড়ে আলোড়ন পড়ে যায়। কিন্তু একটা দলের ওপর চাপটা থাকে একটু অন্যরকম- তারা হলো ‘স্বাগতিক দল’। নিজের দেশের মাটিতে, চেনা দর্শকদের গর্জনের সামনে খেলার অভিজ্ঞতা যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনই স্নায়ুচাপেরও। ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, এই স্বাগতিক তকমাটা কখনো কোনো দেশের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে, আবার কখনো বুকভাঙ্গা বেদনার কারণ হয়েছে।
ইতিহাসের আয়নায় স্বাগতিকদের দাপট ও ট্র্যাজেডি
বিশ্বকাপের ইতিহাস ঘাঁটলে একটা বিষয় পরিষ্কার- ঘরের মাঠের সুবিধা বা ‘হোম অ্যাডভান্টেজ’ বলে সত্যিই কিছু একটা আছে। ১৯৩০ সালে প্রথম বিশ্বকাপে নিজেদের মাটিতেই চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল উরুগুয়ে। এরপর ১৯৩৪ সালে ইতালি, ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড, ১৯৭৪ সালে পশ্চিম জার্মানি, ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনা এবং ১৯৯৮ সালে ফ্রান্স- সবাই ঘরের মাঠে চেনা দর্শকদের সামনে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছিলো।
গ্যালারি ভর্তি হাজার হাজার আপন মানুষের গর্জন যখন বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখন ফুটবলারদের পায়ে যেন অদৃশ্য শক্তি ভর করে। তবে এই ইতিহাস সবসময় সুমধুর নয়। ১৯৫০ সালে ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে ব্রাজিলের হার, কিংবা ২০১৪ সালে জার্মানির কাছে সেই ৭-১ গোলের দুঃস্বপ্ন- স্বাগতিক হওয়ার নির্মম ট্র্যাজেডিও ফুটবল বিশ্ব দেখেছে।
২০০২: কোরিয়ার সেই রূপকথা ও এশিয়ান গর্জন
স্বাগতিকদের সাফল্যের কথা বললে ফুটবলের ইতিহাসে ২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়ার গল্পটা আলাদাভাবে লিখতেই হবে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ আয়োজনে বসা সেই বিশ্বকাপে কোরিয়া যা করে দেখিয়েছিল, তা ছিলো রূপকথার চেয়েও অবিশ্বাস্য। ফুটবল বোদ্ধাদের সব হিসাব-নিকাশ ওলটপালট করে দিয়ে সেবার সেমিফাইনালে উঠেছিল তারা।
লাল রঙের জার্সি গায়ে লাখো কোরিয়ান সমর্থক যখন ‘রেড ডেভিলস’ সেজে স্টেডিয়ামে লাল সমুদ্রের সৃষ্টি করতো, তখন প্রতিপক্ষ দলগুলোর বুক কেঁপে উঠতো। গাস হিডিংকের জাদুকরী কোচিং আর পার্ক জি-সুংদের অবিশ্বাস্য গতি ও উদ্যমে একে একে কুপোকাত হয়েছিল পোল্যান্ড, পর্তুগাল, ইতালি এবং স্পেনের মতো বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিরা। রেফারির কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, কোরিয়ার সেই লড়াই ছিলো মনে রাখার মতো। এশিয়ান কোনো দল ফুটবল বিশ্বকাপে এতটা পথ পাড়ি দিতে পারে, তা কোরিয়া দেখানোর আগে কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। সেই বিশ্বকাপ প্রমাণ করেছিল, গ্যালারির আবেগ কীভাবে একটা গড়পড়তা দলকে অপরাজেয় শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে।
২০২৬ বিশ্বকাপ: তিন স্বাগতিকের এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জ
ইতিহাসের চাকা ঘুরে আমরা এখন দাঁড়িয়ে আছি ২০২৬ বিশ্বকাপে। এবারের আসরটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অনন্য, কারণ এবার কোনো একক দেশ নয়, বরং উত্তর আমেরিকার তিন দেশ- যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা যৌথভাবে এই মহাযজ্ঞের আয়োজন করছে। প্রথমবারের মতো ৪৮টি দল নিয়ে আয়োজিত এই বিশ্বকাপে এই তিন স্বাগতিকের অবস্থা কেমন?
তিন স্বাগতিকের মধ্যে মেক্সিকোর ফুটবল ঐতিহ্য সবচেয়ে সমৃদ্ধ। এর আগেও তারা দুবার (১৯৭০ ও ১৯৮৬) বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। বিখ্যাত ‘আজতেকা স্টেডিয়ামে (বর্তমানে মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়াম)’ যখন মেক্সিকানরা ঢেউ তোলে, তখন প্রতিপক্ষের টিকে থাকা দায় হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে মেক্সিকোর পারফরম্যান্সে কিছুটা ধারাবাহিকতার অভাব দেখা গেছে। ঘরের মাঠে সেই চেনা আবেগ কি পারবে তাদের কোয়ার্টার ফাইনালের জুজু কাটাতে? দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করা মেক্সিকো দক্ষিণ কোরিয়াকে ১-০ গোলে পরাজিত করে রাউন্ড অব ৩২ খেলা নিশ্চিত করেছে। দাপট না দেখাতে পারলেও মেক্সিকো আছে সঠিক পথেই।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবল বা ‘সকার’ এখন আর আগের মতো অবহেলিত নয়। ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকদের মতো একঝাঁক তরুণ ও প্রতিভাবান ফুটবলার নিয়ে এবারের টুর্নামেন্টে খেলছে তারা, যাদের অনেকেই ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোতে খেলেন। ঘরের মাঠে এই তরুণদের ওপর চাপ আকাশচুম্বী। তারা কি পারবে ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপের চেয়েও ভালো কিছু করে দেখাতে? সেই প্রশ্নের উত্তর ভালোভাবেই লিখতে শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। লাতিন আমেরিকার প্যারাগুয়েকে ৪-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ মিশন শুরু করেছে দলটি।
তিন দেশের মধ্যে কানাডাকে সেভাবে ফুটবল পরাশক্তি বলা চলে না। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বিশ্ব ফুটবলের মানচিত্রে নিজেদের জানান দিয়েছে। আলফনসো ডেভিসের মতো বিশ্বমানের তারকাও তৈরি করেছে দেশটি। ঘরের মাঠের বৈরী আবহাওয়া আর দর্শকদের নিঃশর্ত সমর্থনকে পুঁজি করে কানাডা বড় কোনো অঘটন ঘটিয়ে দিলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র করলেও কাতারকে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত করে গ্রুপ বি এর শীর্ষে এখন স্বাগতিক কানাডা। আর্জেন্টাইন সুপারস্টার লিওনেল মেসি ছাড়া চলমান বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা অপর ফুটবলার কানাডার- জোনাথন ডেভিড।
ফুটবল বিশ্বকাপ আসলে মাঠের এগারো জন খেলোয়াড়ের চেয়েও বেশি কিছু। এটি একটি দেশের পতাকা, কোটি মানুষের প্রার্থনা আর গ্যালারির হাসি-কান্নার গল্প। ২০২৬ সালের এই তিন স্বাগতিকদের জন্য টুর্নামেন্টটি কেবল নিজেদের প্রমাণ করার নয়, বরং ঘরের মাঠে ফুটবলকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার এক ঐতিহাসিক সুযোগ।
২০০২ সালের কোরিয়ার সেই অবিশ্বাস্য লাল সমুদ্রের গর্জন কি মেক্সিকো সিটি, লস অ্যাঞ্জেলেস কিংবা টরন্টোর রাস্তায় ফিরে আসবে? ইতিহাস বলে, ঘরের মাঠের হাওয়া যদি একবার পালে লাগে, তবে যেকোনো অসম্ভবকেই সম্ভব করা যায়। তিন স্বাগতিক দেশের কোটি কোটি চোখ এখন মাঠের সবুজ ঘাসে, যেখানে লেখা হবে ফুটবলের নতুন কোনও মহাকাব্য।