'এ পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর'

রোনালদোর মুখে এক অদ্ভুত নীরবতা।

পর্তুগাল ১-১ ডি আর কঙ্গো। এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালের প্রথম ম্যাচ। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর শেষের শুরু। বয়স ৪১। ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ‘ফার্স্ট অ্যাক্ট অব দ্য লাস্ট ড্যান্স।’

পৃথিবী অপেক্ষায় ছিলো— আবার সেই পুরনো বিস্ফোরণ হবে, ডি-বক্সের ভেতর সময় থেমে যাবে। হয়তো আবার একজন মানুষ আকাশে উঠে প্রমাণ করবে, জন্মসনদ কেবল কাগজের টুকরো; শ্রেষ্ঠত্বের মানদণ্ড নয়।

কিছুই হলো না।

আলো ছিলো, ক্যামেরা ছিলো, ইতিহাসের আবাহন ছিলো; শুধু সুর উঠলো না।

পর্তুগাল এগিয়েছিল, কিন্তু জিতলো না। রোনালদো মাঠে ছিলেন, কিন্তু এ দৃশ্যের মালিক হতে পারলেন না। ডি আর কঙ্গো ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে এসে একটি পয়েন্ট নিয়ে গেলো। আর রোনালদো দাঁড়িয়ে রইলেন এমন এক সন্ধ্যায়, যেখানে সব আয়োজন ছিলো, শুধু হলো না যা হওয়ার কথা ছিলো।

রোনালদোকে ভুল বোঝা খুব সহজ।

তার মায়াবী ফুটবলে মানবিক মায়া নেই। তিনি মাঠে নামেন দখল নিতে। তার দৌড়ে রুক্ষতা আছে, চোখে আদেশ আছে, উদযাপনে বিনয় নয়—শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা আছে। হাত নেড়ে ভালোবাসা চান না, বুক চিতিয়ে স্বীকৃতি আদায় করেন—সেই তো রোনালদো।

রোনালদো প্রকৃতির উপহার নন। রোনালদো যেন এক সার্থক প্রকল্প।

একজন মানুষ নিজের শরীরকে যেন ল্যাবরেটরিতে নিয়ে পেশি, খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, অপমান, ক্ষুধা, শৃঙ্খলা—সবকিছুকে কেটে, ঘষে, শাণ দিয়ে বানিয়েছেন এক ‘ইঞ্জিনিয়ার্ড বিইয়িং’।  সম্ভবত ফুটবল ইতিহাসে মনুষ্যনির্মিত সবচেয়ে বড় বিস্ময়। ইস্পাতের ওপর লেখা এক আত্মজীবনী।

তাই তাকে মানুষ ভালোবাসার আগে মাপে।

কত গোল? কত ট্রফি? কতগুলো ব্যালন ডি’অর?

এখনো পারেন? আর কতদিন?

এই মাপামাপির ভেতরেই রোনালদোর ট্র্যাজেডি।

রোনালদো পৃথিবীকে বাধ্য করেছেন তাকে সম্মান করতে। রোনালদো পাহাড়। তাকে দেখে মাথা নত হয়, কিন্তু কেউ তার পাশে বসে কাঁদে না। তিনি দুর্গ—দূর থেকে বিস্ময়কর, কাছে গেলে কঠিন। রোনালদো ঈর্ষা জাগান, অনুকরণীয় হয়ে ওঠেন, ভয় জাগান, নিজ হাতে পাহাড় কেটে দশরথ মাঝির মতো উচ্চাকাঙ্ক্ষার সোপান গড়েন।

কিন্তু হৃদয়ের যে নরম ঘর, যেখানে মানুষ মানুষকে যুক্তি ছাড়া রেখে দেয়, সেখানে তার প্রবেশ কখনো সহজ হয়নি।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচের পর তাই রোনালদোর শূন্য দৃষ্টিতে শুধু হতাশা নয়, ছিলো আরও গভীর কিছু। নিজের সৃষ্টি করা মিথের সঙ্গে বেঁচে থাকার ক্লান্তি। নিজের তরুণ ছায়ার সঙ্গে লড়াই করার নিঃসঙ্গতা। পৃথিবীর সামনে বারবার প্রমাণ করতে করতে একটা সময় হয়তো মানুষ নিজের আদালতেই আসামি হয়ে যায়।

৪১ বছর বয়সে প্রতিটি দৌড় সময়ের সঙ্গে দরকষাকষি। প্রতিটি মিস এক-একটি অভিযোগপত্র।

প্রতিটি নীরব ম্যাচে কেউ না কেউ বলে ওঠে—শেষ? সত্যিই শেষ?

এপারে বিধ্বস্ত এই উপকূল, ওপারে আলোকের ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করে চলেছেন লিওনেল মেসি।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনা ৩-০। মেসির হ্যাটট্রিক। ২০০তম আর্জেন্টিনা ম্যাচ। বিশ্বকাপে ১৬ গোল। বয়স ৩৮। অথচ তাকে দেখে মনে হয় না সময় তাকে তাড়া করছে। বরং সময় তার পাশে বসে—নরম, অনুগত, পরাজিত।

মেসির ফুটবলে হাতুড়ির শব্দ নেই। নেই ইস্পাতের ঝনঝনানি। নেই নিজেকে ঘোষণা করার তাড়া। আছে সুর; ঘাসের ওপর দিয়ে আলো সরে যাওয়ার মতো এক সহজতা।

মেসি দৌড়ান না, ভেসে যান। মেসি গোল করেন না, ফুটবল মাঠের বুকে ঐশ্বরিক দৃশ্যের জন্ম দেন। তার পায়ে বল এলে ম্যাচ যেন ভাষা পায়।

মেসি অলৌকিক, কিন্তু দূরের নন। তার ডানা আছে, কিন্তু মাটির গন্ধ হারায় না। তিনি ঐশ্বরিক, কিন্তু অমানবিক নন। তাকে দেখে মানুষ ছোট হয়ে যায় না।

২০২২ বিশ্বকাপের পর মেসির প্রমাণের দায় নেই। তিনি মুক্ত। আর মুক্ত মেসি—সে কী ভয়ংকর সুন্দর, কী মোহময়! তার খেলায় আর দরজা ভাঙার শব্দ নেই; দরজা যেন নিজেই খুলে তাকে স্বাগত জানায়। মেসি রাজত্ব নিতে যান না, রাজ্যাভিষেকের মঞ্চ যেন নিজেই প্রস্তুত হয়ে তার অপেক্ষায় থাকে।

রোনালদোর ‘শেষ নাচ’ সুর খুঁজে ফিরছে। আর মেসির চারপাশে প্রস্তুত হয়ে ঘুরছে বিশ্বকাপের মঞ্চ।

রোনালদো

এই দুই ছবির মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষের হৃদয়ের রাজনীতি।

রোনালদো আমাদের শেখান, মানুষ নিজেই শ্রেষ্ঠত্বের কারিগর। মেসি দেখান, যা কিছু সুন্দর তা স্বতঃস্ফূর্ত; তা কামারশালার উত্তাপে তৈরি করা যায় না।

রোনালদো আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করেন—প্রস্তুত তো?

মেসি জানালার পাশে বসে দেখান—আজও মাটির পৃথিবীতে অপার্থিব সুন্দরের স্লোগান ওঠে।

আর মানুষ? মানুষ রোনালদো হতে চায়, কিন্তু ভালোবাসে মেসিকে।

কারণ রোনালদো ক্ষমতার কল্পনা, মেসি কোমলতার পরিত্রাণ। রোনালদো মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষার আত্মবিশ্বাসী উচ্চারণ, মেসি সাধারণের হৃদয়ের উত্তাপ।

রোনালদো হয়তো হৃদয়ের সম্রাট নন, বিজয়ের প্রত্যয়ী ও নির্মম নির্মাণশ্রমিক। তার অমরত্ব মেসির অমরত্বের মতো হবে না।

মেসি থাকবেন মানুষের বুকের ভেতর আলো হয়ে। রোনালদো থাকবেন দাঁতে দাঁত চেপে বারবার ফিরে আসার প্রেরণা হয়ে। মেসিকে মনে পড়বে মায়ায়, রোনালদোকে মনে পড়বে প্রয়োজনে।

“এ-পৃথিবী একবার পায় তারে, পায় নাকো আর”

আগুনপোড়া রোনালদোকে পৃথিবী আর পাবে না, পাবে না দেবশিশুর হাসিমাখা মেসিকে। একজন ইস্পাতের তৈরি একাকিত্ব, আরেকজন আলোয় মোড়া আপনজন।

“শেষ নাচ”-এর আগে একজন দাঁড়িয়ে উন্মত্ত ঝঞ্ঝার মাঝে, বিশ্বকাপের মঞ্চটা আলোকিত করে রেখেছেন আরেকজন। দুজনের কে বড়, সে প্রশ্ন সম্ভবত এখন অতীত। কাকে বেশি ভালোবাসা হবে, তাও এ পৃথিবী আগেই ঠিক করে নিয়েছে।

তবু সব তর্কের পর, “শেষ নাচ”-এর আগে দুজনের জন্যই হাহাকারটা একই রয়ে যাবে—

ফুটবল তাদের একবার পেয়েছিল, আর পাবে না…