কিলিয়ান এমবাপে কোথায় গিয়ে থামতে পারেন?

জাস্ট ফঁতেঁন, মিশেল প্লাতিনি, জ্যাঁ পিয়ের পাপাঁ, থিয়েরি অঁরি, অলিভিয়ে জিরু।
ফ্রান্স বহু বছর ধরে অসাধারণ সব আক্রমণভাগের ফুটবলার পেয়েছে।

তবে অন্তত গোলের হিসেবে এখন সবার ওপরে উঠে গেছেন কিলিয়ান এমবাপে। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। ২৭ বছর বয়সেই তিনি জিরুকে ছাড়িয়ে পৌঁছেছেন ৫৮ আন্তর্জাতিক গোলে।

জিরু ছিলেন ম্যাচ বিশ্লেষকের ভূমিকায়। তিনি বলেন,
“অভিনন্দন কিলিয়ান। আমি ওর জন্য খুব খুশি। এটা হওয়ারই ছিল। ও প্রত্যাশা পূরণ করেছে। আমার মনে হয় ও সব রেকর্ড ভেঙে ফেলবে। ম্যাচ সংখ্যা, গোল সংখ্যা সব। খুব সহজেই ১০০ গোলে যেতে পারে। এমনকি বিশ্বকাপে মিরোস্লাভ ক্লোসের রেকর্ডও ভাঙতে পারে, যেখানে ভাগ বসিয়েছেন মহাতারকা লিওনেল মেসি। বড় ম্যাচ আর বিশ্বকাপে ও সবসময়ই নিজেকে প্রমাণ করেছে।”

ফ্রান্সের হয়ে মাত্র ৯৯ ম্যাচ খেলেই এমবাপের ৫৮ গোল। সেনেগালের বিপক্ষে সেই গোলগুলো তাকে বিশ্বকাপেও ১৪ গোলে নিয়ে গেছে। আর মাত্র দুই গোল করলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলবেন ক্লোসা ও মেসির ১৬ গোলের বিশ্বকাপ রেকর্ড।

যদিও মেসি এখনও খেলছেন, তাই এবারের বিশ্বকাপেই একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা যাবে ২০১৮ বিশ্বকাপজয়ী ও ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ীদের মধ্যে।

জিরু আরও বলেন,
“অনেক সতীর্থ আমাকে ওকে নিয়ে জিজ্ঞেস করে। আমার কাছে উত্তরটা হলো, উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর আত্মবিশ্বাস। ও জানে কোথায় যেতে চায়। ও একজন নেতা। ছোটোবেলা থেকেই ওকে খুব স্বচ্ছন্দ আর বয়সের তুলনায় পরিণত মনে হতো। ও খুব ভালো সতীর্থ এবং অসাধারণ প্রতিভা। মাঠে ও মাঠের বাইরে দুই জায়গাতেই সত্যিকারের নেতা।”

ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক জুলিয়েন লরঁর বিশ্বাস, এমবাপে একদিন দেশের ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন।

তিনি বলেন,
“এখনও ওর অনেক কিছু দেওয়া বাকি। যদি আজই মূল্যায়ন করি তাহলে জিনেদিন জিদান আর মিশেল প্লাতিনি এখনও ফ্রান্সের ইতিহাসের সেরা দুই ফুটবলার। তবে এরপরই থাকবে এমবাপে। থিয়েরি অঁরি, আন্তোয়ান গ্রিজমান, অলিভিয়ে জিরু কিংবা পুরোনো প্রজন্মের রেমোঁ কোপারও আগে।”

তার মতে, বিষয়টা শুধু গোল নয়। মাঠে অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব, ২০১৮ সালে বিশ্বকাপ জেতা, ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা সবকিছু মিলিয়েই এমবাপেকে আলাদা করে।

“আমার বিশ্বাস ক্যারিয়ার শেষে ও এক নম্বরে থাকবে। এই বিশ্বকাপের পরও অন্তত আরেকটি বিশ্বকাপ আর ইউরো খেলার সুযোগ থাকবে। সম্ভবত ও আমাদের দেখা সেরা ফরাসি ফুটবলার হবে।”

এমবাপের আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের মার্চে। তবে প্রথম গোল আসে চতুর্থ ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৪ শূন্য জয়ে।

সেদিনই প্যারিস সাঁ জার্মাঁ ঘোষণা দিয়েছিল ১৮ বছর বয়সি এই স্ট্রাইকারকে মোনাকো থেকে ধারে নেওয়ার। পরে প্রায় ১৬৫ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ডে স্থায়ীভাবে দলে নেয় তাকে। ফলে এমবাপে হয়ে যান ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি কিশোর।

তখনই তিনি জাতীয় নায়ক হয়ে উঠেছিলেন।

২০১৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন। বিশ্বকাপে গোল করা সর্বকনিষ্ঠ ফরাসি খেলোয়াড় হন। আর ফাইনালে গোল করা দ্বিতীয় কিশোর ফুটবলার হিসেবে নাম লেখান পেলের পাশে।

রাশিয়ায় যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়ে টুর্নামেন্টের সেরা তরুণ খেলোয়াড়ের পুরস্কারও জেতেন।

২০২২ বিশ্বকাপে এসে তিনি হয়ে ওঠেন ফ্রান্সের সবচেয়ে বড় ভরসা। মাত্র ২৩ বছর বয়সে তিনি বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা দ্বিতীয় খেলোয়াড় হন। প্রথম ছিলেন ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্ট। যদিও আর্জেন্টিনার কাছে টাইব্রেকারে হেরে যায় ফ্রান্স।

প্রজেক্ট এমবাপে

এমবাপে এবং তার পুরো পরিবার শুরু থেকেই জানত, তারা তাকে বিশ্বের সেরাদের কাতারে দেখতে চায়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় ‘প্রজেক্ট এমবাপে’।

শৈশবের বন্ধু রায়ান ভিয়াঙ্গা বলেন,
“কিলিয়ানের জীবন ছিল স্কুল আর ফুটবল। স্কুল, ফুটবল, বাড়ি।”

১৯৯৮ সালে প্যারিসের উপকণ্ঠের বঁদিতে তার জন্ম। ঠিক পাঁচ মাস আগে প্রথমবার বিশ্বকাপ জিতেছিল ফ্রান্স।

তাদের বাসা থেকে দেখা যেত এ এস বঁদির মাঠ। তার বাবা উইলফ্রিড সেখানে খেলোয়াড় থেকে কোচ হয়েছিলেন।

বন্ধুর ভাষায়,
“কিলিয়ান বয়সিদের চেয়ে সবসময় এক ধাপ এগিয়ে ছিল। ও সবসময় সেরাদের সঙ্গে খেলতে চাইত। এটা ছিল ওর নিজের নিয়ম।”

জুলিয়েন লরঁ বলেন,
“তিন বছর বয়সেই সে ফরাসি জাতীয় সংগীত মুখস্থ করেছিল। কারণ একদিন জাতীয় দলের হয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে সেটা গাইবে এই স্বপ্ন তার ছিল।”

তার মা ফায়জা লামারি ছিলেন পেশাদার হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। ছোটোবেলায় এমবাপে নিজের ঘরে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ছবি টাঙিয়ে রাখতেন এবং জিনেদিন জিদানের পুরোনো ভিডিও দেখতেন।

তবে সবচেয়ে বড় প্রভাব এসেছিল পরিবারের ভেতর থেকেই। তার দত্তক ভাই জিরেস কেম্বো একোকো আগে ক্লেয়ারফঁতেঁনের জাতীয় একাডেমিতে সুযোগ পেয়েছিলেন এবং পরে রেঁর হয়ে খেলেন।

ফরাসি ফুটবল বিশ্লেষক ম্যাট স্পিরো বলেন,
“শুরুতে ক্লেয়ারফঁতেঁনে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়েছিল। প্রথম বছরে সে সেরা ছিল না। উইংয়ে খেলত এবং মাঝে মাঝে মন খারাপ করে থাকত। পরে দ্রুত শারীরিকভাবে বেড়ে ওঠে এবং দ্বিতীয় বছরে সবাই বুঝতে শুরু করে বিশেষ কিছু আসছে।”

তার প্রতিভা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে মাত্র ১০ বছর বয়সেই নাইকি তাকে বিনা মূল্যে বুট পাঠাতে শুরু করে।

ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর নজরে থাকা এমবাপে ১৪ বছর বয়সে নিজের এলাকা ছেড়ে যোগ দেন মোনাকোয়। চেলসি ও রিয়াল মাদ্রিদ আগ্রহ দেখালেও পরিবার চেয়েছিল কিশোর বয়সে সে ফ্রান্সেই থাকুক।

১৬ বছর ৩৪৭ দিনে মোনাকোর ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সি খেলোয়াড় হন তিনি। রেকর্ডটি আগে ছিল থিয়েরি অঁরির। তিন মাস পর ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে কম বয়সি গোলদাতাও হন এবং সেখানেও অঁরির রেকর্ড ভাঙেন।

লরঁ বলেন,
“মোনাকোয় ওর উত্থান দেখেই বোঝা গিয়েছিল এটা আলাদা ধরনের প্রতিভা।”

অহং থেকে নেতৃত্বে

মোনাকোয় যোগ দেওয়ার পর একবার খেলোয়াড়দের নিজেদের ছবি দিয়ে একটি ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ বানানোর কাজ দেওয়া হয়েছিল।
অনেকে ক্রীড়া সাময়িকী বা জনপ্রিয় ম্যাগাজিন বেছে নিয়েছিল। এমবাপে বেছে নিয়েছিলেন টাইম ম্যাগাজিন।

শিরোনাম লিখেছিলেন একটি শব্দ
‘এল মায়েস্ত্রো’
অর্থাৎ ‘দ্য মাস্টার’।

চার বছরের মধ্যেই বিশ্বকাপ জয় আর বিশ্বকাপ ফাইনালে কিশোর হিসেবে গোল করার পর সত্যিই টাইম ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে জায়গা করে নেন তিনি।

এই বড় করে ভাবার ক্ষমতাই ‘প্রজেক্ট এমবাপে’ ধারণাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। তবে এত আলোচনার সঙ্গে আসে আত্মবিশ্বাস আর অহংয়ের প্রশ্নও।

পিএসজির সাবেক পারফরম্যান্স পরিচালক মার্টিন বুকহাইট বলেন,
“সফলতার জন্য কিছুটা অহং দরকার। কিন্তু সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখাটাই গুরুত্বপূর্ণ। কিলিয়ানের সবসময় সেই নিয়ন্ত্রণ ছিল না। তবে তার পরিবার, বিশেষ করে মা বাবা তাকে সঠিক পথে রেখেছেন।”

২০২৩ সালে দিদিয়ের দেশঁ তাকে ফ্রান্সের অধিনায়ক করেন। এখনও তার ট্রফি ক্যাবিনেটে নেই চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা। নেই ব্যালন ডি অরও।

তবু মনে হচ্ছে প্রজেক্ট এমবাপের পথচলা এখনও শেষ হয়নি।

জুলিয়েন লরঁর শেষ মন্তব্য ছিল এমন
“সে খুব নিজের প্রতি মনোযোগী ছিল। কিন্তু অধিনায়ক হওয়ার পর বুঝেছে তাকে সত্যিকারের নেতা হতে হবে। শুধু গোল বা অ্যাসিস্ট নয়। আমি অবাক হব যদি ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার আগে সে অন্তত একটি ব্যালন ডি অর আর একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ না জেতে। আর ট্রফি আর রেকর্ডের হিসেবে হয়তো একদিন জিদান আর প্লাতিনিকেও ছাড়িয়ে যাবে।”