মেসি-রোনালদো যেভাবে বদলেছেন নিজেকে

চার্লস ডারউইন বলেছিলেন সার্ভাইভাল অফ দ্য ফিটেস্টের কথা। অর্থাৎ, যে দুর্বল, সে টিকে থাকতে পারবে না, বরঞ্চ টিকে থাকতে পারবে তারাই, যারা নিজেদের বদলাতে জানে, জানে কীভাবে খাপ খাইয়ে নিতে হয় বিরূপতার সঙ্গে।

ডারউইনের কথাকে সত্য প্রমাণ করেই লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো হয়ে উঠেছেন ফুটবলের দুই মহাতারকা। আজকের যে দুজনকে আমরা দেখি টিভির পর্দায়, সে দুইজনকে আপনি কোনোভাবেই মেলাতে পারবেন না তাদের শুরুর সময়ের সঙ্গে। ফেরা যাক দুই দশক আগে, যখন দুজনই কেবলই ডানা মেলছিলেন ফুটবল জগতে।

রোনালদো তখন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে, মেসি বার্সেলোনায়। কিন্তু খেলার ধরণে একটা মিল আপনার চোখে পড়তে বাধ্য – দুজনেই দারুণ গতিতে ড্রিবল করে ডিফেন্ডারদের পাশ কাটাতে পছন্দ করেন, এবং সেই কাজে দুজনই রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য, ফুলব্যাকদের জন্য ত্রাস। সঙ্গে যোগ করুন গোল করার ক্ষমতা – রোনালদো ২০০৭-০৮ মৌসুমে ৩১ গোল করে ভাঙ্গলেন প্রিমিয়ার লিগের এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড, জিতলেন ব্যালন ডি’অর। পরের বছর সেটি উঠলো মেসির হাতে, লা লিগায় ২৩ গোল ও ১১ অ্যাসিস্ট করে।

এরপর থেকে সময় যত গড়িয়েছে, দুজনেই গোলমুখে অনেকটা দৈবের মতোই হাজির হয়েছেন – যত যা-ই হোক না কেনো, গোল তারা করবেনই, মেসি তো ২০১২ সালে গার্ড মুলারের রেকর্ড ভাঙলেন ৯১ গোল করে।

তবে, ফুটবলারদের জীবনটাই এমন, যে আপনি সর্বকালের সেরাদের মধ্যে থাকলেও চোট আপনাকে ছাড়বে না, এবং সেই চোট পাওয়ার পর আপনি কী করবেন, সেটিই আসলে আপনার ক্যারিয়ারের গতিপথ নির্ধারণ করে দেবে।

রোনালদোর বড় চোটটা আসে সেই ২০০৭-০৮ মৌসুম শেষ হবার পরেই, গোড়ালিতে অস্ত্রোপচারের পর বসে থাকতে হয় প্রায় আড়াই মাস। সেই গোড়ালি চোট আবার ফিরে আসে বছরখানেক পর, রিয়াল মাদ্রিদে প্রথম মৌসুমে, বসে থাকতে হয় আরও মাস দেড়েক। একজন ড্রিবলার, যার মূল কাজই দ্রুত পায়ের কাজ দিয়ে ডিফেন্ডারকে ফাঁকি দেয়া, তার জন্য গোড়ালির চোট রীতিমতো বিভীষিকা।

তবে রোনালদো বলেই কিনা, পালটে ফেললেন নিজেকে। ড্রিবল করা কমিয়ে দিলেন, উইং থেকে সরে আসলেন পেনাল্টি বক্সে, হয়ে উঠলেন দারুণ গোলস্কোরার। ড্রিবলিংয়ের যা-ও বা বাকি ছিল, ২০১৬ ইউরোতে পাওয়া লিগামেন্টের চোট নিশ্চিত করে দিলো, সেই পথে ফেরাটা মুশকিল। রোনালদো তাই প্রায় পুরোদস্তুর স্ট্রাইকারই হয়ে উঠলেন, গোলের পর গোল করলেন, সেই চোটের পরের মৌসুমেই ব্যালন ডি’অর জিতলেন আবারও, চতুর্থ বারের মতো।

মেসির ড্রিবলিংয়ে তেমন আঁকিবুঁকি বা পায়ের কাজ নেই, তবে তার ছিলো অ্যাক্সেলারেশন। মুহূর্তের মধ্যে মেসির বল পায়ে দৌড়ের গতি বেড়ে যেতো কয়েক গুণ, যাতে তাকে ধরা হয়ে পড়তো প্রায় অসম্ভব।

কিন্তু ২০১৩-১৪ মৌসুমে মেসির হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়ে একবার, এরপর ছিড়ে যায় সেখানকার মাংসপেশী। দুই চোট মিলিয়ে প্রায় তিন মাস বাইরে থাকার পর, মেসির পক্ষে নিয়মিতভাবে অ্যাক্সেলারেট করাটা হয়ে পড়ে প্রায় অসম্ভব। তাই নিজেকে বদলে নেন তিনি, তবে রোনালদোর চেয়ে ভিন্নভাবে।

রোনালদো যেখানে গোল করায় মনোযোগ দেন, মেসি মনোনিবেশ করেন গোল তৈরিতে। পেপ গার্দিওলার অধীনে ফলস নাইন হিসেবে মাঝমাঠে খেলার অভ্যাসটা তৈরি ছিলোই, মেসি এরপর ধ্যান দিলেন সেই অস্ত্র শানাতে।

মেসির গোলস্কোরিং কমেনি এতে, কিন্তু ড্রিবল করে বক্সে ঢোকার বদলে, গোলের সংখ্যা বাড়তে লাগলো বক্সের বাইরে থেকে, বাড়তে থাকলো অ্যাসিস্টের সংখ্যাও। মিডফিল্ড থেকে জর্দি আলবার দিকে লং বল দিয়ে দৌড়ে গিয়ে বক্সের কোণা থেকে গোল করছেন – এমন দৃশ্য তো বার্সেলোনা ভক্তদের জন্য হয়ে গিয়েছিল নিয়মিত ব্যাপার।

দুজনের পরিবর্তনটা হয়েছে দুই দিকে, একজন বনে গিয়েছেন পুরোদস্তুর স্ট্রাইকার, আরেকজন সরে এসেছেন মাঝমাঠে, হয়ে গিয়েছেন অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার। মেসি পরিণত হয়েছেন দলের নিউক্লিয়াসে, যাকে কেন্দ্র করে ঘোরে খেলা, আর রোনালদো নিজেকে বদলে নিয়ে গিয়েছেন আক্রমণের শেষভাগে, করেছেন গোলের পর গোল।

আর এখানেই এই দুজন বাকিদের থেকে আলাদা। চোটের কারণে ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে গিয়েছে, এমন ফুটবলারের সংখ্যা তো কম নয়। শুধু সাধারণরা নন, নেইমার কিংবা এডেন হ্যাজার্ডের মতো খেলোয়াড়রাও তাদের প্রতিভার প্রতি সুবিচার করতে পারেননি চোটের কারণে। কেনো? কেননা, চোটের পরেও নিজেদের নতুন করে উদ্ভাবন করার চেষ্টা করেননি তারা, বরঞ্চ চেষ্টা করেছেন সেই আগের মতোই খেলতে। নেইমার ড্রিবলিং করা ছাড়তে পারেননি, পারেননি অল্প জায়গা থেকে কাটিয়ে বের হওয়ার অভ্যাস, তাতে ট্যাকেল সহ্য করেছেন বেশি, কিন্তু সহ্য করেনি শরীর। এবারের বিশ্বকাপে হয়তো তিনি আছেন, কিন্তু জোড়াতালি দিয়ে, চোটজর্জর হয়ে কোনোভাবে।

হ্যাজার্ডের তো ক্যারিয়ারই শেষ হলো রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর থেকে। ওজন তো বেড়েছিল-ই, তবে সেটি কমানোর সুযোগ ছিল, কিন্তু সুযোগ ছিল না চোট থেকে ফেরার পর একইভাবে খেলে যাওয়ার, সেই দুর্দান্ত ড্রিবলার থাকার। কিন্তু তিনি সেটিকে বদলাতে পারেননি, পরে আর ফিরতেও পারেননি আগের রূপে, শেষ পর্যন্ত নিতে হয়েছে অবসর।

মেসি এবং রোনালদো বাকিদের থেকে আলাদা এখানেই। চোট এসেছে, বিপত্তি এসেছে, তাতে ঘাবড়ে না গিয়ে, নিজেদের পরিবর্তন করেছেন তারা, যেনো টিকে থাকতে পারেন। এবং তাতেই এসেছে সাফল্য, নিজেদেরকে নিয়ে গেছেন তারা সাফল্যের চূড়ায়, ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য উদাহরণ তৈরি করে গিয়েছেন, যে কীভাবে মহাতারকা হতে হয়।