সে এক হিরণ্ময় সন্ধ্যের আখ্যান!
মেক্সিকো সিটির আকাশে একে একে জ্বলে উঠছিলো আলো। ড্রোন প্রস্তুত। আতশবাজি প্রস্তুত। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবের উদ্বোধন শুরু হতে আর খুব বেশি বাকি নেই।
তারপর তাকে দেখা গেলো। প্রশস্ত বুক, রোদে পোড়া তামাটে চামড়া। মাথায় রঙিন পালকের মুকুট। হাতে বর্শা।
মুহূর্তের জন্য মনে হয়, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পারফরমার নয়, বরং ইতিহাসের ভুলে যাওয়া কোনো যোদ্ধা। যেন কয়েক শতাব্দীর পথ হেঁটে হঠাৎ এসে দাঁড়িয়েছেন একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
হাজার ড্রোনের নিচে দাঁড়িয়ে মানুষটিকে অদ্ভুতভাবে একা লাগছিল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া উৎসবে নয়, বরং ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ যাত্রার শেষে এসে দাঁড়িয়েছে।
তার চারপাশে আলো ছিলো, সঙ্গীত ছিলো, উল্লাস ছিলো। তবু তাকে দেখে মনে হয়, হারিয়ে যাওয়া এক জগতের শেষ শিকারি!
এমন এক মানুষ, যার পূর্বপুরুষেরা জঙ্গলের ভেতর নক্ষত্র দেখে পথ চিনতো। আর যার উত্তরসূরিরা আজও পথ খোঁজে। শুধু নক্ষত্রের জায়গা নিয়েছে স্টেডিয়ামের আলো।
সেই আলোর নিচে শাকিরা গাইছিলেন বিশ্বকাপের সুর। লিলা ডাউনস গাইছিলেন মেক্সিকোর বহু শতাব্দীর সাংস্কৃতিক স্মৃতির সুর। হাজারো মানুষ উল্লাস। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উৎসবের এতো আয়োজনের মাঝেও চোখ বারবার টেনে নেয় সেই পালক পরা মানুষটির দিকে।
কারণ একসময় এই ভূখণ্ডে মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে সময় মাপতো। নক্ষত্রের চলন থেকে ক্যালেন্ডার বানাতো। জঙ্গলের বুক চিরে নগর গড়তো। পৃথিবী তাদের চিনতো ‘মায়া’ নামে।
তারপর এলো জাহাজ, এলো সাম্রাজ্য, এলো ক্রুশ, এলো বারুদ। আর হারিয়ে গেলো অনেক কিছু। কিন্তু সব কি আর মুছে যায় কোনোদিন!
সে কারণেই হয়তো ২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান কেবল একটি ফুটবল উৎসবের সূচনা বলে মনে হয় না। মনে হয়, এক সভ্যতার আত্মস্মরণ। অথবা এক চির অপূর্ণতার নিয়মতান্ত্রিক প্রত্যাবর্তন।
নিয়তি কি অদ্ভুত না!
বিশ্বকাপ বারবার মেক্সিকোয় ফিরে আসে। ১৯৭০, ১৯৮৬, ২০২৬। পেলের অমরত্ব এই মাটিতে। ম্যারাডোনা’র ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’ এই মাটিতে। ‘হ্যান্ড অব গড’ এই মাটিতে। ফুটবল ইতিহাসের সব কিংবদন্তির জন্ম ‘মায়া’দের এই মাটিতে।
কিন্তু ট্রফি কখনো মেক্সিকোর হয়নি। ইতিহাস তাকে বারবার মঞ্চ দিয়েছে। মুকুট দেয়নি। হয়তো সেই কারণেই মেক্সিকোর সঙ্গে ফুটবলের সম্পর্ক অপেক্ষার, মায়া বা ইলুশনের!
মেক্সিকো যেন দুই ‘মায়া’কে বুকে নিয়ে চলে। এক তো সভ্যতার, অন্যটা অনুভূতির। একটি ইতিহাসের, আরেকটি আকাঙ্ক্ষার!
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যখন পালক পরা যোদ্ধারা নাচছিল, স্টেডিয়ামের বাইরে তখন আরেক মেক্সিকো ছিলো। প্রতিবাদ ছিলো, ব্যারিকেড ছিলো। হারিয়ে যাওয়া মানুষের ছবি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা পরিবার ছিলো।
এক সন্ধ্যায় দুই রঙের দুটি মেক্সিকো। একটি উদ্যাপন করছে, আরেকটি এখনো খুঁজছে। হয়তো এই কারণেই দেশটি এতো মানবিক। কারণ তার গল্প এখনো শেষ হয়নি!
এদিকে আমেরিকা আসছে তার চিরপরিচিত আত্মবিশ্বাস নিয়ে।
কেটি পেরি, লিসা, আনিত্তা, রেমা—হলিউড, পপ সংস্কৃতি আর বৈশ্বিক প্রভাবের এক বিশাল মঞ্চ। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী সাংস্কৃতিক যন্ত্রটি নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
অন্যপাশের কানাডার মঞ্চে ছিল এক ভিন্ন দৃশ্য। মাইকেল বুবলে, অ্যালানিস মরিসেট, অ্যালেসিয়া কারা, নোরা ফাতেহি। নানা উচ্চারণ, নানা শিকড়, নানা গল্প। যেন পৃথিবীর বহু নদী এসে একটি হ্রদে মিলছে। একই পতাকার নিচে দাঁড়ালেই একই রকম হওয়ার দায় নেই—কানাডা এটাই বলছিল।
তিনটি দেশ, তিনটি ভিন্ন আত্মা। একটি বিশ্বকাপ। আমেরিকা স্বভাবমতোই দেখিয়েছে ক্ষমতা। কানাডা বাজিয়েছে সহাবস্থানের সুর। আর মেক্সিকো!
মেক্সিকো দেখিয়েছে কীভাবে হৃদয় হয়ে উঠতে হয়। তিন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে গভীর, প্রাণ থেকে উৎসারিত গল্পটি মেক্সিকোর।
কারণ ক্ষমতা বিস্ময় তৈরি করতে পারে, সহাবস্থান স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু অপূর্ণতা মানুষের হৃদয়ে অন্যরকম জায়গা করে নেয়।
মায়ারা সময়কে ক্যালেন্ডারে বন্দি করেছিল। মায়াদের উত্তরসূরিরা আজও সময় গোনে। শুধু এখন তারা চার বছর পরপর বিশ্বকাপের অপেক্ষা করে।
বিশ্বকাপ শেষ হবে। হয়তো এবারেও আরেক চ্যাম্পিয়ন ট্রফি নিয়ে চলে যাবে।
আতশবাজি নিভে যাবে, ড্রোন নেমে আসবে, অ্যচজটেকা খালি হয়ে যাবে।
তারপর... হয়তো সেই পালক পরা মানুষটিও মঞ্চ ছেড়ে চলে যাবে। ক্যামেরা আর তার দিকে ফিরবে না। পৃথিবীও না।
সেই রাতে বাড়ি ফেরার পথে তিনি হয়তো আবার আকাশের দিকে তাকিয়েছিলেন। যেমন তার পূর্বপুরুষেরা তাকিয়েছিল পাঁচশ বছর আগে।
হয়তো সেই একই আকাশ। হয়তো একই নক্ষত্র। শুধু পৃথিবী বদলে গেছে। সাম্রাজ্য বদলেছে। মানচিত্র বদলেছে। বিশ্বকাপ এসেছে। বিশ্বকাপ চলে যাবে।
কিন্তু সেই মানুষটি তখনো দাঁড়িয়ে থাকবে সময়ের দীর্ঘ নদীর তীরে। মাথায় কিছু পালক নিয়ে। এক ‘মায়াবী’ গল্প নিয়ে। এক সভ্যতার স্মৃতি নিয়ে।
ইতিহাস তাকে বারবার মঞ্চ দিয়েছে।
মুকুট দেয়নি।
তবু সে বারবার ফিরে ফিরে এসেছে!