বিশ্বকাপ ২০২৬

লাল কার্ডের ঝড়, মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে গোলের গল্পে বিশ্বকাপের উদ্বোধন

বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচ মানেই উৎসব, রঙ, আবেগ আর ইতিহাসের নতুন অধ্যায়। কিন্তু এ বছরের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যেন গল্পটা শুরু হলো একটু অন্যভাবে। মাঠে ফুটবল ছিলো, ছিলো উত্তেজনা, ছিলো নাটক। আর ছিলো লাল কার্ডের ঝড়।

মেক্সিকো আর দক্ষিণ আফ্রিকার ম্যাচে তিনটি লাল কার্ড দেখলেন দর্শকরা। দক্ষিণ আফ্রিকার ইয়ায়া সিথোলে ও থেম্বা জোয়ানে মাঠ ছাড়েন। পরে যোগ করা সময়ে মেক্সিকোর সিজার মন্টেসও লাল কার্ড দেখেন। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই এমন দৃশ্য অনেককে ফিরিয়ে নিয়ে গেলো দুই দশক আগের স্মৃতিতে।

রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপে পুরো টুর্নামেন্টে লাল কার্ড হয়েছিল মাত্র চারটি করে। অথচ ২০২৬ বিশ্বকাপের শুরুতেই সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেল আসর। সর্বশেষ ২০০৬ বিশ্বকাপে এক ম্যাচে তিনজন খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখেছিলেন। সেই আসরেই পর্তুগাল ও নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত ম্যাচে চারটি লাল কার্ডের রেকর্ড হয়েছিল।

ফিরে আসছে কঠোর শাস্তির যুগ?

২০১৭ সালে ফিফার রেফারিং বিভাগের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে পিয়েরলুইজি কলিনার দর্শনে বদলে গিয়েছিলো ফুটবলের শাস্তির ধারা। তার মতে, লাল কার্ড এমন একটি সিদ্ধান্ত হওয়া উচিত যা সত্যিই ন্যায্যতার দাবি রাখে। ছোটখাটো অপরাধে নয়, বরং গুরুতর অপরাধেই একজন খেলোয়াড়কে মাঠ ছাড়তে হবে।

এর ফল দেখা গেছে সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে। কিন্তু ২০২৬ আসরের প্রথম ম্যাচেই তিনটি লাল কার্ড নতুন প্রশ্ন তুলে দিলো। প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে শাস্তি ছিল পরিষ্কার।

দক্ষিণ আফ্রিকার সিথোলের ফাউল ছিল সরাসরি গোলের সুযোগ নষ্ট করা। মেক্সিকোর ব্রায়ান গুতিয়েরেস যখন একা গোলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাকে থামানোর কারণে লাল কার্ড দেখানো হয়।

তবে থেম্বা জোয়ানের লাল কার্ড নিয়ে তৈরি হয় বিতর্ক। ভিএআর পর্যালোচনার পর তাকে মাঠ ছাড়তে হয়। মেক্সিকোর রবার্তো আলভারাদোর সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় প্রশ্ন ওঠে, সেটি কি ইচ্ছাকৃত আঘাত ছিল, নাকি স্বাভাবিক ধাক্কাধাক্কি। কলিনার কঠোর অবস্থানের কারণে হয়তো এমন আচরণও এখন বেশি নজরে আসছে।

তবে ম্যাচের সবচেয়ে বড় গল্প ছিল লাল কার্ড নয়, ছিল রাউল হিমেনেসের ফিরে আসা।

কয়েক বছর আগেও এই মুহূর্তটা অসম্ভব মনে হতো। ২০২০ সালে মাঠে ভয়াবহ মাথার চোটে মৃত্যুর কাছাকাছি চলে গিয়েছিলেন মেক্সিকোর এই স্ট্রাইকার। মাথার খুলিতে আঘাত নিয়ে দীর্ঘ সময় তাকে ফুটবল থেকে দূরে থাকতে হয়েছিল।

সেই মানুষটিই ছয় বছরেরও কম সময় পর বিশ্বকাপের মঞ্চে দেশের জার্সিতে ফের গোল করলেন।

৮০ হাজার দর্শকের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে মেক্সিকোর দ্বিতীয় গোলটি আসে হিমেনেসের মাথা থেকে। সতীর্থ রবার্তো আলভারাদোর ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে বল জালে জড়ান ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।

গোলের পর তার উদযাপন ছিল আবেগে ভরা। আকাশের দিকে তাকিয়ে যেন স্মরণ করলেন প্রয়াত বাবাকে। সতীর্থরা তাকে ঘিরে ধরলেন, আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না হিমেনেস।

ফুটবল কখনো কখনো শুধু জয় পরাজয়ের গল্প নয়। কখনো এটি ফিরে আসার গল্প, অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প।

২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ তাই শুধু তিন লাল কার্ডের ম্যাচ নয়। এটি একই সঙ্গে একজন ফুটবলারের হার না মানার গল্প, যিনি মৃত্যুর ভয়কে পেছনে ফেলে আবার বিশ্বকাপের আলোয় নিজের নাম লিখলেন।