রম্য

পৃথিবীতে বিশ্বকাপ বলে কিছু নেই, তবে দেখার প্রস্তুতি আছে: বাফুফে

বাফুফে ভবনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স রুমে বেশ থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে আইজ একটা ফাটাফাটি হবে। সভাপতি মহোদয় চশমাটা নাকের ডগায় নামিয়ে টেবিলের ওপর একটা সজোরে চাপড় মারলেন। তার হুঙ্কারে সহ-সভাপতি, প্রধান কোচ, ম্যানেজার, কয়েকজন সিনিয়র খেলোয়াড় এবং চা-সমুচা সরবরাহকারী পিয়ন কাসেম নয় মাত্রার ভূমিকম্পের মত কেঁপে উঠলেন।

"শুনুন সবাই, আজ আমরা এক অতীব জরুরি ও দার্শনিক সংকটের মুখোমুখি,” সভাপতি গম্ভীর গলায় শুরু করলেন। "কয়েকদিন ধরে দেখছি দেশের মিডিয়া আর আমজনতা কী এক 'বিশ্বকাপ' 'বিশ্বকাপ' বলে চিল্লাপাল্লা করছে। আমি আমাদের ডিকশনারি, ফিফা রুলবুক এবং বাফুফের বিগত তিরিশ বছরের ফাইলপত্র ঘেঁটে দেখলাম—বাছাইপর্বের প্রথম রাউন্ডের ওপারে আসলে কোনো দুনিয়া নেই। সুতরাং, তাত্ত্বিকভাবে এবং প্র্যাক্টিক্যালি, 'বিশ্বকাপ' বলে আসলে কিছু নেই। এটা একটা অলীক মায়া!"

টেবিলের চারপাশ থেকে একযোগে টেবিল চাপড়ানোর শব্দ এলো।

কোচ চুইংগাম চিবানো থামিয়ে বললেন, "এক্সাক্টলি বস! আমি তো ছেলেদের প্র্যাকটিসে সবসময় বলি, মাঠের সীমানা যেখানে শেষ, মহাবিশ্বও সেখানে শেষ। এই যে মিডিয়া দেখায়, ৩২টা বা ৪৮টা দেশ গোলকধাঁধার মতো একটা টুর্নামেন্ট খেলছে, এগুলো সব গ্রাফিক্সের কারসাজি। হলিউডের মার্ভেল সিনেমার মতো সায়েন্স ফিকশন।"

ম্যানেজার সাহেব মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বললেন, "ঠিক বলেছেন স্যার। আমরা প্রতি বছর র‍্যাংকিংয়ে ১৮০ থেকে ১৯০-এর মধ্যে নিখুঁতভাবে নিজেদের ধরে রাখি। এটা কি মুখের কথা? কতটা পরিশ্রম করলে একটা দল বছরের পর বছর নিজেদের স্থান থেকে এক চুলও নড়ে না! আর এরা বলে কি না বিশ্বকাপ? আমাদের এই অপরিসীম ত্যাগের পাত্তা না দিয়ে তারা একটা অলীক মায়ার পেছনে ছুটছে।"

এমন সময় এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা পিয়ন কাসেম ট্রের ওপর চায়ের কাপ সাজাতে সাজাতে আমতা আমতা করে বলে উঠল, "কিন্তু স্যার, টিভিতে যে দেখি ট্রফিটা সোনার তৈরি, ওটা দেখতেও তো চকচক করে..."

সভাপতি কাসেমের দিকে করুণার দৃষ্টিতে তাকালেন। "কাসেম, তুমি সরল মানুষ, মায়ার ফাঁদে পা দিয়েছ। ওই ট্রফিটা আসলে একটা মরীচিকা। তুমি কি পড়ো নাই, চকচক করিলেই সোনা হয় না? আমরা যেমন কখনো সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের সেমিফাইনালে ওঠার স্বপ্ন দেখেও ঘুম থেকে উঠে দেখি ড্র করেছি, ওটাও তেমন। যে জিনিসের অস্তিত্ব বাংলাদেশে নেই, তা মহাবিশ্বেই থাকতে পারে না। আজ থেকে বাফুফের অফিশিয়াল পরিভাষায় 'বিশ্বকাপ' শব্দটা নিষিদ্ধ। একে আমরা ডাকবো— 'ফিফা স্পেশাল ইলিউশন' বা 'সোনার হরিণ প্রজেক্ট'।"

মায়া দর্শনের পর বাস্তব প্রস্তুতি

"তবে," সভাপতি একটু থামলেন, গলার টাইটা সামান্য আলগা করে নিলেন। 

"যেহেতু দেশের আপামর জনতা এই মায়ার ঘোরে অন্ধ হয়ে প্রতি চার বছর পর পর আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের পতাকা দিয়ে ছাদ ঢেকে ফেলে, সেহেতু ফুটবল সংশ্লিষ্ট হিসেবে আমাদেরও একটা সামাজিক দায়িত্ব আছে। তারা যখন অলীক মায়া দেখবে, আমরা তো আর ঘরে বসে থাকতে পারি পারি না। আমাদেরও প্রস্তুতি নিতে হবে। তবে আমাদের প্রস্তুতি হবে একদম আলাদা, একদম ইউনিক।"

সভাপতি ফাইল খুলে বাফুফে কর্মকর্তা এবং খেলোয়াড়দের জন্য বিশেষ 'বিশ্বকাপ দর্শন প্রস্তুতি নির্দেশিকা' ঘোষণা করলেন:

১. খেলোয়াড়দের জন্য: 'হাই-কনসেন্ট্রেশন স্ক্রিন ট্র্যাকিং'

"আমাদের খেলোয়াড়দের জন্য আমার প্রথম নির্দেশ—বিশ্বকাপের ম্যাচ চলাকালীন তারা মাঠে যেভাবে বলের পেছনে দৌড়ায়, টিভির সামনেও ঠিক সেভাবে চোখ চালাবে। তবে সাবধান, ভুলেও যেন তারা ভাবা শুরু না করে যে ওভাবে ড্রিবলিং বা পাসিং বাস্তবে করা সম্ভব। খেলায় এমবাপ্পে বা ভিনিসিয়ুস যেভাবে দৌড়ায়, আমাদের খেলোয়াড়রা তা দেখে কেবল 'চোখের ব্যায়াম' করবে। গতি দেখে যদি কারো মাথা ঘোরে, তবে সঙ্গে সঙ্গে জাবর কাটার মতো করে চুইংগাম চিবানো শুরু করবে। মাঠে স্ট্যামিনা না থাক, টিভির সামনে বসে ৯০ মিনিট চোখ খোলা রাখার স্ট্যামিনা অর্জন করতে হবে।"

২. কোচ ও ম্যানেজমেন্টের জন্য: 'অপটিক্যাল ইলিউশন অ্যানালাইসিস'

"কোচিং স্টাফরা ম্যাচগুলো দেখার সময় ডায়েরি নিয়ে বসবেন। তবে কোনো ট্যাকটিক্যাল নোট নেওয়া যাবে না। কারণ ওসব হাই-লেভেল ট্যাকটিক্স আমাদের খেলোয়ারদের ওপর প্রয়োগ করলে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে নিজেদের গোলপোস্টে বল ঢুকিয়ে দিতে পারে। কোচের কাজ হবে, টিভির স্ক্রিনে কীভাবে এত নিখুঁত 'গ্রাফিক্সের কাজ' করা হয়েছে তা ধরা। ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল কেমন, রেফারি কীভাবে ফাউল না দেখেও ফাউল দেয়—এসব অলীক কাণ্ডকারখানার ভুলত্রুটি ধরা হবে আপনাদের মূল কাজ।"

৩. কর্মকর্তাদের জন্য: 'নিউট্রিশনাল অ্যান্ড কালচারাল অ্যাডাপ্টেশন'

"বাফুফের কর্মকর্তাদের জন্য প্রস্তুতি আরও কঠিন। রাত জেগে এই মায়া দর্শন করতে গিয়ে যেন স্বাস্থ্যের অবনতি না হয়, তাই বাফুফের ফান্ড থেকে বিশেষ কাজু বাদাম, পেস্তা বাদাম এবং প্রিমিয়াম কফির ব্যবস্থা করা হবে। কর্মকর্তারা বিভিন্ন ক্লাবে গিয়ে তদারকি করবেন যে খেলা দেখার সময় সাধারণ মানুষ যেন বেশি উত্তেজিত হয়ে স্ট্রোক না করে। তারা জনসাধারণকে বোঝাবেন—'ভাইরে, এটা স্রেফ একটা বিনোদন, একটা এনিমেশন ফিল্ম। জিদানের হেড বা মেসির ফ্রি-কিক—সবই কম্পিউটারে এডিট করা। সুতরাং, রিল্যাক্স!'"

৪. পিয়ন কাসেমের জন্য স্পেশাল ডিউটি

"আর কাসেম, তোমার দায়িত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। রাত ৩টায় যখন অলীক মায়ার ফাইনাল খেলা চলবে, তখন বাফুফে ভবনের ছাদে উঠে আমাদের জাতীয় পতাকার পাশাপাশি একটা বড় সাদা পতাকা উড়িয়ে দেবে। ওটা হবে আমাদের 'নিরপেক্ষতার প্রতীক'। আমরা কোনো দেশের সমর্থক নই, কারণ আমরা তো 'বিশ্বকাপ' নামের এই মায়াজালেই বিশ্বাস করি না!"

সভাপতির বক্তব্য শেষ হতেই কনফারেন্স রুমে তুমুল তালি পড়ল। সবাই আশ্বস্ত হলেন যে, 'যাক! বিশ্বকাপ খেলতে না পারার কোনো গ্লানি তাদের নেই, কারণ টুর্নামেন্টটাই তো ভুয়া!'

মিটিং শেষ করে সবাই যখন বের হয়ে যাচ্ছেন, তখন ম্যানেজার ফিসফিস করে কোচকে বললেন, "আচ্ছা ভাই, ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার খেলাটা কোন চ্যানেলে দেবে জানা আছে?"

কোচ মুচকি হেসে বললেন, "চ্যানেল জানি না, তবে ওই অলীক মায়াটা মিস করা যাবে না। আমি তো অলরেডি জার্সি কিনে ফেলেছি! আপনিও কিনেছেন নিশ্চয়ই!"

 

এটি একটি কাল্পনিক রচনা। এই লেখার ঘটনাপ্রবাহের সাথে বাস্তবের কোন ঘটনার সাথে কিংবা কোন চরিত্রের সাথে সত্যিকারের কোন চরিত্রের মিল খুঁজতে যাবেন না।