এবার কি রোনাল্ডো আর পর্তুগাল এর সময়?

মাত্র চার বছর পর ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট তার শতবার্ষিকী উদযাপন করবে। কিন্তু এই ৯৬ বছরের ১৮টি টুর্নামেন্টে মাত্র আটটি দেশ বিশ্বকাপ শিরোপা জয় করেছে - উরুগুয়ে, ইটালি, জার্মানি, ব্রাজিল, ইংল্যান্ড, আর্জেন্টিনা, স্পেন এবং ফ্রান্স। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই টুর্নামেন্টের ২৩তম আয়োজনের আগে অনেকের মনেই প্রশ্ন, এবার কি নতুন কোন দেশ ট্রফি জয় করতে পাড়বে?

অতীতে কিছু দল জয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে হতাশ হয়ে ফিরে গেছে। এই তালিকার শীর্ষে আছে নেদারল্যান্ডস। কমলা রং এর জার্সি পরা এই দল তিন তিন বার ফাইনালে পৌঁছেও ট্রফি তুলতে পারে নি। তাদের সবচেয়ে বেদনাদায়ক পরাজয় ছিল ১৯৭৪ সালের ফাইনালে, যখন তারা স্বাগতিক দেশ পশ্চিম (তৎকালীন) জার্মানির হাতে ২-১ গোলে পরাজিত হয়। ইওহান ক্রয়েফ এর নেদারল্যান্ডস দল তাদের “টোটাল ফুটবল” দিয়ে বিশ্বের ফুটবল প্রেমীদের মন জয় করেছিল।

নেদারল্যান্ডস-এর ১৯৭৪ সালের স্কোয়াড ঘিরে যেরকম এক রোমান্স সৃষ্টি হয়েছিল, ঠিক সেরকম এক প্রত্যাশা জন্ম নিয়েছিল ক্রয়েফের হতাশার ঠিক কুরি বছর আগে, ১৯৫৪ সালে। তখন সবার আশা ছিল হাঙ্গেরির টিম নিয়ে।

বিশ্বের সেরা ফুটবলাদের অন্যতম, ফেরেঙ্ক পুস্কাস-এর নেতৃত্বে হাঙ্গেরি ছিল ফুটবলপ্রেমীদের ফেভারিট। কিন্তু বাধ সাধে পশ্চিম জার্মানি। টুর্নামেন্টের প্রথম পর্বে হাঙ্গেরি পশ্চিম জার্মানিকে ৮-৩ - ঠিকই পড়েছেন, আট-তিন - গোলে পরাজিত করে। কিন্তু ফাইনালে জার্মানরা পুস্কাস-এর দলকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে গোটা ফুটবল বিশ্বের হৃদয় ভেঙ্গে দেয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বেলজিয়াম নিয়ে অনেক মাতামাতি হয়েছে। বিশ্বকাপ মৌসুম এলেই একটা কথা পত্র-পত্রিকায় ছড়াত - এবারের বেলজিয়াম দল হচ্ছে “গোল্ডেন জেনেরেশন,” তারাই সেরা ইত্যাদি। কিন্তু বেলজিয়াম থেকে একের পর এক এনযো শিফো, এডেন অ্যাজার্ড, থিবো কোরতোয়া, ভিনসোঁ কম্পানি, রমেলু লুকাকুর মত দুর্দান্ত ফুটবলার বেরিয়ে আসলেও কোন প্রজন্মই সোনালি ট্রফি ছুঁতে পারেনি।

এবার কি ফলাফল ভিন্ন হবে? নাকি আগের মতোই ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি, ফ্রান্স আর স্পেনের মধ্যেই ঘুরপাক করতে থাকবে?

ইংল্যান্ডের আশা কম নয়। তাদের সমর্থকরা এবং দেশের মিডিয়া প্রতি বিশ্বকাপেই মনে করে তারাই সেরা টিম। কিন্তু ইংল্যান্ড যেহেতু ১৯৬৬ সালে একবার বিশ্বকাপ জয় করেছিল, আজকের আলোচনায় তাদের স্থান দেয়া যাচ্ছে না।

পর্তুগাল ফাইনালের আগেই যদি ছিটকে না পড়ে, সবার দৃষ্টি থাকবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর উপর।

সত্যি কথা বলতে, অনেকেই তাকিয়ে আছেন পর্তুগালের দিকে। দশ বছর আগে পর্তুগাল ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ-এ জয়ী হয়। গত বছর তারা ২০১৮ সালে শুরু করা ইউরপেয়ান নেশন্স লীগ ফাইনালে স্পেনকে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মত এই শিরোপা জয় করে। এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগালকে সিরিয়াস কন্টেন্ডার না ভেবে উপায় নাই।

বর্তমান পর্তুগাল দলের প্রতিটা ভাগে উঁচু মানের খেলোয়াড় রয়েছে - কোন কোন পজিশনে আছে সত্যিকার অর্থে বিশ্বমানের ফুটবলার। প্রথমেই বলতে হয় তাদের মিডফিল্ড নিয়ে।

সদ্য সমাপ্ত হওয়া মৌসুমে ইংল্যান্ডের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগ নির্বাচিত করেছে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড-এর অধিনায়ক এবং পর্তুগালের মধ্যমাঠের মধ্যমণি ব্রুনো ফারনান্ডেস কে। নিঃসন্দেহে, ব্রুনো ফারনান্ডেস বর্তমান সময়ে বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের অন্যতম। তবে তাকে দিয়ে শুরু, শেষ নয়।

ইউরোপীয় ফুটবল-এ সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং প্রতিভাধর মিডফিল্ডার হিসেবে ধরা হয় পিএসজি-এর ভিটিনিয়া এবং যো নেভেস কে। বিশেষ করে ভিটিনিয়া এখন, ফারনান্ডেস-এর মত বিশ্বমানের ফুটবলার। ভিটিনিয়া এবং নেভেস যে কোন খেলায় মধ্যমাঠ ডমিনেট করতে পারবেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। আর ফারনান্ডেস-এর মত বুদ্ধিমান এবং সৃজনশীল খেলোয়াড় খুব কমই দেখা যায়।

তাছাড়া, দলের ম্যানেজার রবের্টো মারটিনেয-এর হাতে থাকবে বারনার্ডো সিলভার মতো অভিজ্ঞ খেলোয়াড় যিনি ম্যানচেস্টার সিটির সাথে ক্লাব ফুটবলের যাবতীয় মেডাল পেয়েছেন।

রক্ষণভাগেও পর্তুগাল অত্যন্ত শক্তিশালী একটি দল। তাদের গোলকিপার ডিওগো কস্টা কে অনায়েসে বিশ্বের সেরা ৫জন গোলরক্ষকের একজন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। কস্টার সামনে যে ডিফেন্ডাররা থাকবেন, তারা প্রতিপক্ষের জন্য যে ভীতিকর হবেন, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নাই।

লেফট ব্যাক পজিশনে যিনি খেলেন, সেই নুনো মেন্ডেস কে পিএসজি কোচ লুই এনরিকে প্রায় “পারফেক্ট” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বিশ্বমানের এই ডিফেন্ডার অল্প বয়সেই ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ছাড়াও পর্তুগাল এবং ফ্রান্সের সব শীর্ষ টুর্নামেন্ট-এর মেডাল পেয়েছেন। তার মধ্যে জয়ী হওয়ার মানসিকতা ক্লাব থেকেই তৈরি হয়েছে।

লেফট ব্যাক যদি তুখড় হয়, তাহলে রাইট ব্যাকও কম যায় না। ম্যাথেউস নুনেস তিন বছর আগে ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন, যেখানে কোচ পেপ গুয়ারডিওলা তাকে মিডফিল্ড থেকে সরিয়ে রাইট ব্যাক পজিশনে খেলার প্রশিক্ষণ দেন। তিন বছরেই নতুন পজিশনে নুনেস-এর অগ্রগতি এমন হয়েছে যে গুয়ারডিওলাসহ অনেকেই মনে করেন যে তিনি শীঘ্রই বিশ্বের সেরা ফুল ব্যাকদের একজনে পরিণত হবেন। হয়ত এই বিশ্ব কাপ হবে নুনেস-এর “আগমনের” মঞ্চ।

পর্তুগালের ডিফেন্সের মাঝখানে আছে রুবেন ডিয়াস, যিনি গত ছয় বছর গুয়ারডিওলার কোচিং-এ ইংলিশ প্রেমিয়ার লীগের সেরা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের একজনে পরিণত হয়েছেন। ম্যানচেষ্টার সিটির সাম্প্রতিক সাফল্যের পেছনে রুবেন ডিয়াস-এর অবদান অনস্বীকার্য।

তবে টুর্নামেন্টের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত - বা পর্তুগাল ফাইনালের আগেই যদি ছিটকে না পড়ে - সবার দৃষ্টি থাকবে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর উপর।

এক-চল্লিশ বছর বয়স্ক এই স্ট্রাইকার শুধু পর্তুগালের নয়, সম্ভবত গোটা ফুটবল জগতের সবচেয়ে বড় তারকা। বয়স তার পক্ষে না; শরীরের ক্ষমতা তার পক্ষে না; তার এক সময়ের চোখ ধাঁধানো ফুটবল নৈপুণ্যও অনেকটা ম্লান হয়ে গেছে। কোন কিছুই তার পক্ষে না, কিন্তু তারপরও রোনালডোর অদম্য আত্মবিশ্বাস, কঠোর পরিশ্রম এবং ক্যারিয়ারের শেষে ফুটবল এর সর্বোচ্চ শিরোপা জয় করার স্পৃহা তাকে এই টুর্নামেন্টে একটি বড় ফ্যাক্টর করে রেখেছে।

ধারনা করা হচ্ছে যে মার্টিনেয একটু রয়ে-সয়েই রোনাল্ডোকে ব্যাবহার করবেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, রবের্টো মারটিনেয রোনাল্ডোকে কীভাবে ব্যবহার করবেন? প্রতিটা ম্যাচে? নাকি মাঝে-মধ্যে, প্রয়োজন বুঝে? ম্যাচে কি তাকে শুরু থেকে নামাবেন এবং ৯০ মিনিট খেলানোর চেষ্টা করবেন? নাকি বদলি প্লেয়ার হিসেবে বেঞ্চ এ রাখবেন, এবং খেলার কোন এক সময় নামাবেন?

রোনাল্ডোকে মাঠে নামানোর পরও অনেক প্রশ্ন থাকবে। যেহেতু আগের মত রোনাল্ডোর সেই ক্ষিপ্র গতি আর নেই, তাই ধরে নেয়া যে তার উপস্থিতি পর্তুগালের আক্রমণ ভাগের গতি কিছুটা কমিয়ে দেবে। মধ্যমাঠের খেলোয়াড় বা অন্যান্য ফরওয়ার্ডরা কি শুধু ড়োনাল্ডোকে বল দেয়ার চেষ্টা করবেন? এক বড় তারকা মাঠে থাকতে অন্যান্যদের খেলা কি শুধুই রোনাল্ডো-মুখি হয়ে যাবার আশঙ্কা আছে?

ধারনা করা হচ্ছে যে মার্টিনেয একটু রয়ে-সয়েই রোনাল্ডোকে ব্যাবহার করবেন। তার তারকা স্টেটাস যাতে পর্তুগাল দলের গতি এবং ছন্দ ব্যহত না করে, সেদিকে মার্টিনেযকে দৃষ্টি রাখতে হবে। রোনাল্ডো যেমন চোখের পলকে পর্তুগালকে ম্যাচ জিতিয়ে দিতে পারেন, ঠিক একই ভাবে পর্তুগাল হারার জন্যও মাঠে তার উপস্থিতি দায়ী হতে পারে।

তবে একটা কথা অনস্বীকার্য - রোনাল্ডোর উপস্থিতি দলের অন্যান্য প্লেয়ার, বিশেষ করে তরুণদের জন্য বিশাল এক অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।  রোনাল্ডো শৃঙ্খলা এবং পরিশ্রমের যে উদাহরণ সৃষ্টি করেন, তার জন্য রবের্টো মারটিনেয কৃতজ্ঞ থাকবেন। 

(লেখক ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের সাবেক ম্যানেজিং এডিটর এবং বিবিসি বাংলার সম্পাদক।)