শাকিরা: ফুটবলার আসেন, ফুটবলার যান, বিশ্বকাপের মঞ্চে তিনিই থেকে যান

ফিফা বিশ্বকাপ মানেই সবুজ মাঠে বুটের লড়াই, ট্রফির জন্য মরিয়া সংগ্রাম আর কোটি মানুষের আবেগের বিস্ফোরণ। প্রতি চার বছর পর পর এই মঞ্চে নতুন নায়কের জন্ম হয়, আবার অনেক পরিচিত তারকা বিদায় নেন।

ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, লিওনেল মেসি, নেইমার কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো ফুটবল তারকারা সময়ের নিয়মে আসেন এবং যান। কিন্তু মাঠের বাইরের উৎসব, গ্যালারির উন্মাদনা এবং বিশ্বকাপের সুরের সঙ্গে এমন একজনের নাম জড়িয়ে গেছে, যিনি ফুটবলার নন। তিনি লাতিন পপ তারকা শাকিরা।

ফুটবল দুনিয়ায় একটি কথা প্রায়ই শোনা যায়, ফুটবলাররা আসেন, চলে যান; কিন্তু শাকিরা থেকে যান। সংগীত ও ফুটবলের মেলবন্ধনে তিনি নিজেকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছেন, যেখানে বিশ্বকাপ আর শাকিরার নাম প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে।

সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৬ সালেও তিনি আলোচনায় এসেছেন নাইজেরীয় আফ্রোবিট তারকা বার্না বয়ের সঙ্গে নতুন অফিশিয়াল ট্র্যাক ‘দাই দাই’ নিয়ে।

‘ওয়াকা ওয়াকা’ থেকে ‘দাই দাই’

বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক থিম সং এসেছে, কিন্তু ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপের অফিসিয়াল গান ‘ওয়াকা ওয়াকা (দিস টাইম ফর আফ্রিকা)’ যে প্রভাব তৈরি করেছিল, তা এখনো অটুট।

শাকিরার কণ্ঠ আর আফ্রিকান সুরের এই গান হয়ে উঠেছিল বৈশ্বিক উদযাপনের প্রতীক।

‘Tsamina mina zangalewa, Anawam ah ah...’

এই মূল কোরাসটি নেওয়া হয়েছিল ক্যামেরুনের একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় গান থেকে। ১৯৮৬ সালে ক্যামেরুনের ‘গোল্ডেন সাউন্ডস’ নামের একটি ব্যান্ড ‘জানগালেওয়া’ নামে গানটি রিলিজ করে।

সেই সময় ক্যামেরুনের সেনাবাহিনী, স্কাউট এবং সাধারণ মানুষ মার্চ করার সময় বা শরীরচর্চার সময় এই গানটি গাইত।

শাকিরা ও তার প্রযোজক টিম এই ঐতিহ্যবাহী আফ্রিকান সুরটিকে বেইজ ধরে আধুনিক পপ এবং লাতিন বিটের ফিউশন ঘটিয়ে ‘ওয়াকা ওয়াকা’ তৈরি করেন।

২০১০ সালের বিশ্বকাপটি ছিল আফ্রিকা মহাদেশে অনুষ্ঠিত ইতিহাসের প্রথম কোনো বিশ্বকাপ। তাই ফিফা এমন একটি গান চেয়েছিল, যা পুরো আফ্রিকার সংস্কৃতিকে তুলে ধরবে। আবার বৈশ্বিক শ্রোতাদেরও নাচাবে। সেই কাজে শাকিরা সফলও হয়েছিলেন।

এই সুর বাজলেই আজও বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের ফুটবলপ্রেমীর মনে বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরে আসে।

ইউটিউবে চার বিলিয়নের বেশি ভিউ পাওয়া গানটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় থিম সংগুলোর একটি।

এরও আগে ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপের ফাইনালে ‘হিপস ডোন্ট লাই (বাম্বু ভার্সন)’ গেয়ে শাকিরা প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন।

এরপর আসে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ। যদিও ওই আসরের অফিসিয়াল গান ছিল অন্য একটি। কিন্তু শাকিরার ‘লা লা লা’ বিশ্বকাপের সাংস্কৃতিক আলোচনায় আলাদা জায়গা করে নেয়। অনেকের কাছেই গানটি ছিল সেই আসরের সবচেয়ে স্মরণীয় সংগীত।

২০২৬ সালে এসে শাকিরা আবারও দেখালেন কেন বিশ্বকাপের সঙ্গে তার নাম এত ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে গেছে। বার্না বয়ের সঙ্গে তার নতুন গান ‘দাই দাই’ প্রকাশের পরপরই তা ফুটবল মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে।

গানের মিউজিক ভিডিওর শুরুতেই কিলিয়ান এমবাপ্পে, লিওনেল মেসি, আর্লিং হালান্ড, ভিনিসিয়ুস জুনিয়র ও লুইস দিয়াজের মতো তারকাদের মুখে ‘উই আর রেডি’ স্লোগান শোনা যায়। আর শেষ অংশে ডিয়েগো ম্যারাডোনা, পাওলো মালদিনি, রোনালদো, ইনিয়েস্তা, বেকহাম, কাকা ও রোমারিওর মতো কিংবদন্তিদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ফুটবলপ্রেমীদের আবেগকে নাড়া দেয়।

পিটবুল, জেনিফার লোপেজ ও অন্যদের অবদান

বিশ্বকাপের মঞ্চে আলো ছড়াতে বিভিন্ন সময়ে অনেক বড় তারকা এসেছেন।

১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে রিকি মার্টিনের ‘দ্য কাপ অব লাইফ (লা কোপা দে লা ভিদা)’ ফুটবল ও সংগীতের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। লাতিন পপ যে বিশ্বকাপের আবেগের সঙ্গে এত সুন্দরভাবে মিশে যেতে পারে, তা প্রথম বড় পরিসরে দেখিয়েছিলেন তিনি।

২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে আমেরিকান র‍্যাপার পিটবুল ও পপ তারকা জেনিফার লোপেজ অফিসিয়াল গান ‘উই আর ওয়ান (ওলে ওলা)’ নিয়ে হাজির হন। পিটবুলের পরিচিত এনার্জি, লাতিন ছন্দ এবং জেনিফার লোপেজের উপস্থিতি গানটিকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। সমাপনী অনুষ্ঠানে তাদের পারফরম্যান্সও ছিল আলোচিত।

২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে নিকি জ্যাম, উইল স্মিথ ও ইরা ইস্ত্রেফির ‘লিভ ইট আপ’ আর ২০২২ সালে মালুমা, ওজুনা ও বিটিএস তারকা জংকুকের ‘ড্রিমার্স’ বিশ্বকাপের সাংস্কৃতিক অংশকে সমৃদ্ধ করেছে।

বিশেষ করে জংকুকের পারফরম্যান্স কাতার বিশ্বকাপে এশীয় পপ সংস্কৃতির উপস্থিতিকে নতুন মাত্রা দেয়। তবে এসব গান মুহূর্তের উন্মাদনা তৈরি করলেও শাকিরার গানগুলোর মতো দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক প্রভাব তৈরি করতে পারেনি।

রিকি মার্টিন, পিটবুল বা জংকুক নির্দিষ্ট একটি বিশ্বকাপের স্মৃতির অংশ। কিন্তু শাকিরা একাধিক প্রজন্মের বিশ্বকাপ স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছেন।

কেন শাকিরা আলাদা?

ফুটবলে নায়ক বদলায় খুব দ্রুত।

২০১০ বিশ্বকাপে দিয়েগো ফোরলান ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। ২০১৪ সালে লিওনেল মেসি, হামেস রদ্রিগেজ কিংবা মারিও গোটশে। এরপর হয়েছে এমবাপ্পের উত্থান, মেসির বিশ্বকাপ জয়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব নামের জায়গায় নতুন নাম আসে। ফর্ম বদলায়, ক্যারিয়ার শেষ হয়, রেকর্ড ভাঙে।

কিন্তু শাকিরার ক্ষেত্রে গল্পটা ভিন্ন।

২০১০ সালের স্পেনের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন দল এখন ইতিহাসের অংশ। জিনেদিন জিদান কিংবা রোনালদিনহোর জাদুও আজ ইউটিউবের ভিডিওতে বন্দি। কিন্তু ‘ওয়াকা ওয়াকা’ এখনো বিশ্বকাপের আবহ তৈরি করে। নতুন প্রজন্মও একইভাবে ‘দাই দাই’-এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে।

এখানেই শাকিরার বিশেষত্ব। তিনি কোনো নির্দিষ্ট দল, দেশ বা প্রজন্ম ছাপিয়ে পুরো ফুটবল বিশ্বের সাংস্কৃতিক আবেগের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ফুটবল ও পপ সংস্কৃতির সেতুবন্ধন

শাকিরা শুধু বিশ্বকাপের গান গেয়েছেন, বিষয়টি এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়।

তার গানগুলো প্রায়ই ফুটবলের বৈশ্বিক চরিত্রকে তুলে ধরে। ‘দাই দাই’-এর ভিডিওতে যেমন আধুনিক স্টেডিয়ামের ঝলক আছে, তেমনি আছে আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিশুদের ফুটবল খেলার দৃশ্য। ফুটবল যে শুধু বড় তারকাদের খেলা নয়। বরং বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের স্বপ্ন ও আনন্দের অংশ, সেই বার্তাই উঠে আসে সেখানে।

বার্না বয়ের আফ্রোবিট এবং শাকিরার পরিচিত লাতিন-পপ ঘরানার মিশ্রণ গানটিকে আরও বৈশ্বিক আবেদন দিয়েছে।

ফুটবল ম্যাচের স্থায়িত্ব ৯০ মিনিট। বিশ্বকাপের স্থায়িত্ব এক মাস। কিন্তু কিছু গান সেই সময়ের সীমানা পেরিয়ে যায়।

গ্যালারির আলো নিভে যাওয়ার পর, ট্রফি হাতে তোলার মুহূর্ত শেষ হওয়ার পর কিংবা পরাজয়ের বেদনা মুছে যাওয়ার পরও যে সুরগুলো থেকে যায়, তার মধ্যে শাকিরার গান অন্যতম।

তাই ফুটবলাররা আসেন, ফুটবলাররা চলে যান, কিন্তু শাকিরা থেকে যান।