এবারের বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের ভেন্যুকে শুধু বিশ্বকাপ নয়, ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে আইকনিক স্টেডিয়াম বললেও একটুও বাড়িয়ে বলা হয় না। কেনই বা হবে – এই স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ হাতে তুলেছেন পেলে আর ম্যারাডোনা দু’জনেই, আবার ৮৬’র বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে এই মাঠেই ম্যারাডোনা পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত-আলোচিত দুই গোল করেছিলেন।
তাই মেক্সিকো সিটির এস্তাদিও অ্যাজটেকাকে যখন ফুটবলের ‘ভ্যাটিকান’, ‘মন্দির’ বা ‘গির্জা’র সাথে তুলনা করা হয়, তখন খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এটিই একমাত্র স্টেডিয়াম যেখানে দুইটি বিশ্বকাপের ফাইনাল হয়েছে। একইসাথে, এখন পর্যন্ত ১৯টি বিশ্বকাপ ম্যাচ আয়োজন করা একমাত্র স্টেডিয়ামও এটি।
এবারের আসরে ৫টি ম্যাচ হবে এই স্টেডিয়ামে। আর ১১ই জুনের উদ্বোধনী ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপ শুরু হওয়া ভেন্যু হিসেবে পাকাপাকিভাবে হল অব ফেইমে নাম লেখাবে মেক্সিকো সিটির ‘কলোসাস অব সান্টা আরসালা।’
শুধু সংখ্যাতত্ত্ব আর কাগজে-কলমের হিসেবে অ্যাজটেক স্টেডিয়াম ঘিরে মেক্সিকানদের আবেগের গভীরতা বোঝার চেষ্টা করলে বড় ভুল হবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫৮’র বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চাওয়া মেক্সিকোর প্রথমবার ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’এর স্বাগতিক হওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় ১৯৬৪ সালে। ফিফা সেসময় তাদের জানায় যে ১৯৭০ এর বিশ্বকাপ মেক্সিকো আয়োজন করবে।
বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পথে ফিফা যেন বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায়, সেই প্রস্তুতিটা মেক্সিকো শুরু করে ১৯৬০ সাল থেকেই। সেসময় মেক্সিকোর ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট গুইলের্মো কানেদো পরে এক সাক্ষাৎকার বলেছিলেন যে, “মেক্সিকো শুধু একটা বিশ্বকাপ আয়োজন করতে চায়নি, তারা চেয়েছিল বিশ্ববাসীর দেখা সবচেয়ে জমকালো বিশ্বকাপের স্বাগতিক হতে।”
“আর সেটার জন্য আমাদের প্রয়োজন ছিল বিশ্বের সেরা স্টেডিয়াম। ব্রাজিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপের জন্য যেমন মারাকানার মত ম্যাজিকাল স্টেডিয়াম বানিয়েছিল, আমরা তার চেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ একটি স্টেডিয়াম বানাতে চেয়েছিলাম।”
১৯৬১ সালে স্টেডিয়াম যখন তৈরি করা শুরু হয়, তখন ডিজাইনের জন্য প্রধান আর্কিটেক্টের দ্বায়িত্ব দেয়া হয় পেদ্রো রামিরেজ ভাজকেজকে। যিনি পরে তার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে কানেদো তাকে বলেছিলেন যে ফ্রিদা কাহলো’র পেইন্টিংয়ের চেয়ে মর্মস্পর্শী হতে হবে এই স্টেডিয়ামকে। স্টেডিয়াম তৈরির আগে ইউরোপের ওয়েম্বলি, স্যান সিরো, ক্যাম্প ন্যু আর স্যান্টিয়াগো বার্নাব্যু সফর করেন প্রধান আর্কিটেক্ট ও ডিজহাইন টিমে থাকা চিত্রশিল্পী রাফায়েল মিহারেস আলকেরেচা। স্টেডিয়াম তৈরির প্রথম ধাপে শুধু মাঠের পৃষ্ঠ শক্ত করার জন্যই ১৮ কোটি কিলোগ্রাম পাথর এনে বসানো হয়। মোট ১০ জন আর্কিটেক্ট, ১৭ জন টেকনিশিয়ান, ৩৫ জন ইঞ্জিনিয়ার আর ৮০০ শ্রমিক এক বছরের বেশি সময় প্রতিদিন কাজ করে ১৯৬২ সালে এক লাখের বেশি ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়ামকে খেলার উপযোগী করে তোলে।
আর এই স্টেডিয়ামের ওপর ভর করেই মেক্সিকো ইউরোপ আর দক্ষিণ আমেরিকার বাইরে প্রথম বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব অর্জন করে ১৯৬৪ সালের ফিফা কংগ্রেসে।
এরপরের ইতিহাস চাইলেও ভুলে যাওয়া সম্ভব নয়। ১৯৭০ এর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে এই মাঠেই হয় ‘গেইম অব দ্য সেঞ্চুরি’ খ্যাত ইতালি-পশ্চিম জার্মানি ম্যাচ, যেই ম্যাচ ৯০ মিনিটে ১-১ গোলে শেষ হওয়ার পর ৩০ মিনিটের এক্সট্রা টাইমে গোল হয় পাঁচটি। সেদিন জার্মানির ফ্রানৎজ বেকেনবাওয়ারের ঘাড়ের হাড় ডিজলোকেটেড হয়ে যাওয়ার পরও তিনি শেষ পর্যন্ত ম্যাচ খেলেছিলেন গলার সাথে হাত ঝুলিয়ে।
সেবারের ফাইনালে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মানুষের সামনে ইতালিকে ৪-১ গোলে হারিয়ে পেলে হাতে তোলেন ব্রাজিলের তৃতীয় ট্রফি, যেই জুলে রিমে ট্রফি তিনবার জেতার পর ব্রাজিল ঘরে নিয়ে যায়। এরপর ৮৬’তে পরের বিশ্বকাপেই মেক্সিকো এবং অ্যাজটেক স্টেডিয়াম তাদের আগের উচ্চতা অতিক্রম করে। সত্তরের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে জনপ্রিয় হওয়া ‘মেক্সিকান ওয়েভ’কে সারাবিশ্বের যে কোনো স্পোর্টস ইভেন্টের অত্যাবশ্যকীয় অংশে পরিণত হয় এই আসরে অ্যাজটেক স্টেডিয়ামের দর্শকদের মাধ্যমেই।
সেবারের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সাথে কোয়ার্টার ফাইনাল বা পশ্চিম জার্মানির সাথে ফাইনালে ম্যারাডোনার অ্যাজটেকের পারফরমেন্সকে যেমন শুধু গোল বা অ্যাসিস্টের সংখ্যা, পারফরমেন্সের গুণগত মান বা টুর্নামেন্টের গুরুত্ব দিয়ে মাপা যায় না, ফুটবল খেলার স্টেডিয়াম হিসেবে অ্যাজটেকের তাৎপর্যও তেমনি মাঠ, দর্শক সংখ্যা বা কতগুলো ম্যাচ খেলা হলো সেই হিসেবে বোঝা সম্ভব নয়।
ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফ্যান্টিনোর কাছে ‘গির্জা’, ম্যারাডোনার কাছে ‘আকাশ’ বা মেক্সিকোর মানুষের কাছে ফুটবলের ‘মন্দির’ অ্যাজটেক স্টেডিয়াম তাই এই বিশ্বকাপে মাত্র ৫টি ম্যাচের ভেন্যু হলেও ফুটবল যাদের কাছে ধর্ম, তাদের জন্য মহাপবিত্র তীর্থ হয়েই থাকবে অনন্তকাল।