বিশ্বকাপ শুরুর আগেই যে ছয় বিতর্ক

কয়েকদিন পরই শুরু হচ্ছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে বড় আসর, ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। তবে এবারের টুর্নামেন্টকে ঘিরে আলোচনা কেবল মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই।

প্রথমবারের মতো তিনটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো—যৌথভাবে আয়োজন করছে বিশ্বকাপ। একই সঙ্গে ৩২ থেকে বেড়ে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা হয়েছে ৪৮।

এটি হতে যাচ্ছে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসর। কিন্তু আয়োজনের বিশালতা যেমন আলোচনায়, তেমনি রাজনৈতিক উত্তেজনা, মানবাধিকার, ব্যয়বহুল টিকিট ও ইরানকে ঘিরে অনিশ্চয়তাও উঠে এসেছে বিতর্কের কেন্দ্রে।

তিন আয়োজক দেশের সম্পর্ক কতটা স্বস্তিদায়ক?

বিশ্বকাপ ইতিহাসে এটি দ্বিতীয়বারের মতো একাধিক দেশের যৌথ আয়োজন। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল।

তবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে সম্পর্ক কিছুটা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে বাণিজ্য, অভিবাসন ও সীমান্ত ইস্যুতে উত্তেজনা বেড়েছে।

বিশেষ করে কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের "৫১তম অঙ্গরাজ্য" হিসেবে যুক্ত করার মন্তব্য এবং মেক্সিকো সীমান্ত নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

৪৮ দলের বিশ্বকাপ কি মান কমিয়ে দেবে?

এবারের বিশ্বকাপে অংশ নিচ্ছে ৪৮টি দল। এর ফলে ম্যাচ সংখ্যা ৬৪ থেকে বেড়ে হয়েছে ১০৪।

১২টি গ্রুপে ভাগ হয়ে খেলবে দলগুলো। প্রতিটি গ্রুপের শীর্ষ দুই দল এবং সেরা আটটি তৃতীয় স্থানধারী দল নকআউট পর্বে উঠবে।

বর্ধিত আসরের কারণে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে কেপ ভার্দে, কুরাসাও, জর্ডান ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ।

অনেকের মতে এটি ফুটবলের বিশ্বায়নের জন্য ইতিবাচক। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, অপেক্ষাকৃত দুর্বল দল বাড়লে প্রতিযোগিতার মান কি আগের মতো থাকবে?

বাধ্যতামূলক পানি বিরতি কেন?

ফিফা জানিয়েছে, এবার প্রতিটি ম্যাচেই দুই অর্ধে একটি করে হাইড্রেশন ব্রেক থাকবে।

আগে কেবল তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি হলে এমন বিরতি দেওয়া হতো। কিন্তু উত্তর আমেরিকার কয়েকটি শহরে প্রচণ্ড গরমের আশঙ্কায় এবার নিয়মটি সবার জন্য বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

এই সিদ্ধান্তের ফলে সম্প্রচারকারীরাও বিরতির সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সম্প্রচারের সংস্কৃতির সঙ্গে বেশ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ কেন?

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বকাপকে ঘিরে ভক্ত, সাংবাদিক, শ্রমিক ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

সংস্থাটি যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, মেক্সিকোতে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক মোতায়েন এবং কানাডার কিছু শহরে গৃহহীন মানুষের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

যদিও আয়োজক দেশগুলো বলছে, নিরাপদ ও সফল টুর্নামেন্ট আয়োজনই তাদের মূল লক্ষ্য।

বিশ্বকাপ দেখা কি সাধারণ ভক্তদের নাগালের বাইরে?

এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো খরচ।

স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি। উদাহরণ হিসেবে কানাডার ভ্যাঙ্কুভার থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মায়ামির দূরত্ব প্রায় সাড়ে চার হাজার কিলোমিটার।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টিকিটের উচ্চ মূল্য। কিছু ম্যাচের টিকিট কয়েক হাজার ডলারে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি ফাইনালের কিছু পুনর্বিক্রয় টিকিটের দাম মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে সাধারণ সমর্থকদের জন্য বিশ্বকাপ সরাসরি দেখা কতটা সহজ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

ইরানকে ঘিরে অনিশ্চয়তা

বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত করেছে ইরান। কিন্তু দেশটির নাগরিকদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং দুই দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন জটিলতা তৈরি করেছে।

খেলোয়াড় ও কোচিং স্টাফরা ছাড় পেলেও কর্মকর্তাদের যাতায়াত নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে ইরান দলকে মেক্সিকোতে অবস্থান করার একটি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। সেখান থেকে তারা প্রয়োজন অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ম্যাচ খেলতে যাবে।

মাঠের বাইরের বিশ্বকাপ

ফুটবল বিশ্বকাপ সাধারণত স্মরণীয় হয়ে থাকে মাঠের নাটকীয়তা, গোল আর চ্যাম্পিয়নের গল্পে। তবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সম্পর্ক, মানবাধিকার, নিরাপত্তা ও ব্যয়ের মতো বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পাচ্ছে।

ফলে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে মাঠের বাইরের গল্পগুলো।